‘বড় একটা বান (ঝড়) নাকি আবার আইতে আছে। বানের কথা মোনে উঠলেই চোহে আর ঘুম থাহে না। বাড়ির কূলের ভেরী (বাধ) নাই। বান আইলে মাইয়া পোলা আর গরু-ছাগল লইয়া কোমনে যামু আল্লায় জানে’। 

ঘূর্ণিঝড় আসানির প্রভাবে সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠলে দ্রুত বাড়ি ফিরতে হয় বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বলেশ্বর তীরবর্তী পদ্মা গ্রামের জেলে পান্না মাঝিকে। দিনভর ভারী বৃষ্টিপাতে আর কাজে বের হতে পারেননি তিনি। 

সোমবার দুপুরের পর বলেশ্বর উত্তাল হয়ে উঠলে গ্রামে শোরগোল উঠে ভাঙতে পারে বাঁধ। শুধু পদ্মা নয়, বলেশ্বর তীরবর্তী রুহিতা, জিনতলা, বকুলতলা গ্রাম সংলগ্ন বেরিবাঁধ রয়েছে ভীষণ নাজুক অবস্থায়। পাথরঘাটার মতো বরগুনা জেলার তালতলী ও সদর উপজেলার বিষখালী ও নিশানবাড়িয়া নদী তীরবর্তী মানুষও আশানির সংবাদে ভীত হয়ে পড়েছেন।

বরগুনার সদর, তালতলী ও পাথরঘাটার নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা বলেন, আসানির ছোবলে যদি ক্ষতিগ্রস্থ বাধ ভেঙ্গে নদী ও সাগরের পানি ঢুকে পড়ে তাহলে শতশত বাড়ি-ঘরসহ তলিয়ে যাবে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি। 

পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার কচা ও বলেশ্বর নদের তীরে বাধ না থাকায় টগড়া, চর সাঈদখালী, পাড়েরহাট, চন্ডিপুর, খোলপটুয়া ও চাড়াখালী গুচ্ছ গ্রামের বাসিন্দারা আসানি আতঙ্কে রয়েছেন। 

টগড়া গ্রামের বাসিন্দা মজিবুর রহমান হাওলাদার সমকালকে বলেন, ‘বাড়ির কূলে বাঁধ নাই, তাই খুব ডরে আছি। কেডা কোম্মে ঠাঁই লইবে হেয়ার দিশা নাই’।

মঠবাড়িয়া উপজেলার বলেশ্বর তীরবর্তী খাতাচিড়া গ্রামের বাসিন্দা নাছির উদ্দীন চৌকিদার বলেন, ‘সিডরের সময় খাতাচিড়া গ্রাম লন্ডভন্ড হইছিল। হেরপর আর বাধ বান্দা হয় নাই। আবার জোয়ার আইলে আমরা আর বাঁচতে পারমু না।’ 

পাথরঘাটার উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কবির অভিযোগ করেন, পাথরঘাটার পূর্বে বিষখালী এবং পশ্চিমে বলেশ্বর নদ তীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ বাধ টেকসইভাবে মেরামত করা হচ্ছে না। ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস আসলেই বিষখালী ও বলেশ্বর তীরবর্তী বাসিন্দারা আতঙ্কে থাকেন।

পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হুসাইন মো. আল মুজাহিদ জানান, বৃষ্টিতে উপজেলা সদরের নিম্নাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে রবি শষ্যের ক্ষেত ডুবে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বরিশাল জোনের প্রধান প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম সরকার সোমবার সন্ধ্যায় সমকালকে বলেন, বরিশাল জোনের ৬ জেলায় মোট বাধ আছে ৩৪২৬ কিলোমিটার। 

এর মধ্যে বরগুনার ৮০৫, পটুয়াখালীতে ১৩৩৬, ভোলায় ৩৫৮, পিরোজপুরে ২৭৩, ঝালকাঠিতে ৩৫০ এবং বরিশালে ৩০৪ কিলোমিটার বাধ রয়েছে।

বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, বরগুনায় ৮০৫ কিলোমিটারের মধ্যে ১৭ কিলোমিটার বাঁধ অতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আংশিক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ১৫০ কিলোমিটার বাঁধ। 

আশানির আঘাতে কোথাও বাধ ভেঙ্গে গেলে সেখানে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ দিয়ে প্রাথমিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে বলে জানান তিনি।

বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মোঃ আমিন উল আহসান সোমবার সন্ধ্যায় সমকালকে বলেন, বিভাগের ৬ জেলা প্রশাসককে আসানি মোকাবেলায় যার যার মত সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। বিভাগের ২৯৬৫টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রসহ উপকূলবর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং মুজিব কিল্লাগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে উপকূলীয় এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বাধের দিকে বিশেষ নজর রাখতে।