নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ছোট-বড় অসংখ্য নদী। সৈয়দ শামসুল হক তার 'আমার পরিচয়' কবিতায় লিখেছেন, 'তেরশত নদী শুধায় আমাকে কোথা থেকে তুমি এলে?' যেহেতু এক সময় এ দেশ ছিল সহস্রাধিক নদীর আধার, তাই ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থায় নদীপথ ছিল একমাত্র ভরসাস্থল। যাতায়াত, পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে যাবতীয় আদান-প্রদান হতো তখন এ পথেই। তাই নিয়ম করে জলে ভেসে, ভেঁপুর আওয়াজ তুলে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হতো জলপথের যানগুলোকে। এর কোনোটা ছিল আকারে বড়, কোনোটা ছোট, আবার কোনোটা দানবাকৃতির। ছোট ডিঙি নৌকা, লঞ্চ, ট্রলার, ফেরি, রকেট স্টিমার; কী ছিল না এ তালিকায়! তবে এসবের মধ্যে রকেট স্টিমারই ছিল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে। সে সময়কার বহু গুণী কবি-সাহিত্যিকের সৃষ্টিতে বারবার এসেছে এর নাম।

রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ ও সুকুমার রায় তাদের লেখায় জীবন অভিজ্ঞতায় উল্লেখযোগ্যভাবে স্মরণ করেছেন এই রকেট স্টিমারকে। এই যান যে ভ্রমণের পক্ষে আদর্শ এবং এর গঠন-কৌশল যে কোনো দুর্যোগের বিরুদ্ধে উপযোগী; তারও প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও বুদ্ধিজীবীদের বর্ণনায়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, জলপথের সেই স্বর্ণযুগ বহু আগেই ফুরিয়েছে; নদ-নদীর সংখ্যা যেমন আশঙ্কাজনক হারে কমেছে, একইভাবে কমেছে এ পথ দাবড়ে বেড়ানো জলযান এবং তার সংখ্যা। এ অঞ্চলে রকেট স্টিমারের ইতিহাস অনেক পুরোনো এবং সমৃদ্ধ, যা জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে আজ থেকে দেড় শতাধিক বছর আগে। ১৮৩৪ সালে ব্রিটিশ সরকারের মালিকানাধীন 'লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক' নামে একটি স্টিমার প্রথম গঙ্গা দিয়ে চলাচল করত। এর এক দশক পর 'ইন্ডিয়া জেনারেল নেভিগেশন অ্যান্ড রেলওয়ে কোম্পানি লিমিটেড' নামে একটি অভ্যন্তরীণ স্টিমার কোম্পানির যাত্রা শুরু হয়। মূলত এর পর থেকেই বাংলা নৌপথে সমৃদ্ধ হতে থাকে। যার নজির দেখা যায় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। ১৮৮০-৯০ সালে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে কলকাতা থেকে খুলনা পর্যন্ত ৮৯৮টি নৌযান প্রতি বছর চলাচল করত। বিশ শতকের প্রথমভাগে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮শতে।

মজার ব্যাপার হলো, রকেট স্টিমারের তুমুল জনপ্রিয়তা তাকে কেবল নৌপথে অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানেই নিয়ে যায়নি; ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব ছিল দৃশ্যমান। ব্রিটিশরা তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও ব্যবসার প্রসারে তৎকালীন পূর্ববাংলার সব অঞ্চলে রেললাইন স্থাপন করলেও বরিশাল ছিল এর বাইরে। এর পেছনে এই স্টিমার কোম্পানিকেই দায়ী করেছেন প্রখ্যাত ভারতীয় ইতিহাসবিদ তপন রায় চৌধুরী। তার ভাষ্যমতে, 'গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের প্রায় শেষ সীমায় অবস্থিত এই জেলায় (বরিশাল) নদী-নালা এত বেশি যে, রেল সংযোগ আর সম্ভব হয়নি। দুই একবার যা চেষ্টা হয়েছিল, স্টিমার কোম্পানির মালিক লর্ড ইঞ্চকেপ বিলেতে বসে কলকাঠি নেড়ে তার দফা শেষ করেন।'

সাতচল্লিশে (১৯৪৭) দেশভাগের পর ব্রিটিশ সরকারের রেখে যাওয়া স্টিমারগুলো নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান স্টিমার্স সার্ভিস। গাজী, অস্ট্রিচ, টার্ন, কিউই, শেলা, লালী, সান্দ্রা, মেঘলা, মাহসুদ, লেপচা নামক ১০টি স্টিমার ছিল এ সংস্থার অধীনে। এর পর দিন যত গড়িয়েছে, ততই অচলাবস্থার দিকে ঝুঁকেছে এক সময়কার রাজকীয় এই বাহন। স্বাধীনতার পর সর্বসাকল্যে ৫টি স্টিমারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিএ)।
রকেট স্টিমারের সঙ্গে মিশে আছে বাঙালি জাতির আবেগ, ঐতিহ্য ও গৌরবময় ইতিহাস। বর্তমান বিশ্বে রকেট স্টিমার পরখ করতে হলে বা এর সান্নিধ্য পেতে হলে আপনাকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই ক্ষুদ্র দেশেই পা ফেলতে হবে। কারণ শুনতে অবাক লাগলেও বাস্তবতা হলো, বিশ্বের বুকে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে এখনও রকেট স্টিমার বহাল তবিয়তে রয়েছে। যদিও তা একেবারেই নগণ্য; বয়সের ভারে জীর্ণশীর্ণ। তারপরও স্টিমারগুলো চলছে সমহিমাতেই; যেমনটা চলেছিল কয়েকশ বছর আগে। তথ্য বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে থাকা স্টিমারের সব ক'টিরই নির্মাণস্থল এক; কলকাতার গার্ডেন রিচ শিপইয়ার্ড। তবে নির্মাণকালের মধ্যে কিছুটা তারতম্য রয়েছে। পিএস অস্ট্রিচ, পিএস মাহসুদ ১৯২৯ সালে, পিএস লেপচা ১৯৩৮ সালে, পিএস টার্ন ১৯৫০ এবং শেলা ১৯৫১ সালে নির্মিত হয়। আদিকাল থেকে জলপথ ছিল মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। আর ভ্রমণের বেলায় সেই পথ যেন স্বর্গতুল্য। এই ভ্রমণে সঙ্গী যদি হয় রকেট, তাহলে তো নির্দি্বধায় বলতেই হয় সোনায় সোহাগা। রকেট স্টিমারকে কেউ কেউ বলে থাকেন শুধু রকেট বা স্টিমার। রকেটের মতো দ্রুতগামী আর কয়লা দ্বারা উৎপন্ন স্টিমে চলত বলে এই নাম। আবার প্যাডেলচালিত হওয়ায় অনেকে ডাকেন প্যাডেল স্টিমার বলে।

এ ছাড়া কিছু অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয় কমলা। কয়েক বছর আগে এই নামেই চলচ্চিত্রকার নুর ইমরান মিঠু নির্মাণ করেছেন একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কারজয়ী টেলিফিল্ম 'কমলা রকেট'। যেখানে গল্প এগিয়েছে এ রকেটের ওপর দিয়েই। তাই যুগের সাক্ষী হতে কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে দূর অজানায় ভাসতে হলে চড়তে হবে এই কমলা রকেটে। প্রথম শ্রেণি, দ্বিতীয় শ্রেণি এবং তৃতীয় শ্রেণি- এই তিন শ্রেণির টিকিটের ব্যবস্থা রয়েছে রকেটে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণিতে কেবিন রয়েছে ১২টি, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০টি। প্রতিটি কেবিন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত; রয়েছে ২টি করে বেড ও নিজস্ব বারান্দার ব্যবস্থা। এই শ্রেণির টিকিট পাওয়া যাবে ঢাকার মতিঝিলে। অন্যদিকে তৃতীয় শ্রেণির টিকিট মেলে স্টিমারেই। এটি মূলত ডেকের ফাঁকা জায়গা। যাত্রীদের নিজস্ব বিছানা কাপড় পেতে এখানে থাকতে হয়।

যদি প্রশ্ন করা হয়, বাংলাদেশের কোন যানে এক যাত্রায় সবচেয়ে বেশি সময়, সবচেয়ে বেশি জেলা এবং সবচেয়ে বেশি নদী ভ্রমণ করা যায়। নিশ্চিত উত্তর আসবে স্টিমার; রকেট স্টিমার! একযোগে ১৩টি নদী স্পর্শ করা এই যানেই কেবল সম্ভব। এ সুযোগটি লুফে নেওয়া যায় প্রতি শনি, রবি, মঙ্গল ও বুধবার- ঠিক সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। ঢাকার সদরঘাট থেকে স্টিমার তখন আকাশ-বাতাসে আওয়াজ তুলে আপন গন্তব্যে রওনা করে। আগে এই গন্তব্য পথটি ছিল দু'দিনের বেশি, ২৭ ঘণ্টার। তখন সরাসরি খুলনা পর্যন্ত যেত এই যান্ত্রিক ফড়িংগুলো। কিন্তু নাব্য সংকট এ অঞ্চলে চলাচলের পক্ষে বড় সংকট হওয়ায় বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ পর্যন্ত সীমিত এই পথ। ২০ ঘণ্টার অধিক সময় ব্যয় হয় এ যাত্রায়। তাই দীর্ঘ যাত্রায় যারা অনভ্যস্ত তাদের ক্ষেত্রে শক্ত একটা মানসিক প্রস্তুতি রাখা জরুরি। সবকিছু ঠিক থাকলে আর হাতে নির্দিষ্ট তারিখের টিকিট পেলে এক সন্ধ্যায় উঠে পড়তে পারেন কালজয়ী এই যান্ত্রিক রকেটে। দীর্ঘ পথ পেরিয়েও যদি মনে হয়, বৃথা এ আয়োজন, তবে কল্পনার জগতে ডুব দিয়ে সুখস্মৃতি করুন আর ভাবতে থাকুন, আপনি একা নয়, আপনার মতো দ্বিতীয় রানী এলিজাবেথ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, উপমহাদেশের প্রখ্যাত বিপ্লবী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধীও এই স্টিমারে গিয়েছিলেন দক্ষিণ বাংলায়। া

বিষয় : শতবর্ষী রকেট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক রকেট স্টিমার

মন্তব্য করুন