কভিড অতিমারি থেকে পুনরুদ্ধারের পথে থাকা বিশ্ব অর্থনীতি হোঁচট খেয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে। পণ্যবাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম অনেক বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ এ সংকটের বাইরে নেই। পৃথিবীর অনেক দেশের মতো এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রধান দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল্যস্ম্ফীতি। এ নিয়ে লিখেছেন জাকির হোসেন

২০২১ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে অপরিশোধিত (ব্রেন্ট) জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি গড় দর ছিল ৬০ ডলার। গত মাসে যা উঠেছে ১০৬ ডলারে। খাদ্যে ব্যবহূত তেল বা ভোজ্যতেলও পিছিয়ে নেই। এপ্রিলে সয়াবিন তেলের আন্তর্জাতিক গড় দর প্রতি টন ১ হাজার ৯৪৮ ডলার। গত বছর ছিল ১ হাজার ৩৮৫ ডলার। ২০২০ সালে ছিল ৮৩৮ ডলার। এসব পরিসংখ্যান বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ 'কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক' প্রকাশনা থেকে নেওয়া। বিশ্বব্যাংক বলছে, অনেক পণ্যের দাম এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ২০২২ সালে পণ্যমূল্য আগের বছরের চেয়ে অনেক বেশি থাকবে। আর রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

বাংলাদেশে কয়েকদিন ধরে ভোজ্যতেল নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একবারেই প্রতি লিটারে ৪৪ টাকা পর্যন্ত দর বাড়ানোর পর ক্রেতাকে এক লিটার সয়াবিন তেল কিনতে হচ্ছে ২০০ টাকায়। তাও আবার ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। সর্বশেষ দাম বাড়ানোর আগে কয়েকদিন বাজার থেকে ভোজ্যতেল উধাও হয়ে যায়। দাম বাড়ানোর পর এসব অবৈধ মজুতের একটি অংশ বাজারে ফিরে আসে। এর বাইরে সরকার অভিযান পরিচালনা করে প্রচুর পরিমাণে ভোজ্যতেল উদ্ধার করছে। সুতরাং বাংলাদেশে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতি মুনাফার লোভ মূল্যস্ম্ফীতিকে যে আরও ত্বরান্বিত করে, তা বুঝতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

ঊর্ধ্বমুখী থাকা মূল্যস্ম্ফীতি নানা মাত্রিক সংকট তৈরি করছে। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষকে বড় সংকটে ফেলে দিয়েছে। সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান দিতে পারছে না। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের ভোগ কমিয়ে দিতে হচ্ছে। বিশেষত নির্ধারিত আয়ের মানুষের সংকটটা বেশি। বিভিন্ন জরিপ বলছে, কভিডের সময় অনানুষ্ঠানিক খাতের অনেকের, এমনকি আনুষ্ঠানিক খাতের একটি অংশের আয় কমে যায়। যদিও সম্প্রতি পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত সাময়িক হিসাবে বলা হয়েছে, মাথাপিছু আয় এক বছরে ২৩৩ ডলার বেড়েছে। মাথাপিছু আয় কীভাবে এত বাড়ল সে বিতর্কে না গিয়ে এটুকু বলা যায়, কোনো দেশের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে সবার আয় বাড়ে না। যদি বেশিরভাগ মানুষের আয় বেড়ে যাওয়ার কারণে মাথাপিছু আয় বাড়ে, তাহলে মনে করতে হবে বৈষম্য কম রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। বাজারের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাল মেলাতে যেখানে বেশিরভাগ মানুষ হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে মাথাপিছু আয়ের উল্লম্ম্ফন বৈষম্য বেড়ে যাওয়াকেই ইঙ্গিত করে।

মানুষের জীবনযাপনের সংকটের পাশাপাশি মূল্যস্ম্ফীতি দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে সংকটে ফেলেছে। বিশ্ববাজারের ঊর্ধ্বগতিতে একই পরিমাণ পণ্য আমদানির জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। রপ্তানি ও রেমিট্যান্স থেকে যে আয় আসছে, তা দিয়ে পণ্য ও সেবা আমদানির ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট তৈরি হয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার ব্যাপক পতন ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর কাছে প্রচুর ডলার বিক্রি করছে। তার পরও ডলারের দর কিছুটা বাড়াতে হচ্ছে। আমদানিকারকদের এখন ৯০ থেকে ৯২ টাকা দরে ডলার কিনতে হচ্ছে। আমদানির চাপে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। রিজার্ভ এখন ৪২ বিলিয়ন ডলারের নিচে। গত বছর রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল।
মূল্যস্ম্ফীতির কারণে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। কারণ প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। আবার জ্বালানি তেল, সার, গ্যাসসহ নানা খাতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ও সরবরাহ পর্যায়ে শুল্ক্ক ও ভ্যাট ছাড় দেওয়ার কারণে সরকারের রাজস্ব আয়েও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারাও সংকটে। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। পণ্য আনার জাহাজ ভাড়াও অনেক বেড়েছে। তারা স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে তৈরি পণ্যের জন্য বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করতে হয় না, এমন পণ্যের দামও বাড়ছে। দেশের ভেতরেও পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। একথা সত্য যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু পণ্যের দাম বাড়ার বাস্তব কারণ রয়েছে। তবে যতটুকু বাড়ার কথা তার চেয়েও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের একটি অংশ পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছেন।

মূল্যস্ম্ফীতির পরিসংখ্যান বনাম বাস্তবতা :বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত মূল্যস্ম্ফীতির পরিসংখ্যান রয়েছে গত মার্চ মাসের। মার্চে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ম্ফীতি হয়েছে ৬ দশমিক ২২ শতাংশ, যা গত প্রায় দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিবিএস যেসব পণ্য ও সেবার ভিত্তিতে হিসাব করে, সেগুলোর দাম গত বছরের মার্চের তুলনায় গড়ে এই হারে বেড়েছে। ফলে সবার ক্ষেত্রে মূল্যস্ম্ফীতি ৬ শতাংশের মতো তা মনে করার কোনো কারণ নেই। নিম্ন আয়ের মানুষ, যারা শুধু খাদ্য কিনতে তাদের আয়ের প্রায় সবটুকু ব্যয় করতে হয়, তাদের ক্ষেত্রে মূল্যস্ম্ফীতি আরও বেশি। গবেষণা সংস্থা সানেম কিছুদিন আগে এক গবেষণায় দেখায় যে, দিনমজুর, রিকশাচালাক বা এ ধরনের অন্যান্য পেশার মানুষের ক্ষেত্রে মূল্যস্ম্ফীতি ১০ শতাংশের বেশি। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের দাম এত বেশি বেড়েছে যে, যাদের নিত্যপণ্য কেনার বাইরে আর খরচ করার সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য মূল্যস্ম্ফীতির চাপ বেশি।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে : বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি মার্কেটস আউটলুকে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বে পণ্য সরবরাহে বড় ধরনের বাধার সৃষ্টি করছে। এ বছর গড়ে জ্বালানির দাম বাড়বে গত বছরের চেয়ে ৪২ শতাংশ। জ্বালানিবহির্ভূত অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়বে ২০ শতাংশ। গমের দাম বাড়বে ৪০ শতাংশ। প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম দ্বিগুণ হতে পারে। কয়লার দাম বাড়তে পারে ৮০ শতাংশ। পণ্যমূল্যের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে যুদ্ধ কতটা দীর্ঘায়িত হবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় তার প্রভাব কতটুকু থাকবে, তার ওপর। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অথবা রাশিয়ার ওপর বাড়তি নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে পণ্যমূল্য বিশ্বব্যাংকের বর্তমান প্রক্ষেপণের চেয়ে আরও বেড়ে যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক লেনদেনে ঘাটতি বাড়ছে :বিদেশের সঙ্গে লেনদেনে বাংলাদেশের চাপ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। রপ্তানির তুলনায় আমদানি ব্যয়ের পার্থক্য বেড়ে যাওয়ায় অনেক বড় অঙ্কের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু এ বছর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আয়ও কমেছে। ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি পৌঁছেছে রেকর্ড পর্যায়ে। সামগ্রিক পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) বিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৯১ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি। এ সময়ে রপ্তানি বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। আমদানি বেড়েছে ৪৪ শতাংশ। অন্যদিকে এই ৯ মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৫৩০ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ কম। সামগ্রিকভাবে চলতি অর্থবছরের ৯ মাস শেষে চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪০৭ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৫৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। রিজার্ভ রক্ষায় এবং আমদানি ব্যয় কমাতে কিছু পদক্ষেপ এরই মধ্যে নেওয়া হয়েছে। গাড়িসহ বিলাসপণ্যের আমদানিতে ৭৫ শতাংশ এলসি মার্জিন নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পরও এ সময়ে যাতে আমদানি দায় পরিশোধে কেউ যেন ব্যর্থ না হয় সে লক্ষ্যে ব্যাংকগুলোর কাছে প্রচুর ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০২ কোটি ডলার। এর বিপরীতে বাজার থেকে ৪৩ হাজার কোটি টাকার বেশি উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। এর আগে কোনো এক অর্থবছরে এত পরিমাণ ডলার বিক্রি হয়নি।