এলিটা কিংসলে। ৯ মে বাংলাদেশি ফুটবলার হিসেবে খেলার অনুমতি পেয়েছেন এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন্সের কাছ থেকে। এএফসি তাকে বাংলাদেশের ফুটবলার হিসেবেই নাম নিবন্ধন দিয়েছে। দিয়েছে নির্দিষ্ট আইডি নম্বরও। ফলে আগামী ১৮ মে ভারতে অনুষ্ঠিত এএফসি কাপে বাংলাদেশি হিসেবেই খেলতে যাচ্ছেন এলিটা। ২০১৬ সালে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করে ২০২১ সালের মার্চে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পান এলিটা কিংসলে। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের পাসপোর্টও হাতে পান তিনি। ২০১১ সালে প্রথম বাংলাদেশে খেলতে আসেন নাইজেরিয়ান এই ফুটবলার। ২০১২ সালে বাংলাদেশি মেয়ে লিজাকে বিয়ে করেন এলিটা।

এএফসি কাপে বাংলাদেশি এলিটা
বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার পর থেকেই নাইজেরিয়ান বংশোদ্ভূত ফুটবলার এলিটা কিংসলে বাংলাদেশ জাতীয় দলের জার্সিতে খেলার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। যদিও ফিফা এখনও ছাড়পত্র দেয়নি তাকে। তবে বসুন্ধরা কিংসের হয়ে এএফসি কাপে খেলার ছাড়পত্র পেয়েছেন তিনি। আগামী ১৮ মে কলকাতায় শুরু হচ্ছে এএফসি কাপ। বসুন্ধরার প্রথম ম্যাচ মাজিয়া স্পোর্টস অ্যান্ড রিক্রিয়েশন ক্লাবের বিপক্ষে। এরপর ২১ ও ২৪ মে বসুন্ধরা কিংস খেলবে মোহনবাগান ও গোকুলাম কেরালার বিপক্ষে।

এলিটা ও ইস্ট বেঙ্গল
এলিটার নাম শুনলেই ফুটবলপ্রেমীদের চোখে ভেসে ওঠে প্রথম শেখ কামাল গোল্ডকাপে চট্টগ্রাম আবাহনীর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সেই আবেগীয় ও আনন্দঘন দৃশ্য। এলিটার জোড়া গোলেই ইস্ট বেঙ্গলকে ৩-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আবাহনী। মাঠে এলিটার গোল করার ক্ষমতা সবার জানা। কিন্তু এই স্ট্রাইকারের সবচেয়ে বড় গুণ, অন্যান্য আফ্রিকান ফুটবলারের মতো তার নামে কোনো অভিযোগ নেই। ক্লাব কর্মকর্তা থেকে দর্শক- সবাই এলিটাকে ভদ্র ফুটবলার হিসেবেই সম্মান করেন। ২০১১ সালে বাংলাদেশে পা রাখার পর থেকে আরামবাগ, মুক্তিযোদ্ধা ও বিজেএমসি ক্লাবের হয়ে খেলেন।

একটু পেছনে ফিরে
২০০৬ সালে জন ওবি মিকেলের সঙ্গে অনূর্ধ্ব-২১ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন এলিটা। সে বিশ্বকাপে খেলেছিলেন লিওনেল মেসিও। মূলত সেই অনূর্ধ্ব-২১ বিশ্বকাপ দিয়েই নিজেকে জানান দিয়েছিলেন মেসি। সে যাক, নেদারল্যান্ডসে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে খেলার জন্য দেশ ছাড়ার আগের দিন প্রীতি ম্যাচে ইনজুরিতে পড়েছিলেন এলিটা। তবুও বিমানবন্দর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে। কিন্তু শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত ডাক্তার তাকে দেশে রেখে যেতে বাধ্য হন।

তাই আর বিশ্বকাপে নিজের কারিকুরি দেখাতে পারেননি এলিটা। তবে নাইজেরিয়ান প্রিমিয়ার লিগে দাপটের সঙ্গেই খেলেছেন দীর্ঘদিন। ২০১১ সালে প্রথম বাংলাদেশে খেলতে আসেন নাইজেরিয়ান এই ফুটবলার। এরপর তার স্বপ্ন এই লাল-সবুজকে ঘিরেই। বাংলাদেশে পেতেছেন সংসারও।

এলিটা-লিজা দাম্পত্যকথা
বাংলাদেশে আসার পর কিছুদিনের মধ্যেই আলোচনায় আসেন নাইজেরিয়ান এই স্ট্রাইকার। গাঁটছড়া বাঁধেন বাংলাদেশের মেয়ে লিজার সঙ্গে। ২০১২ সালের কথা। ক্লাবের অনুশীলন শেষে রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে প্রথম দেখেন লিজাকে। আস্তে আস্তে পরিচয়। তবে লিজার সঙ্গে পরিচয়ের বছরখানেক আগে বিবাহবিচ্ছেদ হয় লিজার। লিজার ছেলে ফারিয়ান মায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় এলিটার। লিজা প্রথমে তেমন ইংরেজি বলতে পারতেন না।
তখন মা ও কিংসলের মধ্যে অনুবাদক হিসেবে কাজ করত ফারিয়ান। পরিচয়ের কয়েক মাসের মাথায় এলিটাই বিয়ের প্রস্তাব দেন লিজাকে।
২০১২ সালের ২০ মে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন এলিটা ও লিজা।
২০১৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তাঁদের কোলজুড়ে আসে মেয়ে সাফিরা।

গোলমেশিন এলিটা
'বাংলাদেশের মানুষ আমাকে চেনে গোলের জন্য। আমি জাতীয় দলের হয়ে সেই গোলের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে চাই। তবে বাংলাদেশের ফুটবলে আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোলসংখ্যা খুব কম। ফরোয়ার্ডরা গোল মিস করেন এমন কথা অনেকেই বলেন। আমি বলব, বাংলাদেশে মেধাবী ফরোয়ার্ড আছেন। যে কোনো ফুটবলার গোল করতে চান। কেউ ইচ্ছা করে মিস করেন না। জীবন, জুয়েল সবাই গোলের জন্য মরিয়া।
আমি তাঁদের থেকে অভিজ্ঞতা ও শক্তি এ দুই জায়গায় এগিয়ে থাকব। এই দুটি দিয়ে আমি চেষ্টা করে যাব। তবে আবার আমার একটি বাড়তি চাপ ও নেতিবাচক দিকও থাকবে। আর সেটি হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষের আমার ওপর প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশার ফলে চাপটা বেশি থাকবে। পুরো ম্যাচে হয়তো আমি দুটি বা একটি গোলের সুযোগ পেতে পারি।

কোনো কারণে গোল না হলে আমার ওপর চাপ বাড়বে। আবার দেখা গেল তিনটির মধ্যে আমি একটি গোল করলাম, দুটি পারলাম না, তখনও আবার সমালোচনা হতে পারে। তবে সেই চাপ ও সমালোচনা আমি নেওয়ার মতো ক্ষমতা রাখি।
আমি কিছুদিনের মধ্যে শোনার অপেক্ষায় আছি যে জামাল বলবে, এলিটা দারুণ খেলেছে, ম্যাচ জয়ে তাঁর ভূমিকা রয়েছে; কোচ বলবেন, এলিটা আমার অন্যতম স্তম্ভ।'

বাংলাদেশের পাসপোর্টে নাইজেরিয়ার ভিসা ও আগামীর স্বপ্ন
এলিটার কাছে আগামীর স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আসলে ফুটবলের জন্য এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্বের জন্য আমি নাইজেরিয়ার নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছি। বিষয়টি কঠিন মনে হলেও আমি হাসিমুখেই তা করেছি। কেননা, আমি একজন ফুটবলার। আমি দেশের হয়ে ফুটবল খেলতে চাই। নাইজেরিয়ার হয়ে সেটা সম্ভব না।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে খেলছি। এখানকার সংস্কৃতি, পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছি। বিয়ে করেছি, বাচ্চাও রয়েছে। ফুটবলার হিসেবে অবসর নেওয়ার পরও বাংলাদেশেই থাকতে চাই। বাংলাদেশের ফুটবল উন্নয়নে কাজ করে যেতে চাই।

সরাসরি ক্লাব, ফেডারেশনে জড়িত না হয়েও ব্যক্তিগতভাবে ফুটবল বা ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়ন করা যায়। আমি সেই পথেও হাঁটতে পারি।'
এলিটার হাত ধরে বাংলাদেশের ফুটবল হয়তো আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে- এমন প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি!