সিডর, আইলার পর আম্পান সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করে আমাদের উপকূলে। ঘূর্ণিঝড়ে গৃহহীন মানুষের কাছে ক্ষুধা যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা অনেকটাই উপেক্ষিত। অথচ এই দুর্যোগ আর টিকে থাকার লড়াইয়ের মধ্যেও একদল শিক্ষক প্রাণান্তর চেষ্টা করেন একটি স্কুল বাঁচানোর। এই স্কুলকে ঘিরে তাদের রাজ্যের স্বপ্ন। কিন্তু সুপার সাইক্লোন আম্পান সেই স্বপ্নের দেয়াল ভেঙে দেয়! ঘূর্ণিঝড়ে তছনছ হয়ে যায় স্কুল।

ফলে উপকূলে শিক্ষার আলো প্রায় নিভু নিভু। আর ঠিক তখনই আমরা জানতে পারি স্কুলটির কথা। বলছি সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে লড়াই করে দাঁড়িয়ে থাকা দেলুটি নামের ছোট্ট একটি গ্রামের লন্ডভন্ড দেলুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কথা। গিয়ে দেখি, কয়েকটি মাটির ঘর, ভাঙা কিছু বেঞ্চ আর উপড়ে পড়ে আছে টিনের চাল। শিক্ষক আর গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, ২০ বছর আগে প্রতিষ্ঠা হয়েছে বিদ্যালয়টি। উপকূলের অসংখ্য ছেলেমেয়ে এই বিদ্যালয়ের আঙিনা পেরিয়ে কেউ হয়েছে প্রভাষক, কেউবা ইঞ্জিনিয়ার। উত্তীর্ণ হয়েছেন বিসিএসে। ছাত্রছাত্রীদের জীবন বদলাতে পারলেও স্কুলটির জীবন বদল হয়নি। গ্রামের এই একমাত্র স্কুলে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করা প্রধান শিক্ষক বলেন, 'আমরা বেতন চাই না, শুধু ছাত্রছাত্রীদের পড়াতে চাই, ওরা পড়তে চায়, আমাদের স্কুলটি একটু পুনর্গঠন করে দিন।'

আর স্থির থাকতে পারিনি। ২০২০ সালে নেমে পড়ি স্কুলটি পুনর্নির্মাণের কাজে। এবার ছোট করে বলি আমাদের কথা। আমরা কাণ্ডারি, খুব ছোট একটা অলাভজনক সংগঠন। আমাদের প্রধান লক্ষ্য, উপকূলের জীবনযাত্রা আর শিক্ষা উন্নয়নে কাজ করা। পাশাপাশি আমরা উত্তরবঙ্গে শীতবস্ত্র বিতরণ, করোনাকালে চার জেলায় জরুরি খাবার সরবরাহ ছাড়াও প্রতি ঈদে ঈদবাজার করে দিয়ে আসছি যশোর, খুলনা ও কুষ্টিয়ায়। সে যাক, আমরা জানি উপকূলে কাজ করা কত কঠিন। তবু ঠিক করি, যত বাধাই আসুক স্কুলটি পুনর্নির্মাণ করবই। প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ শুরু করতে আমাদের সাত মাস লেগে গিয়েছিল, কারণ শুরুর দিকে আমাদের সহযোগিতা করার মতো পাশে তেমন কেউই ছিল না।

ইট, বালু নিতে আমাদের লেগেছিল ঠিক সাত দিন। কারণ, নদীপথই হলো এখানে আসার একমাত্র পথ। অনেক পরিশ্রম শেষে আজ স্কুলের পুনর্গঠনের কাজ প্রায়ই শেষ। শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে লাইব্রেরি, যোগ হয়েছে দুই শতাধিক গল্প-উপন্যাস ও ছড়া-কবিতার বই। লাইব্রেরিতে বসেছে কম্পিউটার। কাণ্ডারির দক্ষ স্বেচ্ছাসেবকরা স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের শেখাচ্ছে কম্পিউটার। ২০২২ সাল শুরু করেছি ছোটদের লার্নিং এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম দিয়ে। এই প্রোগ্রামের লক্ষ্য, ছাত্রছাত্রীদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি স্বাধীন এবং উদ্ভাবনী চিন্তায় সাহায্য করা। এই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা এখন আমাদের টিমের সঙ্গে গ্রামে জরিপ করছে, মানুষের সমস্যার তালিকা করে দলবদ্ধভাবে তা সমাধানের চেষ্টা করছে। শুধু তাই নয়, আজ স্কুল প্রাঙ্গণে ছোটদের কোলাহলে ভরে উঠেছে। ছোটদের এমন উচ্ছ্বাসের জন্যই কাজ করে যেতে চাই। উপকূলের এই স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীরাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে একদিন।