ভোজ্যতেল নিয়ে বিশ্বব্যাপী চলছে 'তেলেসমাতি'। পণ্যটির দাম এমন পর্যায়ে উঠেছে যে, 'নাকে তেল দিয়ে ঘুমানো' তো দূরের কথা, নিত্যদিনের রান্নার জন্য তা সংগ্রহ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে অনেকের জন্য। কোথাও কোথাও ক্রেতা-বিক্রেতা সম্পর্ক গিয়ে ঠেকেছে 'তেলেবেগুনে'। বৈশ্বিক এই পরিস্থিতিতে মোট চাহিদার ৯০ ভাগ আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ পড়েছে খুবই সংকটে। সরবরাহ ঠিক রাখতে অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াসহ নানা চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদন বাড়ানো, পণ্যটির ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দিচ্ছেন নীতিনির্ধারকরা।

তেলের বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে বড় দেশগুলো ভোজ্যতেলের বিকল্প খুঁজতে যখন ব্যস্ত, তখন বাংলাদেশেও আলোচনা চলছে সয়াবিন ও পাম অয়েলের বিকল্প নিয়ে। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, ঠিকঠাক পরিকল্পনা করতে পারলে রাইস ব্র্যান, সরিষা, সূর্যমুখী তেলের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এতে আমদানিনির্ভরতা কমবে।

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও সরকারের সংশ্নিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, ভোজ্যতেলের উৎপাদন বাড়িয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সেজন্য সরকারের যেমন পরিকল্পনা দরকার, তেমনি দরকার নীতি-সহায়তা। সরিষা, সূর্যমুখীসহ বিভিন্ন তেলবীজের চাষ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে দেশে। অনেক জমিই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে পতিত থাকে। যেখানে সরিষা চাষ হতে পারে। আবার চরাঞ্চলে সূর্যমুখীর চাষের সম্ভাবনাও রয়েছে। এজন্য চাষিদের আগ্রহী করে তুলতে বীজ ও ঋণ সুবিধা দিতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদিত ফসল বিক্রির বাজার নিশ্চিত করতে হবে। দরকার তেলবীজ প্রক্রিয়াজাত খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা।

এর বাইরে ধানের কুঁড়া থেকে তেল (রাইস ব্র্যান) তৈরিতেও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। দেশে যে পরিমাণ ধান উৎপাদন হয়, তার অর্ধেক কুঁড়া রাইস ব্রানের জন্য ব্যবহার করা গেলে কয়েক লাখ টন তেল উৎপাদন সম্ভব। বছর দশেক আগে বাংলাদেশে রাইস ব্র্যান তেলের ব্যবসা শুরু হয়। এমারেল্ড অয়েল নামের একটি কোম্পানি বাজারে ধানের কুঁড়ার এই তেল নিয়ে আসে। কিন্তু নানান সংকটে এ খাতটি এগোতে পারেনি। কাঁচামালের সংকট, অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি বা ভেজালসহ বিভিন্ন কারণে কয়েকটি কোম্পানি বিনিয়োগ করেও উৎপাদন থেকে সরে এসেছে। যদিও বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এ খাতে সম্ভাবনা দেখছেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, দেশে বছরে প্রায় সাত লাখ টন রাইস ব্র্যান তেল উৎপাদন সম্ভব। বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন উৎপাদন হয়। সাত বছর আগে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন এ নিয়ে একটি গবেষণা করে। তাতে দেখা যায়, বছরে অন্তত আট লাখ টন রাইস ব্র্যান তেল উৎপাদন সম্ভব।

বাংলাদেশে তেলবীজ হিসেবে সরিষা, তিল, তিসি, সয়াবিন, সূর্যমুখী ও বাদামের চাষ হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে আট লাখ চার হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন তেলবীজ চাষ হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, সব মিলিয়ে স্থানীয়ভাবে ভোজ্যতেলের উৎপাদন দুই লাখ তিন হাজার টন।

তবে সংশ্নিষ্টরা বলছেন, দেশের আদি ফসল হিসেবে পরিচিত সরিষার উৎপাদন খুব বেশি বাড়ানো যায়নি। চাহিদা থাকার পরও উৎপাদন স্বল্পতায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতি লিটার বিক্রি করছে ৩৫০ টাকারও বেশি দামে। উৎপাদন বাড়ালে দাম কমিয়ে আনা সম্ভব।

ট্যারিফ কমিশনের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৫ সালে আড়াই লাখ টন রাইস ব্র্যান অয়েল উৎপাদন সক্ষমতার ১৫টি কারখানা স্থাপিত হয়। এই তেল উৎপাদনের জন্য ১৩ লাখ টন রাইস ব্র্যান দরকার। দেশে বছরে ৩৬ লাখ টন ধানের কুঁড়া উৎপাদন হয়। সাড়ে ছয় কেজি চালের কুঁড়া থেকে এক কেজি রাইস ব্র্যান অয়েল আসে। কিন্তু কোম্পানিগুলো কুঁড়া পাচ্ছে না। কুঁড়া গরু, হাঁস, মুরগি, মাছের খাবার ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। অপরদিকে কুঁড়ার আনুষ্ঠানিক বাজার নেই। অটো রাইস মিলগুলোও আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। যে কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানই উৎপাদন থেকে সরে গেছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০টি প্রতিষ্ঠান রাইস ব্র্যান উৎপাদনের লাইসেন্স নিয়েছে।

সরিষা ও সূর্যমুখী তেলের সম্ভাবনা :দেশে সরিষার তেলের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। গবেষকরা বলছেন, আগামী পাঁচ বছর পর্যন্ত প্রায় ছয় শতাংশ হারে বাড়বে এই বাজার। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে বেড়েছে সরিষার তেলের ব্যবহার। কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান সরিষার তেলের ব্যবসা করছে। প্রাণ, উইলমার ইন্টারন্যাশনাল, অভিজাত ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল, পারটেক্স স্টার গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, এসিআই, স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, ওরিয়ন গ্রুপ এবং ফামরুটস উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ছোট ছোট দোকানও লেবেলবিহীন বোতলে সরিষার তেল বাজারজাত করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চরাঞ্চলে সূর্যমুখীর উৎপাদন বাড়ানোরও সুযোগ আছে।

এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ মোহাম্মাদ আসাদুজ্জামান সমকালকে বলেন, দেশে সরিষাসহ অন্যান্য তেলবীজের চাষ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সেজন্য কৃষকদের চাষে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ভর্তুকি ও ঋণের ব্যবস্থা করা দরকার হবে। পাশাপাশি উৎপাদিত তেলবীজের বাজার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকরা যাতে উৎপাদিত ফসল লাভজনক দামে বিক্রি করতে পারেন সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার। রাইস ব্র্যানের উৎপাদন বাড়াতে অটোরাইস মিলগুলোর কুঁড়া যাতে রাইস ব্র্যানের জন্য সরবরাহ করা হয়, সেই ব্যবস্থাপনায় যেতে হবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উপকরণ) বলাই কৃষ্ণ হাজরা সমকালকে বলেন, সরিষা, বাদাম, সূর্যমুখী, সয়াবিনসহ বিভিন্ন তেলবীজ চাষ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। আমন ও বোরোর মাঝে সরিষা চাষ করা যায় কিনা তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। চর এলাকায় সূর্যমূখী চাষ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী রবি মৌসুমে সরিষাসহ অন্যান্য তেলবীজের চাষ দ্বিগুণ করা হবে। পাশাপাশি রাইস ব্র্যান তেলের জন্য কুঁড়া ব্যবস্থাপনা নিয়েও কাজ হচ্ছে।

বর্তমানে তেলবীজের চাষাবাদ :কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর ধরে দেশে সরিষার চাষ বাড়ছে। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে ছয় লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। সাড়ে আট লাখ টন সরিষা উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। গত অর্থবছরে দেশে পাঁচ লাখ ৮৯ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়। উৎপাদন হয় সাত লাখ ৮৭ হাজার টন। অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (উপকরণ) ড. সৈয়দ মো. রফিকুল আলম সমকালকে জানিয়েছেন, আগামীতে আমন চাষের পরের সময়ে ৮০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে উৎপাদন হয়- এমন জাতের সরিষা চাষ বাড়ানো হবে। ডিএই সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে ৭৯ হাজার হেক্টর জমিতে সয়াবিন এবং ১৫ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। চীনা বাদাম চাষের লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ ৯৭ হাজার হেক্টর জমিতে। এ ছাড়া দেশে সামান্য পরিমাণে তিল, তিসির চাষ হয়। এর বাইরে জলপাই থেকেও সামান্য তেল পাওয়া যায়। এসব সয়াবিন ও পাম অয়েলের বিকল্প হতে পারে।

ভোজ্যতেলের চাহিদা, আমদানি ও উৎপাদন :দেশে বছরে প্রায় ২০ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে আমদানি হয় প্রায় ১৮ লাখ টন। অভ্যন্তরীণভাবে বিভিন্ন তেল উৎপাদন হয় দুই লাখ তিন হাজার টনের মতো। আমদানির মধ্যে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল প্রায় পাঁচ লাখ টন। সয়াবিন বীজ আমদানি হয় প্রায় ২৪ লাখ টন, যা থেকে চার লাখ টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল পাওয়া যায়। অপরিশোধিত পাম অয়েল আমদানি হয় ১১ লাখ টন।
ভোজ্যতেলের আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি :ইন্দোনেশিয়া ২৮ এপ্রিল থেকে আরবিডি পাম অয়েল রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেয়। যদিও আগামী সোমবার থেকে এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। শ্রমিক সংকটে মালয়েশিয়ায় পাম অয়েলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। খরায় লাতিন আমেরিকায় সয়াবিনের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সূর্যমুখী তেলের সরবরাহ ৬০ ভাগ কমেছে, যার প্রভাবে সয়াবিনের চাহিদা ও দাম বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার বর্তমানে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল দুই হাজার ডলারে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি টন পাম অয়েলের দাম উঠেছে এক হাজার ৯৫০ ডলারে। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে।