দেশের বিভিন্ন চর অঞ্চলে ডাল ও তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন হচ্ছে। ধানের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত না করে অতিরিক্ত ফসল হিসেবে আর কোথায় কোথায় এসব ফসলের উৎপাদন করা যায়, এসব খুঁজে বের করতে একটি কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে ভোজ্যতেলের চাহিদার ৪০ ভাগ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব হবে। সমকালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক এমন মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি ও নানা প্রণোদনার ফলে গত এক যুগে দেশে তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। ২০০৯ সালে এ জাতীয় ফসলের উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৬০ হাজার টন। ২০২০-২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ টনে। তারপরও বাংলাদেশে ভোজ্যতেলের ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। এতে বছরে ২০০ কোটি ডলারের বেশি খরচ হচ্ছে। দেশে তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনের মূল সমস্যা জমির স্বল্পতা। এ ছাড়া ধানসহ অন্যান্য ফসলের তুলনায় কৃষকরা এ ফসল চাষে কম আগ্রহী। বর্তমানে দেশে ফসল আবাদের ৭৫ শতাংশ জমিতে দানাজাতীয় ফসলের চাষ হয়। অন্যদিকে, ক্রমেই তেলের ব্যবহার বাড়ছে। তবে চাহিদার তুলনায় দেশে উৎপাদন অনেক কম হওয়ায় প্রতি বছর শতকরা ৯০ ভাগ ঘাটতি থাকছে। ঘাটতি মোকাবিলায় বিদেশ থেকে ভোজ্যতেল আমদানি করতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। স্থানীয় উৎপাদনে ভোজ্যতেলের মূল উৎস হলো সরিষা এবং সামান্য পরিমাণে সূর্যমুখী, সয়াবিন, তিল ও রাইস ব্র্যান, যা থেকে মোট ৫ লাখ টনের কাছাকাছি ভোজ্যতেল পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, আমরা আমদানির অর্ধেকও উৎপাদন করতে পারি কিনা, তা দেখতে হবে। আমাদের সে সক্ষমতা রয়েছে। কোথায় কোথায় সরিষার উৎপাদন বাড়ানো যায়, তা নির্ধারণ করতে হবে। এক্সটেনশন সিস্টেমের উন্নয়ন করতে হবে, যাতে দ্রুত এর উৎপাদন বাড়ে। তিনি জানান, তেলজাতীয় ফসল আবাদে উৎপাদন খরচ কম এবং লাভ বেশি। এ বিষয়ে কৃষিবান্ধব শেখ হাসিনার সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় বীজ, সার, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ প্রদানসহ সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে আবাদি জমির মাত্র ৪ শতাংশ তেলবীজ উৎপাদনে ব্যবহূত হয়। এ বাস্তবতাকে বিবেচনায় এনে আমাদের এখনই তেল ফসলের চাষাবাদ বাড়ানো প্রয়োজন। ইতোমধ্যে আমাদের বিজ্ঞানীরা উচ্চ ফলনশীল ও স্বল্পকালীন উন্নত জাতের সরিষার জাত উদ্ভাবন করেছেন। এগুলোর চাষ দ্রুত কৃষকের কাছে ছড়িয়ে দিয়ে জনপ্রিয় করতে পারলে ধানের পাশাপাশি সরিষাসহ তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। সে লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় সমন্বিত কর্মসূচি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। ডাল ও তেলবীজ জাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে মন্ত্রণালয়। ২৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া 'তেল জাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি' নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে নেওয়া প্রকল্প ২৫০টি উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রচলিত শস্য বিন্যাসে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষিত স্বল্পমেয়াদি তেল ফসলের আধুনিক জাত অন্তর্ভুক্ত করে সরিষা, তিল, সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, সয়াবিনসহ তেল ফসলের আবাদ এলাকা ২০ শতাংশ বাড়ানো হবে।

মন্ত্রী বলেন, তেলজাতীয় ফসলের আবাদ বৃদ্ধিতে দেশের চরাঞ্চল, উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকার অনাবাদি পতিত জমিতে তেল ফসলের চাষ ও ক্রপিং প্যাটার্ন বা শস্যবিন্যাস পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। দেশের চরাঞ্চলে এক লাখ হেক্টরের বেশি পতিত জমি রয়েছে, যার কমপক্ষে ৫০ ভাগ জায়গায় অর্থাৎ প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ করা সম্ভব। বাংলাদেশের প্রায় ২৫ শতাংশ উপকূলীয় এলাকা। এ এলাকার ১৮টি জেলার ১০ লাখ হেক্টরের বেশি জমি বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ত। এর মধ্যে অনেক জমি অনাবাদি রয়েছে বা বছরে একটি ফসল হচ্ছে। লবণসহিষ্ণু জাতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে এগুলোকে চাষের আওতায় আনা হচ্ছে এবং বছরে একাধিক ফসল হচ্ছে। সম্প্রতি ভোলা, পটুয়াখালী ও বরিশাল সফরে গিয়ে দেখেছি সেখানে ডাল ও তেল ফসলের চাষ হচ্ছে। এছাড়া, ক্রপিং প্যাটার্ন বা শস্যবিন্যাসের মধ্যে তেল ফসল অন্তর্ভুক্ত করে আবাদি এলাকা বাড়ানো হচ্ছে। যেমন- আমন মৌসুমে স্বল্পজীবনকালীন বিনা-১৬, ১৭, বা ব্রি ধান-৭১ চাষ করে সরিষার মৌসুমে বিনা সরিষা-৯, ১১ বা বারি সরিষা ১৪, ১৭ চাষ করে পরবর্তীকালে বোরোতে ব্রি ধান-২৮ অথবা ৮৮ বোরো ধান চাষ করা হচ্ছে। এতে ধানের উৎপাদন কমছে না; বরং কৃষকেরা অতিরিক্ত ফসল হিসেবে সরিষা পাচ্ছেন, যার ফলন বিঘাতে ৫-৬ মণ। এর মাধ্যমে কৃষকের প্রতি বিঘাতে লাভ ৪০-৪৫ হাজার টাকা। এ শস্যবিন্যাস সারাদেশে
ছড়িয়ে দিতে পারলে ২০ লাখ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ বাড়ানো সম্ভব।

মন্ত্রী বলেন, ভুট্টা থেকেও তেল উৎপাদন সম্ভব। ভুট্টা বাংলাদেশে সম্ভাবনাময় ফসল। বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু ভুট্টা চাষের অনুকূলে। দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত জমিতেও ভুট্টার ভালো ফলন হচ্ছে। কৃষকদের কাছেও ভুট্টা চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে। ফলে ভুট্টার উৎপাদন বাড়ছে। দেশে ভুট্টা চাষের মোট আবাদি জমি সাড়ে ৫ লাখ হেক্টরেরও বেশি। উৎপাদন বছরে ৫৬ লাখ টন। দেশে উৎপাদিত ভুট্টার অধিকাংশই প্রাণী, হাঁস-মুরগির ফিড ও মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহূত হয়। ভুট্টার খই, মিষ্টি ভুট্টা মানুষের খাদ্য হিসেবেও বেশ গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। তবে বছরে উৎপাদিত ৫৬ লাখ টন ভুট্টা থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন ভুট্টার তেল প্রতি বছর আহরণ করা সম্ভব. যার বাজারমূল্য প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। ভুট্টার তেল
তৈরির পাশাপাশি ভুট্টা থেকে কর্ন ফ্ল্যাক্স ও কর্ন চিপস তৈরি করাও সম্ভব।

কৃষিমন্ত্রী মনে করেন, দেশে শিল্পকারখানা স্থাপন করে বাণিজ্যিকভাবে ভুট্টার তেল উৎপাদন করতে পারলে একদিকে যেমন বিদেশ থেকে তেল আমদানি কমবে, অন্যদিকে তেলের দেশজ উৎপাদন বাড়বে। উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে কৃষক লাভবান হবেন। পাশাপাশি দেশের মানুষের পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতে সহায়ক হবে।

কৃষিমন্ত্রী আরও বলেন, এক সময় দেশে ব্যাপকভাবে সরিষা চাষ হতো। সরিষার তেলই মানুষ ব্যবহার করত। আস্তে আস্তে সরিষা উঠে গিয়ে সয়াবিন ও পাম অয়েল এসেছে। কারণ, সরিষার জমিতে মানুষ ধান চাষ শুরু করে। উৎপাদনশীলতা কম বলে সরিষা টিকে থাকতে পারেনি। এখন আমাদের বিজ্ঞানীরা সরিষা ও সয়াবিনের উন্নত জাত আবিস্কার করেছেন। বিভিন্ন চর অঞ্চলে ধানের পাশাপাশি সয়াবিন, সূর্যমুখী ও সরিষা চাষ হচ্ছে। সয়াবিন মূলত আমাদের দেশের ফসল নয়। এটি চাষ হয় শীতল অঞ্চলে। অথচ এখন উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সয়াবিন চাষ হচ্ছে। সম্প্রতি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে গিয়ে সয়াবিন চাষ দেখে আমি অবাক হয়েছি। এভাবে যদি উপকূলের লবণাক্ত ও পতিত জমিগুলোতে সয়াবিন চাষ হয়, তাহলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ৪০ ভাগ তেলের জোগান স্থানীয়ভাবেই মেটানো সম্ভব হবে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাহিদুর রহমান