সমকাল :দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার মূল কারণ কী বলে মনে করেন?
ড. সাইদুর রহমান :দেশে ভোজ্যতেলের যে চাহিদা আছে তার মাত্র ২০ শতাংশের মতো দেশে উৎপাদন হয়, যার কারণে আমাদের চাহিদার প্রায় ৭০-৮০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়া থেকে আমাদের দেশে তেল আমদানি বেশি হয়। বিশেষ করে পাম অয়েল। বর্তমানে তাদের দেশেই তেলের অভ্যন্তরীণ চাহিদায় টান পড়েছে। ইন্দোনেশিয়া পরিশোধিত পাম অয়েল রপ্তানি বন্ধও করেছে। যখনই ব্যবসায়ীরা জানতে পারেন, কোনো পণ্যের আমদানি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা কমে যাচ্ছে, তখনই তারা আগের মজুতকৃত পণ্যের দাম হঠাৎ করেই বাড়িয়ে দেন। যেমনটি আমরা আগে দেখেছি পেঁয়াজের ক্ষেত্রে। এখন তেলের ক্ষেত্রেও এমনটি দেখা গেল। তেলের যে খুব বেশি অপ্রতুলতা আমি সেটি বলব না। আসলে ব্যবসায়ীদের যে কৌশলগত পরিকল্পনা তার সঙ্গে সরকারের পলিসির মিল হচ্ছে না। এটিই মূল কারণ বলে আমি মনে করি, যার করণে ব্যবসায়ীরা হঠাৎ করেই সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসে তেলের দাম ৩৮-৪০ টাকা বাড়াতে পেরেছেন। ব্যবসায়ীদের কথায় হঠাৎ করে তেলের দাম এত বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি ঠিক ছিল না।

সমকাল :ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে বিকল্প কী?
ড. সাইদুর রহমান :দেশে তেলবীজের উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানি কমানো সম্ভব। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ভোজ্যতেল আমদানির অর্থ সাশ্রয় যায়। দেশের সরকারপ্রধান বিষয়টি আমলে নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে যথাযথ নির্দেশনা দিয়েছেন। এটি একটি সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কৃষি অর্থনীতির একজন গবেষক হিসেবে আমি একে স্বাগত জানাই। আশা করছি, কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং জাতীয় কৃষি গবেষণা সংস্থার সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

এক্ষেত্রে দেশীয় তেলজাতীয় শস্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে। দেশে মোট তেলবীজ উৎপাদনের সক্ষমতা বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, উফশী জাতের সরিষার বেশকিছু জাত আবিস্কার হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত বারি সরিষা-৯, বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৫, বারি সরিষা-১৬ ও বারি সরিষা-১৭ এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত বিনা সরিষা-৫, বিনা সরিষা-৭, বিনা সরিষা-৯ ও বিনা সরিষা-১০। এ ছাড়া রয়েছে রাই সরিষা ও টরি ৭। এগুলোর হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার কেজি। উৎপাদন সময়কাল গড়ে ৮০-১১০ দিন।
তেলবীজ হিসেবে সয়াবিনের গুরুত্ব কোনোভাবেই কম নয়।

দেশে উৎপাদিত সয়াবিনের জাতগুলো হলো- বারি সয়াবিন-৫ ও বারি সয়াবিন-৬, সোহাগ, বিনা সয়াবিন-১, বিনা সয়াবিন-২, বিনা সয়াবিন-৩, বিনা সয়াবিন-৪, ইট সয়াবিন-১ ও বাংলাদেশ সয়াবিন ৪ (জি২)। এ ছাড়া চীনাবাদাম থেকেও তেল পাওয়া যায়। এগুলোর জাতের মধ্যে রয়েছে বারি চীনাবাদাম-৫, বারি চীনাবাদাম-৬, বারি চীনাবাদাম-৭, বারি চীনাবাদাম-৮ ও বারি চীনাবাদাম-১০। বিনা উদ্ভাবিত জাত হলো- বিনা চীনাবাদাম-৬। এ ছাড়া রয়েছে ঢাকা-১, ডিজি-২, ডিএম-১ ও ঝিঙা বাদাম। এগুলো থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদিত হয়।
সূর্যমুখী থেকে স্বল্প পরিমাণে ভোজ্যতেল উৎপাদিত হয়। দেশে কৃষক পর্যায়ে বারি সূর্যমুখী-২-এর পরিচিতি রয়েছে এবং এলাকাভেদে কৃষক সূর্যমুখীর আবাদ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে ভোজ্যতেল হিসেবে সূর্যমুখী তেলের কদর বেড়েছে।

ভোজ্যতেলের একটি পরিচিত উৎস হলো তিল, যা কৃষকরা বংশপরম্পরায় বহু বছর ধরে আবাদ করে আসছেন। দেশে উৎপাদিত জাতের মধ্যে বারি তিল-২, বারি তিল-৩, বারি তিল-৩, বারি তিল-৪, বিনা তিল-১, বিনা তিল-২, বিনা তিল-৩, বিনা তিল-৪ উল্লেখযোগ্য। তিলের উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কেজি এবং উৎপাদন সময়কাল গড়ে ৯০-১০০ দিন।

সমকাল :ভোজ্যতেলের ঘাটতি পূরণে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী হতে পারে?
ড. সাইদুর রহমান : আমাদের আছে সরিষা, তিল, সূর্যমুখী এবং তিসি। এই শস্যগুলোরই আমরা অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদন বাড়াতে পারি। এক্ষেত্রে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তাঁদের উচ্চ ফলনশীল তেলশস্যের বীজ দিয়ে সহায়তা করতে হবে। তেল ফসলের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন যতক্ষণ পর্যন্ত বৃদ্ধি না পাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে হবে। এতে কৃষক আগ্রহ পাবেন। আমাদের দেশে সয়াবিন উৎপাদনের সুযোগ আছে। অন্যান্য তেলজাতীয় শস্য থেকে সয়াবিনের উৎপাদন বেশি হয়। কিন্তু সয়াবিন থেকে তেল নিস্কাশনের জন্য কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখনও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। এ ক্ষেত্রে এ ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান তৈরিতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে এবং প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা করতে হবে। তাহলে ধীরে ধীরে সংকট কাটবে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের অনেক ঘাটতি রয়েছে তেলের ক্ষেত্রে। এজন্য কীভাবে আমদানিনির্ভরতা কমানো যায়, সে ব্যাপারে সরকারকে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আশিকুর রহমান