পৃথিবীর মাটি, পানি ও বায়ুতে বসবাসকারী সব উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীবের মধ্যে যে জিনগত, প্রজাতিগত ও পরিবেশগত (বাস্তুতান্ত্রিক) বৈচিত্র্য দেখা যায় তাকেই জীববৈচিত্র্য বলে। মানুষের মৌলিক চাহিদা যেমন- খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার জোগান বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে আসে। প্রজাতির বৈচিত্র্য যত বাড়বে বা প্রজাতির সংখ্যা যত বাড়বে, সেই বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য তথা স্থিতিশীলতা তত বাড়বে। অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয় তথা সুস্থতার সঙ্গে জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজন সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের।

জীববৈচিত্র্য বাস্তুতন্ত্রের উৎপাদনশীলতা ত্বরান্বিত করে, যেখানে প্রতিটি প্রজাতির, যত ছোটই হোক না কেন, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যেমন- অধিকসংখ্যক উদ্ভিদ প্রজাতি মানে বিভিন্ন ধরনের ফসল, বৃহত্তর প্রজাতির জীববৈচিত্র্য সব প্রাণের প্রাকৃতিক ধারণক্ষমতা নিশ্চিত করে, স্বাস্থ্যকর বাস্তুতন্ত্র বিভিন্ন দুর্যোগ প্রতিরোধ করে। প্রায় সব সংস্কৃতির শিকড়ে রয়েছে আমাদের জীববৈচিত্র্য; তাই বিভিন্ন কারণে জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতি আমাদের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়।

জীববৈচিত্র্য সুরক্ষিত থাকলে আমাদের প্রত্যেকের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক পরিষেবা পাওয়াও সহজ হয়। ইকোসিস্টেম সেবা :পানিসম্পদ রক্ষা, মাটি গঠন ও সুরক্ষা, পুষ্টি সঞ্চয় এবং পুনর্ব্যবহার, দূষণ রোধ; জলবায়ু স্থিতিশীলতায় অবদান : খাদ্য, রোগ নিরাময়যোগ্য সম্পদ এবং ফার্মাসিউটিক্যাল ওষুধ, কাঠের পণ্য, ভবিষ্যৎ সম্পদের সংস্থান, জিন, প্রজাতি এবং বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্য। দারিদ্র্য নিরসন ও উন্নয়নে জীববৈচিত্র্য ব্যাপক অবদান রেখে চলছে। বিশ্ব অর্থনীতির ৪০ শতাংশ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চাহিদার ৮০ শতাংশ জৈব সম্পদ থেকে আসে। জীববৈচিত্র্য টেকসই উন্নয়ন, মানবকল্যাণ ও টেকসই জীবিকার জন্য অপরিহার্য, বৈশ্বিক এবং স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, মানব স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য ও পরিষেবা সরবরাহ করে।

কার্যকর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল দেশের প্রাকৃতিক বন উদ্বেগজনক হারে সংকুচিত হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও বিভিন্ন স্থাপনার পাশাপাশি রাস্তাঘাট নির্মাণ প্রাকৃতিক বন দ্রুত হ্রাসে অবদান রেখে চলেছে। বনজসম্পদের ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলায় প্রাকৃতিক বন পুনর্গঠনে বাস্তবসম্মত কার্যক্রম গ্রহণ অপরিহার্য।
জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট কারণে সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেরও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। আমাদের দেশের সুন্দরবন উপকূলের বিশাল এলাকায় জীববৈচিত্র্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের খারাপ দিকগুলো লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মানুষের দ্বারা অবৈধ উপায়ে গাছপালা ও বন্যপ্রাণী নিধন নদ-নদী দখল-ভরাট-দূষণ, বন উজাড়, পাহাড় কাটা, দারিদ্র্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি ও বায়ুদূষণ, শিল্প-কারখানার দূষণ, মাত্রাতিরিক্ত ও ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার, ভূগর্ভস্থ পানির অত্যধিক উত্তোলনে বাংলাদেশের পরিবেশ আজ বিপর্যস্ত।

এ অবস্থায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এখন জরুরি ভিত্তিতে ভূতাত্ত্বিক, জলজ ও সামুদ্রিক পরিবেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ড্রেজিং করে নদীর নাব্য বৃদ্ধি এবং ভারতের সঙ্গে পানি চুক্তির সঠিক বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের অনুকূলে সংরক্ষিত বনাঞ্চল বরাদ্দ দেওয়া যাবে না। উন্নয়ন ও জীববৈচিত্র্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। নির্বিচারে বনভূমি উজাড় রোধ এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল যথাযথ ব্যবস্থাপনা, বন এবং বন্যপ্রাণী যে আমাদের জীবনের অংশ সে বিষয়ে জনসাধারণকে সম্যক ধারণা দিতে হবে এবং সচেতন করতে হবে।