রাতে হঠাৎ ঝোড়ো বৃষ্টি বেশ চিন্তায় ফেলে দেয় সবাইকে। রাত পোহালেই উৎসব। যদিও প্রস্তুতি ছিল বিকল্প ব্যবস্থার। তারপরও চিন্তার ভাঁজ কপালে। গতকাল রাতেই দূরবর্তী অঞ্চলের অনেক প্রতিযোগী ঢাকায় আসার খবর জানায়। কম দূরত্ব থেকে আসা শিক্ষার্থী সকালে আসবে ভেন্যুতে। এমন রাতে আকাশের কালো মেঘ সবার জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ২০ মে শুক্রবার। আঞ্চলিক উৎসবে বিজয়ীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পর্বের দিন। সব ছাপিয়ে সকালের সূর্য যেন শুভ কামনা নিয়ে উদিত হলো। আকাশে মেঘ নেই। বৃষ্টি নামার সম্ভাবনাও কমেছে। তাহলে আর কী! এবার উৎসব জমবে দারুণ। উৎসাহ-উদ্দীপনার শেষ নেই। কাকডাকা ভোর থেকে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে শুরু করে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজবেষ্টিত মায়াময় ক্যাম্পাসে। সঙ্গে আছেন যথারীতি অভিভাবক ও শিক্ষকরা।

সব বাধা পেরিয়ে এবার এলো শুভক্ষণ। শিক্ষার্থীদের ক্যাটাগরি অনুযায়ী সারিবদ্ধভাবে একত্রিত করেন স্বেচ্ছাসেবকরা। এরই মধ্যে অতিথিরাও এসে গেছেন। বেজে ওঠে জাতীয় সংগীত। সংগীতের তালে তালে বাংলাদেশ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড (বিডিবিও) ও সমকালের পতাকা উত্তোলন করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. দিল আফরোজ বেগম, বিডিবিও সভাপতি ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া, সমকালের সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান শেখ রোকন এবং উৎসবের সদস্য সচিব সৌমিত্র চক্রবর্তী। পতাকা উত্তোলন শেষে বেলুন উড়িয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. দিল আফরোজ বেগমসহ অতিথিরা।

উদ্বোধন শেষে এনজাইম ও সুহৃদরা প্রতিযোগীদের জন্য নির্ধারিত কক্ষে নিয়ে যান। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চলে অলিম্পিয়াড পরীক্ষা। দেশজুড়ে নিবন্ধনকারী প্রতিযোগীরা একযোগে পরীক্ষায় অংশ নেয়। পরীক্ষা শেষ, এবার কাঙ্ক্ষিত পর্বের অপেক্ষা। মিলনায়তনজুড়ে উৎসুক শিক্ষার্থীরা জীববিজ্ঞান-সংশ্নিষ্ট নানা বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন নিয়ে প্রস্তুত। সেই প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে মঞ্চে প্রস্তুত বিশেষজ্ঞ-শিক্ষকরা।

মনোমুগ্ধকর প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে সবার মনোযোগ ছিল অতিথিদের কথামালায়। এবার বিজয়ী ঘোষণারা পালা। আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে অংশ নেওয়া সারাদেশের ৮৯৬ জন প্রতিযোগীর মধ্যে তিন ক্যাটাগরি থেকে ১০৫ জনকে জাতীয় পর্বের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এদের মধ্যে সেরাদের সেরা পাঁচ বিজয়ীকে দেওয়া হয় খ্যাতনামা পাঁচ বিজ্ঞানী স্মরণে বিশেষ পুরস্কার। পুরস্কার বিতরণ ও সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী।

সমাপনী অনুষ্ঠান শেষ হলেও শেষ হয় না অপেক্ষার পালা। কারণ তখনও বাকি বায়োক্যাম্পে যোগ্যতা অর্জনকারীদের নামের তালিকা প্রকাশ। চুলচেরা বিশ্নেষণ শেষে উৎসবের পরের দিন শনিবার বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের অফিসিয়াল পেজে প্রকাশ করা হয় জাতীয় বায়োক্যাম্পের জন্য সর্বোচ্চ নম্বরধারী থেকে ২০ জনের নাম। বায়োক্যাম্পে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন পরীক্ষা শেষে আটজন মাস্টার ক্যাম্পার নির্বাচন করা হবে। এরপর একাধিক ক্যাম্প শেষে পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্ত চারজনকে নির্বাচিত করা হবে। চলতি বছর আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভান শহরে আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের (আইবিও) ৩৩তম আসর আয়োজন করতে যাচ্ছে আইবিও কর্তৃপক্ষ। এতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবে চার প্রতিযোগী।

বায়োক্যাম্পে সুযোগ পেল যারা
সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে বায়োক্যাম্পের জন্য জুনিয়র ক্যাটাগরিতে পঞ্চগড় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের আফিয়া আক্তার লুবনা; সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের আহমেদ আব্দুল্লাহ জেমি; ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের সিদ্ধার্থ পাল, রংপুর ক্যাডেট কলেজের আবরার ফিরোজ নাফি, রাজশাহী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের জাকিয়া জিনাত ও কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজের আজমাঈন আহনাফ সাঈদ এবং হায়ার সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে সরকারি আনন্দ মোহন কলেজের জুহায়ের মাহদিউল আলম আশফি, নটর ডেম কলেজের ফারজিন আওসাফ জামান, মো. শাদমান সাকিব, আহম্মেদ আল জুবায়ের আনাম, ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের জুহায়ের ইসলাম স্মরণ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মুবাসসেরা সালসাবিল, ঢাকা কলেজের সৈয়দ ইফতেখার ইসলাম দীপ্ত, আলফ্রেড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের তাহসীন শান লিওন, কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজের তৌসিফ তাহমিদ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের এমএম মাহবুব মোরশেদ আবির, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের মাহিবুল হক ও কুমিল্লা নওয়াব ফয়জুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ফারাহ তাবাসসুম নির্বাচিত হয়েছে। এ ছাড়া গত বছরের মাস্টার ক্যাম্পার রায়ান রহমান, ফাইয়াদ আহমেদ ও খন্দকার ইশরাক আহম্মেদ বায়োক্যাম্পে নতুনদের সঙ্গে যুক্ত হবেন।

জাতীয় পর্বের বিজয়ীরা
তিন ক্যাটাগরিতে জাতীয় পর্বে অংশগ্রহণকারীদের ৮৯৬ থেকে ১০৫ জন বিজয়ী হয়। জুনিয়র ক্যাটাগরিতে মোট ২২ জন বিজয়ী হয়েছে। এদের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে চারজন, প্রথম রানারআপ ১২ জন এবং সেকেন্ড রানারআপ হয়েছে ১১ জন। সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে মোট ২৫ জন বিজয়ী হয়েছে। এদের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে চারজন, প্রথম রানারআপ ১০ এবং সেকেন্ড রানারআপ হয়েছে ১১ জন। হায়ার সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে মোট ৫১ জন বিজয়ী হয়েছে। এদের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সাতজন, প্রথম রানারআপ ১০ এবং সেকেন্ড রানারআপ হয়েছে ১৬ জন।

'ইয়েরেভানে বাংলার জয়গান'- এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে জীববিজ্ঞান উৎসবের চূড়ান্ত পর্বে বিজয়ী চারজন এবং জুরি বোর্ডের দুই সদস্যসহ মোট ৬ জনের 'টিম বাংলাদেশ' আন্তর্জাতিক বায়োলজি অলিম্পিয়াডে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে। এবারও নতুন অর্জনের প্রত্যাশায় বুক বেঁধেছে বাংলাদেশ।
সহসম্পাদক, সমকাল সুহৃদ সমাবেশ