পাহাড় নাকি সমুদ্র, কোনটি পছন্দ এমন প্রশ্ন সবাইকেই কম বেশী শুনতে হয়। এই দুই অপার সৌন্দর্যকে উপভোগ করে এসে বিস্তারিত লিখেছেন এ এস এম শাহীন

পাহাড় আর সমুদ্র দুটোই যদি আপনার পছন্দের হয়, তবে এই ভ্রমণ কাহিনি আপনার কাজে আসবে। মেরিন ড্রাইভ চালু হওয়ার পর আমাদের কক্সবাজারের এক পাশে সমুদ্র আর অন্য পাশে পাহাড় মোটামুটি পরিচিত দৃশ্য হয়ে গেছে। তবে এবার আমাদের প্ল্যান ছিল কক্সবাজারের সঙ্গে আলীকদম ও থানচি ঘুরে বেড়ানোর- কারণ কম সময়ে আলীকদম থেকে থানচি ও কক্সবাজার যাওয়া যায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আমরা দুই পরিবারের সাতজন সদস্য ও দু'জন ড্রাইভার সেডান কার ও মাইক্রোবাসে যাত্রা শুরু করলাম। শুক্রবার সকাল ৭টায় উত্তরা থেকে রওনা দিলাম। সীতাকুণ্ড পার হয়ে চট্টগ্রাম শহরের জ্যাম এড়াতে বায়েজিদ লিঙ্ক রোডে ঢুকে চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে চোখ জুড়িয়ে গেল। আমাদের তাড়া ছিল সন্ধ্যার আগেই আলীকদম পৌঁছানোর। কারণ অচেনা পাহাড়ি পথে কক্সবাজার হাইওয়ে ছেড়ে আমাদের আরও প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার পথে যেতে হবে। আধাঘণ্টা বিরতি দিয়ে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ফাঁসিয়াখালী থেকে আমরা লামা-আলীকদম রোডে প্রবেশ করলাম। সঙ্গে সঙ্গেই ব্যস্ততম মহাসড়ক ছেড়ে প্রত্যাশিত বুনো গন্ধের নির্জন পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় ওপরে উঠতে শুরু করলাম। কথিত আছে, ধর্ম প্রচারের জন্য আসা আলী নামক একজন সাধকের নামানুসারে এই এলাকা আলীকদম নামে পরিচিতি লাভ করে। এক সময়ের অতি দুর্গম এই জনপদে এখন অনায়াসেই যাওয়া যায়। ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়াও চকরিয়া থেকে বাস বা শেয়ার ভিত্তিতে চান্দের গাড়িতে এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে আলীকদম পৌঁছানো যায়। বলে রাখা দরকার যে, আলীকদম, থানচি বেড়াতে গেলে আপনাকে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন কার্ডের মূল সনদ ও অন্তত ৫ কপি ফটোকপি সঙ্গে রাখতে হবে- বিভিন্ন চেকপোস্ট বা হোটেলে দেওয়ার জন্য।

কক্সবাজার মহাসড়ক থেকে মিরিঞ্জা পর্যটন কমপ্লেক্স পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার রাস্তাই পাহাড়ি পথে ওপরে উঠতে হয়- চকচকে মসৃণ আঁকাবাঁকা রাস্তার যে কোনো পয়েন্টই একেকটা পর্যটন স্পট হতে পারে। ১৫০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই মিরিঞ্জা থেকে আশপাশের পাহাড়ের খুব সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়। যদিও দিনের আলোতে হোটেলে পৌঁছানোর তাগিদে আমরা মিরিঞ্জাতে না থেমে চলতে লাগলাম। মিনিট চল্লিশ পাহাড়ি রাস্তার পর আলীকদম শহরের দিকে বাকি রাস্তাটুকু অপেক্ষাকৃত সমতল। যদিও দূরে তখনও পাহাড় দেখা যাচ্ছিল। গুগল ম্যাপের সহায়তায় সন্ধ্যার আগেই ঢাকা থেকে কনফার্ম করে আসা হোটেল দামতুয়া ইন-এ প্রবেশ করলাম। তিনতলা এই হোটেল ছিমছাম, গোছানো- সামনে-পেছনে ছোট্ট ফুলের বাগান আর সবচেয়ে আকর্ষণীয় পুকুরের ওপরে ভাসমান খাবারের জায়গা। রাতে বাঙালি আর পাহাড়ি খাবারের ডিনার শেষে ঘণ্টাখানেক হাঁটাহাঁটি করলাম। পরদিন আমাদের গন্তব্য থানচি। বিশেষ করে তমা-তুঙ্গী, যেটা থানচি শহর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে। সকাল ১০টার কিছুক্ষণ পর ভাড়া করা চান্দের গাড়িতে উঠে বসলাম। আলীকদম শহরের পানবাজার এলাকা শেষ হতেই পাহাড়ি রাস্তায় ওপরে উঠা শুরু করলাম- মিনিট বিশেকের মধ্যে আমাদের প্রথম বিরতি মায়া লেক।

গাড়ি থেকে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কোথায় সেটা- নেমে একটু দূরে ভিউ পয়েন্টে যেতেই ভালোলাগায় মন ভরে গেল। চারপাশে সবুজ পাহাড়ের মাঝে হালকা সবুজ স্থির জলাধার। সময় কম থাকায় আমরা আর নিচে নামতে পারিনি। তবে পাহাড়চূড়া থেকে প্রায় ঘণ্টাখানেক এই প্রাকৃতিক লেকের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়েছি। এবারের গন্তব্য ডিমপাহাড়- এক সময় খুবই দুর্গম এই ডিম আকৃতির পাহাড়চূড়া এখন খুব কাছে থেকেই দেখা যায়। আলীকদম-থানচি সড়কের এই অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৫০০ ফুট ওপরে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু মোটরগাড়ি চলাচলের রাস্তা।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগের তত্ত্বাবধানে প্রায় এক যুগ ধরে এই সড়কটি নির্মিত হয়েছে। এটি এখন সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। আকাশ পরিস্কার থাকলে এখান থেকে চারপাশের খুব সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়। পাহাড়ের পাশে গাড়ি রেখে আধাঘণ্টা ঘোরাঘুরি করে আবার যাত্রা শুরু করলাম। কয়েকটা পাহাড় পেরিয়ে অপেক্ষাকৃত সমতল থানচি বাজার হয়ে তমা-তুঙ্গী পৌঁছালাম।

সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তৈরি তমা-তুঙ্গী থেকে পুরো পাহাড়ের ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ পাওয়া যায়। আকাশ পরিস্কার থাকলে এখন থেকে কেওক্রাডং, তাজিংডং ও ডিমপাহাড় স্পষ্ট দেখা যায়। সবচেয়ে ভালো লাগে দিগন্তজুড়ে ঢেউ খেলানো সবুজ পাহাড়ের সারি, যতদূর চোখ যায়। উজ্জ্বল রোদ আর পাহাড়ের শীতল বাতাসে অভিভূত হয়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে দিলাম। বান্দরবান শহর থেকে অনেক পর্যটকই এখন তমা-তুঙ্গী আসেন নীলগিরি হয়ে তিন-চার ঘণ্টায় অনায়াসে। এবার তমা-তুঙ্গী থেকে নামবার পালা। সাঙ্গু নদীর পাড়ে কিছুক্ষণ বসে আড্ডা দিয়ে আলীকদমের উদ্দেশে রওনা দিলাম।

যাওয়ার পথে আলীকদমের মাতামুহুরী নদীতে সূর্যাস্ত দেখলাম। পরদিন সকালে নাস্তা করে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা, এড়িয়ে যাওয়া মিরিঞ্জাতে প্রায় ঘণ্টাখানেক কাটালাম। মিরিঞ্জাও অনেক সুন্দর। বিশেষ করে চারপাশের পাহাড় ও গাছপালায় পরিপূর্ণ গভীর খাদ। এখানে প্রবেশ ও গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে হয়। হাইওয়েতে উঠে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই কক্সবাজার পৌঁছে গেলাম। পরবর্তী দু'দিন বিচ, মেরিন ড্রাইভ আর হোটেলে কাটিয়ে ঢাকা ফিরলাম। শেষ হলো প্রায় এক হাজার কিলোমিটার আর চার রাত-পাঁচ দিনের পাহাড়, সমুদ্র দর্শন।