সন্তানের সুন্দর জীবনযাপনে বাবা-মায়ের যত্ন ও পরিচর্যা অপরিহার্য। এ জন্য সন্তানকে সময় দেওয়া প্রয়োজন। লিখেছেন আসমা হক

সন্তানের সুষ্ঠু বিকাশ ও নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব বাবা-মার। বলা হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল মায়ের কোল। কিন্তু সন্তানের জন্য সে মায়েরই যদি পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ না থাকে তখন? একটি সন্তান বেড়ে ওঠায় বাবার ভূমিকাও কম নয়। বাবা-মায়ের যৌথ সহযোগিতা ও ত্যাগের বিনিময়ে একটি সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়। কিন্তু কালের পরিক্রমায় বা আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাবা-মায়ের ব্যস্ততা বেড়েছে বহুগুণ। সেই সঙ্গে একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে পরিণত হয়েছে ছোট পরিবারে। বাবা-মা, একটি বা দুটি সন্তান নিয়ে গঠিত হওয়া ছোট পরিবারগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাবা-মা উভয়েই চাকরিজীবী হয়ে থাকেন। ফলে তাঁদের সন্তানের জন্য খুব একটা সময় থাকে না। একা একা বেড়ে ওঠা সন্তান অনেক সময়ই হীনমন্যতায় ভোগে। কখনওবা খারাপ সঙ্গ পেয়ে লিপ্ত হয় সন্ত্রাসী কার্যকলাপে। তাই প্রত্যেক বাবা-মায়ের উচিত শত ব্যস্ততার মধ্যেও সন্তানকে সময় দেওয়া। নিজেদের কাজের পাশাপাশি সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে করণীয়-

দিনের শুরুটা যদি সুন্দর হয় তাহলে সারাদিন মন অনেকটাই প্রফুল্ল থাকে। তাই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে নাশতা করুন। নাশতা খেতে খেতে তার সারাদিনের রুটিন জেনে নিন। এতে তৈরি হবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। চাকরিজীবী বাবা-মা সন্তান স্কুল থেকে ফেরার পরপরই ফোন করে খোঁজ নিন সে ঠিকমতো বাড়িতে পৌঁছেছে কিনা। কাজের ফাঁকে আরও একবার খোঁজ নেবেন দুপুরে খেয়েছে কিনা।

বাসায় ফিরে সন্তানের সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলুন। মাঝে মাঝে তার পছন্দের কিছু নিয়ে আসতে পারেন।

বিকেলে বা সন্ধ্যায় চায়ের কাপে গল্প জমান সন্তানের সঙ্গে। জেনে নিন সারাদিন কী করেছে স্কুলে, নতুন বা মজার কিছু ঘটেছে কিনা। নিজের অভিজ্ঞতাও শেয়ার করতে পারেন শিক্ষামূলকভাবে। পড়াশোনার ব্যাপারে সাহায্য করুন। তবে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবেন না। রাতে পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাবার খেতে বসুন। এটা পারিবারিক সম্পর্ক দৃঢ় করবে।

ছুটির দিনে সন্তানের পছন্দমতো কিছু রান্না করুন। দিনের একটা সময় বেড়িয়ে আসতে পারেন সবাই মিলে। এতে সন্তান যেমন আনন্দ পাবে তেমনি আপনি পাবেন সতেজতা।

মাঝে মাঝে উপহার হিসেবে দিতে পারেন শিক্ষামূলক বই এবং বই পড়া শেষ হলে সে বিষয়ে আলোচনা করুন।

অবসরে যতটা সম্ভব কম প্রযুক্তি ব্যবহার করুন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ডা. রাশেদ জাহাঙ্গীর কবির (সহযোগী অধ্যাপক, পেডিয়াট্রিক অনকোলজি) বলেন, 'একটি সন্তানের প্রথম শিক্ষক বাবা-মা। তাই বাবা-মায়ের পর্যাপ্ত সময় দিয়ে সন্তানকে মৌলিক শিক্ষা দিতে হবে। পরিবারে বাবা-মায়ের মধ্যে যদি সাবলীল সম্পর্ক বজায় থাকে, একজন অন্যজনকে শ্রদ্ধা করে তাহলে সন্তান তাই শিখবে। বর্তমানে অনেক বাবা-মাই সন্তানকে খাওয়ানোর সহজ মাধ্যম হিসেবে প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত করছে। অর্থাৎ সন্তানদের মোবাইল ফোনে গেম, কার্টুন, বিভিন্ন ভিডিওতে মগ্ন রাখছে অন্যদিকে খাবার খাওয়াচ্ছে। যা একটা সময় আসক্তিতে রূপ নিচ্ছে। তাই সন্তানকে গল্প বলে বা অন্য কোনো সৃজনশীল আনন্দ দিয়ে খাবার খাওয়াতে হবে।

ছোটবেলা থেকে বাচ্চাদের ভয়ের গল্প না বলে শিক্ষণীয় গল্প বলতে হবে। বাচ্চাদের জন্য বাইরের ফাস্ট ফুড খুবই ক্ষতিকর, তাই বাসায় তৈরি স্বাস্থ্যসম্মত ও রঙিন খাবার দিতে হবে। শহরকেন্দ্রিক মানুষ অনেকটাই যান্ত্রিক, তাই সময় পেলে বাচ্চাদের সঙ্গে হাঁটাহাঁটি করা উচিত। বাবা-মা উভয়েই চাকরিজীবী হলে সন্তানকে গৃহপরিচারিকার কাছে না রেখে যতটা সম্ভব দাদা-দাদি অথবা নানা-নানির কাছে রাখা উচিত। তাতে যেমনটা নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে তেমনি তাদের ভালো সময়ও কাটবে। এ ছাড়াও ঘরের কাজে সন্তানকে ছোট ছোট দায়িত্ব নিতে শেখানো প্রয়োজন। এতে করে একসঙ্গে সময় কাটানোও হবে এবং সন্তান নিজের দায়িত্ব-কর্তব্য শিখবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে যে কোনো বিষয়ে সন্তানকে সরাসরি 'না' না বলে এর কুফল সম্পর্কে জানাতে হবে। এরপর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পূর্ণ ভার সন্তানকে দিতে হবে। তাদের বন্ধুবান্ধব কারা বা কাদের সঙ্গে মিশছে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

বিষয় : বাবা-মায়ের যত্ন সুন্দর ভবিষ্যৎ সন্তানের যত্ন

মন্তব্য করুন