পটিয়া চা বাগানে সন্ধ্যার পরপরই ঘুমে ভরা রজনী শুরু হয়। কেরোসিন বেশি জ্বালাতে হবে বলে কুলি লাইনের লোকজন মোটামুটি সূর্য ডোবার পরপরই খাওয়াদাওয়া শেষে একপেট দেশি মদ গিলে কিছুক্ষণ ফুর্তি করে তারপর রাত আটটা না বাজতেই গভীর নিদ্রায় তলিয়ে যায়। তাই পাকিস্তানি আর্মি যখন রাত দশটার দিকে বাগানে ঢুকল, তখন সেখানে মাঝরাতের নির্জনতা। সে নিস্তব্ধতার মধ্যে গাড়িগুলো খুব কম গতিতে ম্যানেজারের বাংলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সব গাড়ির হেডলাইট নেভানো। অপারেশনের এটাই স্ট্যান্ডার্ড প্রসিডিওর, যাতে দূর থেকে গাড়িগুলো কেউ লক্ষ্যবস্তু বানাতে না পারে। ড্রাইভাররা পথ চিনছে পাশে মৃদু কনভয় আলোতে।
হাসান সাহেব তখন মাত্র ডিনার সেরেছেন। পুরো বাংলো অন্ধকার, শুধু ডাউনিং রুমে একটি হারিকেন জ্বলছে। অবশ্য বাগানে বিদ্যুৎ না থাকলেও ...।
এই থাকা-না থাকার দোলাচল কেমন যেন নস্টালজিক করে দেয় পাঠককে। গল্পজুড়েই এই নস্টালজিয়া। জীবনের একটা সময়ে এসে মানুষ পুরোনো স্মৃতির জাবর কাটে আর তাতে অন্যরকম তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। যারা যুদ্ধ দেখেছেন কিংবা যারা যুদ্ধ না দেখেও খুব আগ্রহ নিয়ে পড়েন যুদ্ধদিনের কথা, তাদের কাঁধে হাত দিয়ে দ্বিতীয় যৌবন ঠিকই দাঁড় করিয়ে দেবে নস্টালজিয়া নামের এক আবেগি দুনিয়ার সামনে। যেই দুনিয়ার সামনে পৃথিবীর তাবৎ ক্ষমতা তুচ্ছ হয়ে ধরা দেয়। আর গল্পের মতি মিয়া; সকালে ঘুম থেকে উঠেই মায়ের ডাক শুনে যার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। যার মা সারাদিন খকখক কাশে আর তাকে রাজ্যের গালাগালি করে। 'মতি হারামজাদা' ছাড়া কথাই বলে না। লেখকের ভাষায়- এই বুড়ো মানুষগুলোকে নিয়ে এ সমস্যা প্রায়ই হয়। তারা সময়ের বাতাস বোঝে না। আরে, গাছে ডালপালাও তো বাতাস যেদিকে, সেদিকে দোলে। মানুষ তা করবে না? যখন বায়ু যেদিকে মতি মিয়া সেদিকেই থাকে, এটা দোষের কী হলো? বরং এটাই বুদ্ধিমানের কাজ। বুড়ি সেটা বোঝে না। তবে মতি মিয়া বুঝে হোক কিংবা না বুঝে হোক, শেষ পর্যন্ত বুক টানটান করে ঠিকই জানান দেয় নিজের পুরুষত্বের কথা! ওদিকে সন্ধ্যা গড়িয়ে আসে তার আপন নিয়মে। তূর্ণা নিশীথা ট্রেনের অপেক্ষা! কার? গল্পের চরিত্রের। ঠিক সময়ে ট্রেন ছাড়ছে না। প্রায় দুই ঘণ্টা লেট। তীব্র কুয়াশার কারণে নাকি দেরি হচ্ছে। গত বছর কুয়াশার কারণেই ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছিল। শখানেক মানুষ সেদিন বাড়ি ফিরতে পারেনি। তারপর থেকে রেল কর্তৃপক্ষ সাবধান হয়ে গেছে। তার খারাপ লাগে না। কার? গল্পের চরিত্রের। হয়তো লেখকের! এ জে কুইনিলের রগরগে থ্রিলার 'দ্য পারফেক্ট কিল' পড়ছে গল্পের চরিত্র। লেখকের সৃষ্ট 'ক্রেসি' চরিত্রটি তার খুব প্রিয়। তাকে ঘিরে লেখা প্রায় সব বই-ই তার পড়া। আবার একটু মন খারাপ হচ্ছে, কারণ হাতের বইটি শেষ হওয়ার পর ক্রেসি বিদায় নেবে। তাকে নিয়ে লাখা আর কোনো উপন্যাস পড়ার বাকি থাকবে না। একটি প্রিয় চরিত্র বিদায় নেওয়া মানে আপনজন দূরদেশে চলে যাওয়ার মতোই বেদনাদায়ক। এই বেদনাদয়ক সময়ে ভর করে গল্পের চরিত্রের সঙ্গে দেখা মিলে এক ফিনিক্স পাখির! তূর্ণা নিশীথায় ফিনিক্স পাখি? ফিনিক্স পাখির সাথে এক সন্ধ্যা গল্পটি না পড়লে এ আশ্চর্যই ঠেকবে আপনার কাছে। এই ফিনিক্স পাখি আপনাকে নিয়ে যাবে গন্তব্যে। সেখানে আপনি পাবেন বেলায়েত সাহেবের দেখা। তারপর একে একে অ্যাকোয়ারিয়ামে একটি মুখ, বরফে জ্বলছে কয়লার আগন, বাটিভর্তি জল, ভুলে যাওয়া শালিকগুলো এবং বুড়ো ঈগলের ডানার ছায়ায় অসংখ্যবার পাবেন নিজের দেখা। কিংবা দেখা পাবেন বয়ে চলা সময়ের আলোচিত চরিত্র অথবা আড়ালে-আবডালে থেকে মনের কোণে উঁকি দেওয়া মানুষদের। সবশেষে পড়তে পারেন শুরুর গল্প- এক শীতের দুপুর। প্রথম গল্প কেন শেষে? সে পড়লেই বুঝতে পারবেন। জগতের সব রহস্য প্রকাশ করতে নেই! তেমনি এই রহস্যটিও তোলা থাক আপনার জন্য।
তবে এই বইয়ের ৯টি গল্পের শরীরে মানবজীবনের রূপ, রস ও রহস্য নিয়েই খেলতে চেয়েছেন লেখক বাদল সৈয়দ। অন্যভাবে বললে, লেখকের এই খেলার মূল চরিত্র মানুষ। তারাই জন্ম দিয়েছেন গল্পের। যেন জীবনের ধাঁধা মেলানোই ছিল তাদের কাজ। শেষ পর্যন্ত ধাঁধা মিলেছে? প্রিয় পাঠক, সেই মিল-অমিলের ভার নিতে পড়তে পারেন বাদল সৈয়দের দ্বিতীয় যৌবন।