মাঝরাত! বেজে ওঠে সেলফোন। ঘুমের ঘোরে হাত বাড়িয়ে হ্যালো বলতেই অপর প্রান্তে হুহু কান্নার শব্দ। আমি কয়েকবার হ্যালো বলার পর এবার ডুকরে ওঠে তার কান্না।
আপা ... আপা গো ...
কে? কে? কে বলছ?
আপা ...
আবারও ডুকরে ওঠে কান্না। বুকভাঙা আর্তনাদে সে বলে-
আপা তুমি ক্যামেরা অন করো, আমাকে দ্যাখো!
এবার ত্রস্ত হাতে সেলফোনের ক্যামেরা অন করে স্ট্ক্রিনে তাকাই। আমার এক ছোট বোনের কান্নাবিগলিত মুখ!
মিনা, মিনা, কী হয়েছে আপু? এভাবে কানছিস কেন? কী হয়েছে বল!
আমি উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে আর মিনার চেহারার দিকে তাকাই অবাক বিস্ময়ে। আঘাতের চিহ্ন মিনার সারা চেহারায়। চোখের কোনার আঘাতটা এতটাই প্রবল যে আর দেখা যাচ্ছে না ওর বাঁ চোখটা! আমি হারিয়ে ফেলি কিছু বলার ভাষা। বোবাকান্না আমাকেও জাপটে ধরে। স্বামীর নির্যাতনে বদলে গেছে মিনার মুখমণ্ডলের মিষ্টি অবয়ব। এখন মিনার দু'চোখ ভরা অঝোর কান্না।
আপা, তুমি আমাকে কানাডা নিয়ে যাও। আমি এখানে আর থাকব না। প্লিজ আপা, তুমি একটা ব্যবস্থা করো! নাহলে আমি মরে যাব!
নির্যাতিত নারীদের এই কান্না শোনা যায় দেশে, প্রবাসে এবং পৃথিবীর সর্বত্র। বাংলাদেশে যে কারণে নারীর কান্না শোনা যায় এই প্রবাস জীবনেও সেই একই কারণে শোনা যায় নারীর কান্না। আমি এই কানাডায় কিছুদিন ইন্টারপ্রেটারের অর্থাৎ দোভাষীর কাজ করেছি উইমেন্স শেল্টারে অর্থাৎ নারীদের আশ্রয় কেন্দ্রে। ইন্টারপ্রেটারের কাজ করতে যেতাম এইসব শেল্টারে বাংলাদেশের নির্যাতিত নারীদের জন্য। সেখানে শুনেছি নিষ্ঠুর নির্যাতনের নানা ধরনের সত্য ঘটনার বর্ণনা। দেখেছি নির্যাতনের ধরন হতে পারে কত নিষ্ঠুর, কত নির্মম! এসব শেল্টার স্থাপন করা হয়েছে নির্যাতিত নারীদের জরুরি ভিত্তিতে সাময়িক আশ্রয়দানের জন্য। শুধু যে বাংলাদেশের নির্যাতিত নারীরা সেখানে আশ্রয় নিয়েছে সেটা নয়। সেখানে আশ্রয় নিয়েছে পৃথিবীর অসংখ্য দেশের নির্যাতিত নারীরা। এ ছাড়া যাঁদের আশ্রয় নেই, তাঁরা। তাঁদের এই আশ্রয় প্রমাণ করে পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই, জাতি নেই; যেখানে নারী নয় নির্যাতিত। এ রকম কয়েকটা ইন্টারপ্রেটিংয়ের কাজ করার পর আমার ইচ্ছা হলো এই প্রবাসে বাংলাদেশের নারীদের নির্যাতনের চিত্রটি সচেতন সমাজকে জানানো। কিন্তু একজন ইন্টারপ্রেটারকে এই মর্মে শপথনামায় স্বাক্ষরদান করতে হয় যে, সে কোনো তথ্য বাইরে প্রকাশ অথবা পাচার করবে না। এটি আইনত অপরাধ। কিন্তু আমার ভেতরে ক্রমাগত প্রতিবাদ বাজতে থাকে। এই প্রবাসে নারী নির্যাতনের চিত্র সমাজের কাছে তুলে ধরার জন্য নাম-পরিচয় সমস্ত আড়াল করে আমি শুধু প্রেক্ষিত আর পটভূমি তুলে ধরে রচনা করি আমার প্রথম উপন্যাস 'নিন্দিত উত্তরণ'।
কিছু কান্নার অশ্রু গড়িয়ে পড়ে আর কিছু কান্না নীরব বেদনা হয়ে থমকে থাকে চোখের প্রান্তরে। এ কান্নার শেষ কোথায় জানি না! নারী নির্যাতিত পারিবারিক নিষ্ঠুরতায়, যৌন নিপীড়নে এবং স্বামী কর্তৃক নির্যাতনে। স্বামী ছাড়াও আছে পরিবারের অন্য পুরুষ কর্তৃক নির্যাতন। নির্যাতকরা এই নির্যাতন করে থাকে বিশেষত নারীর ওপর ক্ষমতার অপব্যবহারে, কর্তৃত্ব স্থাপনে এবং নারীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্দেশ্যে। নির্যাতক পুরুষ ক্ষমতা প্রদর্শনে, ভীতি প্রদর্শনে এবং সামাজিকভাবে লজ্জা দেওয়ার জন্য নির্যাতন করে নারীকে। গবেষণায় দেখা যায় এসব নির্যাতনকারী পুরুষ অন্য কোনো পুরুষের প্রতি, এমনকি অন্য নারীর প্রতিও এরূপ নির্যাতকের স্বরূপ প্রকাশ করে না।
কিছু কান্না শোনা যায়, কিছু কান্না শোনা যায় না। নারী নির্যাতিত পৃথিবীর সর্বত্র। শুধু শারীরিক নয়, আছে মানসিক নির্যাতন। মানসিক নির্যাতনের স্বরূপ আরও কঠিন। আমি অনেক নারীকে জানি তাঁরা নির্যাতিত হয় নানা প্রকার মানসিক ও সামাজিকভাবে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী আছে কর্মস্থলে নারী নির্যাতন। দেশে ও প্রবাসে সর্বত্র অসংখ্য নারী নানা পেশায় ঘরের বাইরের কাজে নিয়োজিত। কর্মস্থলে পুরুষ ঊর্ধ্বতন কর্তৃক নির্যাতিত হওয়া অহরহ ব্যাপার। কর্মস্থলে ঊর্ধ্বতন পদের পুরুষ কর্তৃক নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে শারীরিক ও মানসিক উভয় প্রকার। এই চিত্র বাংলাদেশে এবং এই প্রবাসে একইরূপ। এ ছাড়া স্বদেশ অথবা প্রবাস সর্বত্রই নারী নির্যাতিত হচ্ছে নির্যাতক নারী কর্তৃক। নারীরা যখন পুরুষের প্রতিনিধিত্ব করে, তখন সেই নারী নির্যাতনকারী পুরুষের স্বরূপ ধারণ করে। বাংলাদেশে অসংখ্য শাশুড়ি এরূপ নির্যাতকের ভূমিকা পালন করে।
আমি কিছুদিন আগে একটি ছোটগল্প লেখলাম। গল্পটির নাম 'রিমঝিম' এবং এটি সত্য ঘটনানির্ভর। পরিকল্পনা করলাম নারী নির্যাতন নিয়ে যেসব সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে পত্রপত্রিকায় এবং অনলাইন মাধ্যমে, সেসব নিয়ে কিছু গল্প লিখব। ব্র্যাকেটে থাকবে সত্য ঘটনা অবলম্বনে। গল্প অথবা উপন্যাস লেখা শেষ হলে আমি আমার প্রিয় কয়েকজন বন্ধুকে সেই লেখাটা পাঠাই তাঁদের মন্তব্য ও পরামর্শের জন্য। লেখক বন্ধু ছাড়াও পাঠক বন্ধু থাকে সে তালিকায়। আমি সমালোচক বন্ধুদের সমালোচনা গ্রহণ করি শ্রদ্ধা ও গুরুত্ব সহকারে। এবার একটু ব্যতিক্রম হলো তাঁদের দু'জনের পরামর্শ গ্রহণে। লেখক বন্ধুদের ভেতর থেকে পরামর্শ এলো গল্পের শেষ দৃশ্যটি বদলে দিতে অথবা আগের পরিচ্ছেদে শেষ করে দিতে।
এই গল্পটিতে প্রধান চরিত্র একজন নারী। সে একজন নৃত্যশিল্পী। শেষ দৃশ্যটি ছিল নৃত্যশিল্পী স্ত্রীর নাচ বন্ধ করার জন্য নির্যাতক স্বামী মেয়েটিকে চাপ প্রয়োগ করে এবং একপর্যায়ে ঝগড়ার সময় স্বামীটি মেয়েটির পা কেটে ফেলে। পত্রিকায় যে সংবাদটি আমি গল্পে রূপ দিই সেই সংবাদটি ছিল স্ত্রীকে তাঁর স্বামী কুপিয়ে হত্যা করে। কেন আমি শেষাংশ বদলে ফেলব, এর সঠিক উত্তর পাইনি অথবা যে উত্তর পেয়েছি সেটা গ্রহণ করতে পারিনি। তাই রিমঝিম গল্পটির শেষ দৃশ্যের সেখানে আমি কোনো পরিবর্তন আনিনি।
আমি লেখক বন্ধুদের কাছে জানতে চাইলাম কেন শেষাংশটি বদলাতে বলছ? আমার সচেতন লেখক বন্ধুদের মতামত ছিল- নারী নির্যাতন হচ্ছে সেটা আমরাও স্বীকার করছি। কিন্তু এতটা নির্মমভাবে দেখানোর দরকার নেই!
আমি মনে করি, নারীর প্রতি যে সহিংসতা ঘটে চলেছে সেটা গোপন করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং এখন প্রয়োজন নারী নির্যাতনের সংবাদসমূহের বহুল প্রচার এবং নারীর প্রতি অন্যায়ের সঠিক বিচার। আমাদের সমাজে নারীর নির্যাতন থেকে নারীর প্রতিনিধিত্বকরণ সবকিছুরই সঠিক চিত্রায়ণ প্রয়োজন।
বাংলাদেশে আমি প্রতি বছর আসি বইমেলায়। আর দেশে এলে সাহিত্যিক বন্ধুদের সঙ্গে জমে ওঠে সাহিত্যের আড্ডা। এবারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। এমন এক আড্ডায় আমার এক জুনিয়র সাহিত্যিক সহযাত্রী বন্ধু জানতে চাইল-
আপা, এবারও একা এসেছেন?
আমি বললাম-
হ্যাঁ, একাই এসেছি।
সে তখন জানতে চাইল-
আপা প্রতি বছরই একা আসেন, কখনোই ভাইকে নিয়ে আসেন না। একবার ভাইকে (অর্থাৎ আমার স্বামীর কথা বলল) নিয়ে আসেন। উনার সঙ্গে পরিচয় হলে আমাদের ভালো লাগবে।
আমি তখন উত্তর দিলাম-
আমি সিঙ্গেল। ভাইয়ের সঙ্গে একসাথে নেই। আমরা আলাদা হয়ে গেছি। কানাডায় নারী অথবা পুরুষ বিবাহবিচ্ছেদের পর যখন একা থাকে তখন তার স্ট্যাটাস হয় সিঙ্গেল।
আমি সিঙ্গেল, আমার বিষয়টি কেন জানান দিলাম সেটাতে আমার ঘনিষ্ঠ লেখক বন্ধুদের কয়েকজন পরে একান্তে আপত্তি জানাল। শুধু আপত্তি নয়, অসন্তুষ্ট হলো তাঁরা রীতিমতো। তাঁদের একটাই উপদেশ ছিল-
আমাদের দেশে সামাজিকভাবে সম্মান করা হয় না সিঙ্গেল নারীদের। সুতরাং আপনি আপনার সিঙ্গেল ষ্ট্যাটাস কখনোই জানান দেবেন না।
তখন আমি দৃঢ়কণ্ঠে বললাম-
সমাজের এই চিন্তাভাবনার পরিবর্তন হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
আমি আমার লেখক বন্ধুটিকে বোঝালাম-
তোমরা যদি লেখক হয়ে সমাজের এসব অন্যায় ভুল ভাবনা প্রশ্রয় না দাও, তাহলে সমাজ বদলাবে কী করে?
দীর্ঘ সময় মতানৈক্যের ভেতর অশান্তিতে বসত করার চেয়ে সেপারেশন অর্থাৎ আলাদা হয়ে বসত করাটাই উত্তম। এতে স্বামী বা স্ত্রী দু'পক্ষের কেউই মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখে পড়ে না। অথবা অশান্তিময় হয়ে থাকে না প্রতিদিনের জীবন ও চলার ক্ষেত্র। আমাদের দেশে মানসিক সুখ, শান্তি ও স্বাস্থ্যের থেকেও অধিক প্রাধান্য দেওয়া হয় পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদাকে। ডিভোর্স এটি এমন নাজুক বিষয় হয়ে ওঠে, এটা নিয়ে আলাপ পর্যন্ত করতে চায় না পরিবারের সদস্যরা। অনেকটা লুকিয়ে রাখতে চায় আমার লেখক বন্ধুদের মতো। বাড়ির পুরুষ সন্তানটির ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হলেও নারী সন্তানটির ক্ষেত্রে অবশ্যই গোপনীয়।
ফিরে আসি যার কান্নায় ঘুম ভেঙে গিয়েছিল আমার সেই খালাতো বোনের প্রসঙ্গে। মিনাকে ফিরে যেতে হয়েছে তার নির্যাতক স্বামীর সংসারে। কারণ, মিনার আছে আরও দুটি ছোট বোন। মিনার ডিভোর্স হলে সমস্যা হবে তার বোনদের বিয়েতে। তাছাড়া মিনার বিয়ে হয়ে যায় অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে। এই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে মিনা স্বাবলম্বী হওয়ার মতো কোনো সন্তোষজনক চাকরি পাবে না, যা তার পারিবারিক মর্যাদার সঙ্গে সম্পূরক। আমাদের নারীদের নির্যাতিত হওয়ার অনেক কারণের মধ্যে একটি প্রধান কারণ- তাদের করে রাখা হয়েছে কম যোগ্যতাসম্পন্ন। তাদের স্বনির্ভর এবং স্বাবলম্বী হতে না দেওয়া। মিনা একটি উদাহরণ মাত্র। এই চিত্র ঘরে ঘরে!
এ প্রসঙ্গে মনে পড়ল ম্যারি উলস্টোনক্রাফ্‌টের ইতিহাস। ম্যারি উলস্টোনক্রাফ্‌ট পৃথিবীর নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য। এই নারীবাদী লেখককে পৃথিবীর নারীবাদী দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়ে থাকে। 'এ ভিন্ডিকেশন অব দ্য রাইট অব ওম্যান' তাঁর সেরা নারী অধিকার নিয়ে লেখা গ্রন্থ। ১৭৯২ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন নারী কীভাবে জন্মগতভাবে পুরুষের তুলনায় হীন অথবা কম যোগ্যতার অধিকারী। তাঁদের সামাজিকভাবে এই অবস্থানে রাখা হয়। কারণ তাঁদের সমান শিক্ষা প্রদান করা হয় না। তাঁদের সামান্য কিছু শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয় সন্তান পালনের জন্য। কিন্তু শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন নারীদের সমাজের গঠনের জন্য। কারণ তাঁরা জাতির মেরুদণ্ড। তাঁরাই সমাজে সন্তানদের বড় করে এবং স্বামীদের গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গদান করে। যদিও সমালোচনা করে বলা হয় ম্যারি উলস্টোনক্রাফ্‌ট সম্পূর্ণ সমঅধিকার প্রদানের ব্যাখ্যা দিতে ভুল করেছেন। কিন্তু সমালোচকদের সমালোচনায় গুরুত্ব না দিয়ে তিনি বলেন, নারী ও পুরুষকে সমানভাবে সামাজিক সুবিধাদি প্রদান করা হলে তাঁরাও পুরুষের সমান যোগ্যতা প্রদর্শনে সক্ষম হবে। সেই সময়ে দারুণ আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছিল নারীবাদী দর্শনের প্রথম এই গ্রন্থ। শুধু সেটাই নয়, ম্যারি উলস্টোনক্রাফ্‌ট তৎকালীন জনপ্রিয় লেখক দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাক রুশোর 'এমিলি' গ্রন্থেরও তীব্র সমালোচনা করেন। কারণ জ্যাঁ জ্যাক রুশো তাঁর গ্রন্থে বলেন, নারীকে ততটুকুই শিক্ষা গ্রহণ করতে দেওয়া উচিত, যতটুকু প্রয়োজন পুরুষকে বিনোদন দেওয়ার জন্য। শুধু এমিলি গ্রন্থ নয়, জ্যাঁ-জ্যাক রুশোরও সমালোচনা করেন ম্যারি উলস্টোনক্রাফ্‌ট।
উনিশ শতকে বিশ্বব্যাপী নারী আন্দোলনের বীজ রোপিত হয় ১৮৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সেনেকা ফলস কনভেনশনে। যেখানে ঘোষণা করা হয় ডিক্লারেশন অব সেন্টিমেন্টস। সেদিনের সেনেকা ফলস কনভেনশনে নারী-পুরুষ মিলিয়ে তিনশ মানুষের উপস্থিতি ছিল। এবং এই ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরদান করেছিল একশজন। এর মধ্যে নারী স্বাক্ষর দানকারী ছিল ৬৮ এবং পুরুষ স্বাক্ষর দানকারী ৩২ জন। এই কনভেনশনের নেতৃত্বে ছিলেন এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটন। পরবর্তী সময়ে এটাই ইউনাইটেড স্টেটস ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্সের মডেল হয়ে দাঁড়ায়। ১৮৪৮ সালে নারী আন্দোলনে নামলেও আজও আমেরিকার নারী উন্নয়নের চিত্রটি মোটেও সন্তোষজনক নয়। আজ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে পার্লামেন্টে কোনো নারী প্রেসিডেন্ট আসেনি। এটিই যথেষ্ট নারীর ক্ষমতায়নের চিত্র নিরূপণে।
নারীবাদী দর্শনের এই গ্রন্থ প্রকাশের ইতিহাস পাঁচশ বছরের। আজও নারীর অবস্থানের চিত্ররূপ খুব একটা বদলায়নি। এটা যে শুধু উন্নয়নশীল দেশের চিত্র, সেটা নয়; উন্নত দেশসমূহের চিত্রও অনুরূপ! কাগজে-কলমে এসেছে নারীর সমান অধিকার। উন্নত দেশসমূহের পার্লামেন্টের দিকে দৃষ্টি ফেরালেই অনুধাবন করা যায় এই চিত্র। যুক্তরাষ্ট্রে সবেমাত্র স্বীকৃত হলো একজন নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে। হিলারি ক্লিনটন দু-দু'বার চেষ্টা করেও লাভ করেনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য মনোনয়ান এবং মনোনয়ন পেলেও লাভ করেনি বিজয়। এর ব্যতিক্রম নয় কানাডার চিত্রটিও। এখানেই প্রমাণিত পৃথিবীর নামসর্বস্ব সমান অধিকারের দেশে নারীর সমান অধিকারের চিত্রটি।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো কানাডার নারীর সমান অধিকারের চিত্রটিও অনুরূপ। 'নো সেকেন্ড চান্সেস : ওম্যান অ্যান্ড পলিটিক্যাল পাওয়ার ইন কানাডা (এ ফেমিনিন হিস্ট্রি সোসাইটি সিরিজ)'। রচনা কেট গ্রাহাম। গ্রন্থটির প্রকাশকাল ২০২২। এই গ্রন্থে উদাহরণস্বরূপ প্রকাশ করেছে কানাডাতে কেমন করে নারী নেতৃত্বকে দ্বিতীয়বার সুযোগ প্রদান করা হয় না অথবা পায় না! ২০২০ সালে কানাডাব্যাপী নারী নেত্রীদের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকার করেছে এই গবেষণাকাজের গভীরে প্রবেশ করার জন্য- কেন কানাডার নারীরা রাজনীতিতে পুরুষদের মতো সার্থক নয়? কানাডার ইতিহাসে টরন্টোর প্রথম নারী প্রিমিয়ার, যিনি একজন গে; তিনি ক্যাথলিন ওয়েন দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হননি প্রিমিয়ার হিসেবে। একই চিত্র পাওয়া যায় কানাডার নারী প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও। ১৯৯৩ সালে কানাডার উনিশতম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন কিম ক্যাম্পবেল। কানাডার ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদ ছিল ২৫ জুন থেকে ৪ নভেম্বর। মাত্র ১৩২ দিন। কানাডাতে ৩০২ জন প্রধানমন্ত্রীর ভেতর একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছিল মাত্র ১৩২ দিনের জন্য। যেখানে প্রতিটি পুরুষ প্রধানমন্ত্রী গড়ে নূ্যনতম ১ হাজার ৮৭৪ দিন ক্ষমতায় থেকেছেন। দুই মেয়াদের হলে এটার দ্বিগুণ। গড়ে তাঁদের ক্ষমতায় অবস্থানের অথবা সেবা প্রদানের মেয়াদ দুইবার। নো সেকেন্ড চান্স প্রজেক্ট- এটা প্রমাণ করেছে গবেষণার মাধ্যমে যে নারীদের কোনোরকম দ্বিতীয়বার সুযোগ প্রদান করা হয় না। ক্ষমতায় অবস্থানরত যে কোনো পদাধিকারী ফের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসা কানাডার নির্বাচন আইনে অনুমোদিত। কানাডার রাজনীতিতে শুধু নয়, বিশ্ব রাজনীতিতেও এটি অনুমোদিত ও গ্রহণীয়। কানাডার পুনর্নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা গেছে নারী প্রতিযোগীর ক্ষেত্রে। কানাডিয়ানরা দু'জন নারী; একজন প্রিমিয়ার অব অন্টারিও ক্যাথলিন ওয়েন, অন্যজন কানাডার প্রধানমন্ত্রী কিম ক্যাম্পবেল। কানাডাতে নারী রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে নো সেকেন্ড চান্স অথবা দ্বিতীয়বারের মতো সুযোগ নেই। পুনর্নির্বাচনে তাঁরা পরাজয় বরণ করেন।
বাংলাদেশের নারীদের সার্বিক উন্নয়ন অবশ্যই ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। যেহেতু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, সেহেতু ধরেই নেওয়া হয় বাংলাদেশের নারীরা সম্পূর্ণ সমান অধিকার ভোগ করছে। এবং দেশটির নারীর উন্নয়ন বিস্ময়কর মাত্রায় ঘটেছে! কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। নারীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গভীর ভালোবাসা এবং সহানুভূতি থাকার কারণে কিছু নারী দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করেছে বটে কিন্তু সার্বিক অর্থে নারীর সমান অধিকার এখনও সুদূরপরাহত। বাংলাদেশে দু'জন নারী প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা লাভ করেছেন। কিন্তু তাঁদের একজনও সম্পূর্ণরূপে নিজ ক্ষমতায় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের প্রধান হয়ে আসেননি। দু'জনই এসেছেন উত্তরাধিকারের জনপ্রিয়তায়। সুতরাং এই ধারায় নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কোনো কারণ নেই।
এই যখন বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে নারীর অবস্থান এমন নাজুক, তখন সাহিত্যে নারীর অবস্থান নির্ণয় করা খুবই সহজ। সেনেকা ফলস কনভেনশনের আরও একশ বছর পর ১৯২৯ সালে ভার্জিনিয়া উলফ রচনা করেন 'এ রুম অব ওয়ানস ওউন'। ম্যারি উলস্টোনক্রাফ্‌টের সময় থেকে ভার্জিনিয়া উফল। পার হয়ে গেছে আরও দুইশ বছর। ভার্জিনিয়া উলফ সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য তুলে ধরলেন তাঁর রুম অব ওয়ানস ওউন গ্রন্থে। সরাসরি না লিখে তিনি এটাতে ব্যবহার করলেন রূপকের মাধ্যমে। তাঁর রূপকের মাছ বর্ণনা করছে ‘A woman must have money and room of her own if she is to write fiction’.. সময়টা ১৯২৯ সাল! এরও প্রায় একশ বছর পর আজও নারীর কোনো ক্ষমতায়ন প্রকৃত অর্থে ঘটেনি। বিশ্ব রাজনীতিতে নারীর অবস্থানই তার সঠিক ক্ষমতায়ন প্রকাশ করে বইকি! বইটি তুমুল আলোচিত হলো।
সেই অর্থে বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে নারীর অবস্থানও বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটের মতো। আমরা যদি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী নারীর তালিকা দেখি, এটি আরও স্পষ্ট প্রকাশ পাবে। সাহিত্যে একশ আঠারো জন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। এর মধ্যে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছে মাত্র ষোলজন নারী লেখক। অর্থাৎ মাত্র ১৩.৬%। এই যদি হয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নারী লেখকদের অবস্থান তাহলে আর বাংলাদেশের নারী লেখকদের অবস্থান নিয়ে আলোচনা বিস্তৃত না করাই ভালো।
নারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন নারীর অংশগ্রহণ। সমাজ, রাষ্ট্র অথবা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সর্বত্রই একই সূত্র প্রযোজ্য। অংশগ্রহণ এবং অংশগ্রহণ, এখন সেটাই প্রয়োজন। শুধু নারীর অংশগ্রহণ এবং প্রতিনিধিত্বই পারে আজকের ও আগামীর পৃথিবীতে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে। নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণের মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে একটি সুন্দর সমতার পৃথিবী।