সাপ শুনলেই যেখানে মানুষ ভয়ে আঁতকে ওঠে, দৌড়ে পালায়; সেখানে তিনি ব্যতিক্রম। লোকালয়ে আসা বিপদগ্রস্ত সাপ উদ্ধার করেন। গত এক যুগে একাই প্রায় পাঁচশ সাপ উদ্ধার করে বনে ছেড়ে দিয়েছেন। গুঁইসাপ, বেজি, প্যাঁচা, পাখিসহ অন্যান্য প্রাণী উদ্ধার করেছেন শতাধিক। প্রাণিপ্রেমী এই মানুষটির নাম মোহাম্মাদ শাহজাহান।

ছোটবেলা থেকেই শাহজাহানের প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা। তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়েন। সাপ নিয়ে পাশের বাড়িতে খুব হইচই হচ্ছিল। শাহজাহান ডিসকভারি চ্যানেল দেখতেন। সেখানে দেখেছেন সাপ কীভাবে ধরতে হয়। তিনি লাঠির সাহায্যে সাপটির মাথা ধরে জঙ্গলে ছেড়ে দেন। সেটি ছিল হেলে সাপ। নির্বিষ। এটিই তাঁর প্রথম রেসকিউ।

শাহজাহান বেসরকারি চাকরি করেন। লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামে তাঁর বাড়ি। চাকরি সূত্রে বর্তমানে ফেনীতে বসবাস করেন। পাশাপাশি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রাণীদের জন্য কাজ করছেন। পুরোটাই স্বেচ্ছাশ্রম। মাঝেমধ্যে পকেটের টাকা খরচ করে দূরে সাপ রেসকিউ করতে যেতে হয়।

২০১০ থেকে এখন পর্যন্ত তার রেসকিউ করা সাপের সংখ্যা চারশ পঞ্চাশেরও বেশি। তাঁর উদ্ধারকৃত সাপের মধ্যে বিষধর ওয়ালস ক্রেইট, ব্ন্যাক ক্রেইট, গোখরা, শাখামুটি, গ্রিন পিট ভাইপার রয়েছে। অবিষধর আছে দাঁড়াশ, বেতআঁচড়া, জলঢোঁড়া, মেটে, লাউডগা, দুধরাজ ইত্যাদি। সাপ রেসকিউ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। অসতর্কতায় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। জেনে শুনে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, 'পৃথিবীতে প্রতিটি প্রাণীর বাঁচার অধিকার আছে- সেই উপলব্ধি থেকেই যথাসম্ভব বিপদগ্রস্ত প্রাণীদের বাঁচানোর চেষ্টা করি। ছোটবেলায় ডিসকভারি চ্যানেলে দেখে দেখে মোটামুটি সাপ ধরা আয়ত্ত করে ফেলি। তারপর থেকে বিপদগ্রস্ত সাপগুলোকে বাঁচাতে শুরু করি।'

জানা যায়, বাংলাদেশে তিনি প্রথমবারের মতো জীবিত লেসার ব্ল্যাক ক্রেইট রেসকিউ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'মাছ ধরার জালে সাপটি আটকে ছিল। এটি উদ্ধার করে গবেষণার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভেনম রিসার্চ সেন্টারে পাঠানো হয়েছিল।' জানা যায়, বাংলাদেশে যারা সর্বাধিক ওয়ালস ক্রেইট সাপ উদ্ধার করেছেন, তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম। বাংলাদেশে দ্বিতীয়বারের মতো বিরল প্রজাতির অ্যালবিনো চিকার্ড (অ্যালবিনো জলঢোঁড়া) সাপ উদ্ধার হয় গেল বছরের শেষের দিকে। এই সাপটিরও উদ্ধারকারী তিনি। মাছ ধরার টেঁটা থেকে আহত অবস্থায় সাপটি উদ্ধার করা হয়। আরও একটি নাম না জানা সাপ তিনি কিছুদিন আগে উদ্ধার করেন। জানা গেছে, সাপটি নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। শিগগিরই ফল পাওয়া যাবে।

শাহজাহান একজন প্রশিক্ষিত সাপ উদ্ধারকারী। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভেনম রিসার্চ সেন্টারে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। সেখানে প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন ভেনম রিসার্চ সেন্টারের ট্রেইনার ও গবেষক বোরহান বিশ্বাস ও গবেষক আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী।