নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য আমাদের সুস্থ ও সবল মা প্রয়োজন। মায়ের স্বাস্থ্য নিশ্চিত হলে শিশুর স্বাস্থ্যের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। একজন অন্তঃসত্ত্বা মায়ের তার পরিবার, সমাজ, সরকার ও স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে উপযুক্ত সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আমরা এ ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছি। তবে এ ক্ষেত্রে রয়েছে বহু বাধা, সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ। নিরাপদ মাতৃত্বের সেসব চ্যালেঞ্জ নিয়েই  লিখেছেন জান্নাতুল মাওয়া

ভালোবাসার অন্যতম নিদর্শন তাজমহল। শুধু শাহজাহান ও মমতাজের ভালোবাসা উপভোগ এবং নিজেদের সেই স্রোতে গা ভাসাতে হাজার মাইল দূূর থেকে মানুষ ছুটে আসে আগ্রায়। এই ঐতিহাসিক দৃষ্টিনন্দন প্রেমের সমাধির পেছনে আছে এক মায়ের প্রসবকালীন মর্মান্তিক মৃত্যুর গল্প। ১৪তম সন্তান গৌহর বেগমের জন্মদানের সময় মাত্র ৩৮ বছর বয়সে মারা যান মমতাজ। শোনা যায়, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়। সম্পদ, ভালোবাসা, ভালো লাগার মানুষ- কোনো কিছুর বিনিময়ে বন্ধ করা যায়নি তাঁর এ অনাকাঙ্ক্ষিত বিদায়। অনিরাপদ মাতৃত্ব টিকে ছিল, টিকে আছে অতীত থেকে বর্তমানে। এ থেকে সম্রাজ্ঞী যেমন বাদ পড়েন না, তেমনি হাজারো সাধারণ মা হাজার বছর ধরে অসময়ে বিদায় নিয়েছেন। কত শিশু পৃথিবীর মুখ দেখতে পারেনি, আবার কতজন 'মা' শব্দটি শিখলেও মায়ের মমতা পাননি। তাই মা হওয়া খুব সহজ বিষয় নয়। সন্তান ধারণ থেকে শুরু করে জন্মের পর পর্যন্ত একটা বিরাট জটিল ও মৃত্যুঝুঁকির চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেন আমাদের মায়েরা।

পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং বংশগতির ধারক-বাহক হিসেবে মায়েদের এই পথ কোনোদিনই এতটা সহজ ছিল না। তবে কেন মায়েদের অকালে মৃত্যু হচ্ছে, তার ওপর কাজ করলে হয়তো বহু আগেই ঝুঁকিপূর্ণ মাতৃত্ব পরিণত হতো নিরাপদ মাতৃত্বে।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, গর্ভাবস্থায় এবং প্রসব সম্পর্কিত প্রতিরোধযোগ্য কারণে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ নারীর মৃত্যু হয়। সেই হিসাবে প্রতি ২ মিনিটে একজন নারী মারা যান। ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরা মারা গেছেন আঘাত, সংক্রমণ এবং প্রতিবন্ধকতার কারণে, যা সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। ২০১৭ সালে আনুমানিক সাড়ে ২৯ হাজার নারী গর্ভাবস্থায় এবং প্রসবজনিত কারণে মারা যান। তাঁদের অধিকাংশ মারা গেছেন গুরুতর রক্তপাত, সেপসিস, একলাম্পসিয়া, বাধাগ্রস্ত প্রসব এবং অনিরাপদ গর্ভপাতের কারণে, যা চিকিৎসা ব্যবস্থার হস্তক্ষেপে সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। ২০১৭ সালে গর্ভাবস্থায় এবং প্রসবের সময় মারা যাওয়া কয়েক লাখ নারীর মধ্যে প্রায় ৮৬ শতাংশই সাব-সাহারা আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার। তবে ২০০০ সাল থেকে এ ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মাতৃমৃত্যুর হার ৩৮ শতাংশ কমেছে। প্রতি এক লাখে ৩৪২ থেকে কমে তা দাঁড়িয়েছে ২১১ জনে। দক্ষিণ এশিয়াতে আগের তুলনায় মাতৃমৃত্যুহার অনেক কমেছে। একই সময়ে মাতৃমৃত্যুর হার এ অঞ্চলে কমেছে ৫৯ শতাংশ, প্রতি লাখে ৩৯৫ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৬৩ জনে। বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যুহার হ্রাস করতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০০১ থেকে '১০ সাল পর্যন্ত প্রতি লাখে মাতৃমৃত্যু ৩২২ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৯৪-তে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, তা ২০১৫ সালে ১৭৬ এবং বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৭ সালে ১৭৩ জনে দাঁড়িয়েছে। তবে মনে করা হয়, গত কয়েক বছরে তা আরও সাফল্য অর্জন করেছে।

মাতৃমৃত্যুহার একেবারে শূন্যের কোঠায় না এলে নিরাপদ মাতৃত্ব পুরোপুরি অর্জন করা সম্ভব হবে না। মাতৃমৃত্যুহার কমলেই যে শুধু নিরাপদ মাতৃত্ব অর্জিত হবে, তা কিন্তু নয়। নিরাপদ মাতৃত্ব এমন একটা অবস্থা, যেখানে কোনো নারী মা হবেন কিনা, কখন হবেন, সেটি একান্তই তাঁর সিদ্ধান্ত। গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর জন্মের পরও সব সেবা ও সুবিধার সুযোগ পাওয়া। এ সময়ে সব তথ্য, করণীয় এবং জরুরি প্রসূতি সেবা পাওয়া। শুধু গর্ভধারণ থেকে শুরু করে ৪২ দিন পর পর্যন্ত নিরাপত্তা পাওয়া কিন্তু নিরাপদ মাতৃত্ব অর্জনের লক্ষ্য নয়। অবশ্যই বাকি বিষয়গুলোও পূরণ করতে হবে।

অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী তাঁর 'নিরাপদ মাতৃত্বের জন্যে' বইয়ে উল্লেখ করেন, মাতৃমৃত্যুর মূল কারণ হলো- রক্তক্ষরণ, সংক্রমিত গর্ভপাত, একলাম্পসিয়া, প্রসব-পরবর্তী সংক্রমণ, বাধাগ্রস্ত প্রসব। এ ছাড়া প্রসব সংক্রান্ত কারণে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা হয়ে থাকে। সেগুলো হলো- জরায়ুর সংক্রমণ, রক্তস্বল্পতা, পেরিনিয়াম ছিঁড়ে যাওয়া, ভেসিকো ভেজাইনাল ফিস্টুলা, অনবরত প্রসব, রেকটো ভেজাইনাল ফিস্টুলা ও বন্ধ্যত্ব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে চারটি স্তম্ভ চিহ্নিত করেছে। সেগুলো হলো- পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভকালীন সেবা, নিরাপদ প্রসব, জরুরি প্রসূতি সেবা। নিরাপদ মাতৃত্ব ও শিশুমৃত্যু কমাতে এ চারটি স্তম্ভ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপদ মাতৃত্ব সব নারীর অধিকার। তবে এ অধিকারপ্রাপ্তি মোটেও সুলভ হচ্ছে না অনেক ক্ষেত্রে। মুখোমুখি হতে হয় নানা চ্যালেঞ্জের। এসব চ্যালেঞ্জের বিরাট অংশজুড়ে আছে শারীরিক জটিলতা, মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতি, পারিপার্শ্বিক সম্পর্ক ও পরিবেশ।

কানিজ শাইমা, ৩২ বছর বয়সী একজন উন্নয়নকর্মী। চুয়াডাঙ্গা সদরের সবুজপাড়া নতুনবাজার এলাকার বাসিন্দা। তিনি বলেন, 'আমার যখন বিয়ে হয় তখন পুরো করোনা পরিস্থিতি এবং কেউ কেউ বললেন, বয়স হয়ে যাচ্ছে; এর পর আর বাচ্চা হবে না। তাই বাচ্চা নিলাম, সঙ্গে সঙ্গে চাকরি ছেড়ে দিলাম। কিন্তু বাচ্চা নেওয়ার পর সবাই বলল, এখন বাচ্চা নেওয়ার কী দরকার ছিল? আর কিছুদিন চাকরি করুক। তখন একে তো বেকার, আবার বাচ্চা পেটে মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। আমার সাধারণ সমস্যাগুলো পরিবারের অন্যরা বুঝতে চেষ্টা করত না। ওই অবস্থায় সংসারের সব কাজ করতে হতো এবং বিশ্রাম নিলে বলত, সব সময় শুয়ে-বসে থাকলে হবে? বাইরে কাজ না করলে বাড়ির কাজ করো। আমার ভীষণ কষ্ট হতো তখন। আমার প্রেশার কখনও লো হতো, কখনও হাই হতো, শ্বাসকষ্ট হতো এবং ঘুম হতো না। খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়- এটা খাওয়া যাবে না, ওটা খাওয়া যাবে না। এমনিতে খেতে কষ্ট হতো, তার ওপর খাওয়ার অনিয়মের কারণে আমার শরীর দুর্বল লাগত সব সময়। বড় যন্ত্রণায় পড়লাম যখন এমন একটা মনোভাব তৈরি হলো চারপাশে- ভূমিষ্ঠ হতে যাওয়া সন্তানটি ছেলে হতেই হবে।'

সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার বাল্যবিয়ের শিকার কেয়া (১৭) বলেন, 'বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চা নেওয়ার জন্য এক ধরনের চাপ দেওয়া হয়। তখন কিচ্ছু বুঝি না; শরীর খারাপ লাগত, মাথা ঘুরত। আমাদের এখানকার পানি লোনা। নোংরা পানিতে গোসল করতে হয়। এমনিতেই শরীর সব সময় খারাপ থাকে, তার ওপর গায়ে ঘা, প্রস্রাবের জ্বালা, প্রেশার বেশি। ডাক্তার বললেন পরিস্কার পানিতে গোসল করতে। কিন্তু এখানে নদীর পানি লোনা। বৃষ্টি না হওয়ার কারণে প্রতিটি পুকুরের পানি নোংরা; টিউবওয়েলের পানিতে আয়রন। খাওয়ার পানি সংগ্রহ করাই যেখানে কঠিন, সেখানে গোসলের জন্য পরিস্কার পানি কোথায় পাব?'
লন্ডনের এইচএস ট্রাস্টের কনসালট্যান্ট মিডওয়াইফ এবং ওয়ার্ল্ড কলেজ অব মিডওয়াইফ গ্লোবালের ফেলো সারা গ্রেগসান বাংলাদেশে তিনবার এসেছেন এখানকার মিডওয়াইফদের (ধাত্রী) প্রশিক্ষণের জন্য। সারা মনে করেন, অনুন্নত ও দরিদ্র দেশগুলোতেই শিক্ষা, দারিদ্র্য ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবার অভাবে মাতৃমৃত্যু বেশি হচ্ছে। তবে বর্তমানে মাতৃত্বকালীন বড় চ্যালেঞ্জ হলো করোনা। তাই অনাবশ্যক অনেক কারণে মা ও শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে।

সারা বলেন, 'যদিও উন্নত ও অনুন্নত দেশ মিলে মাতৃমৃত্যুহার রোধে আমরা অগ্রগতি অর্জন করেছি, এখন তা থেকে ছিটকে পড়েছি। বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাল্যবিয়ে, দারিদ্র্য, স্বাস্থ্যসেবার অসহজলভ্যতা ও স্বাস্থ্যশিক্ষার অভাব। আমি বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে দুই ভাগে ভাগ করতে চাই- ধনী শ্রেণি ও দরিদ্র শ্রেণি। ধনীরা সাধারণত মিডওয়াইফের কাছে যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে এবং তারা সিজারের দিকে ঝুঁকছে বেশি। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের সিজার করার প্রয়োজন পড়ে না। আর দরিদ্রদের ক্ষেত্রে একটা বড় চ্যালেঞ্জ নির্ধারিত স্বাস্থ্যসেবার কাছে পৌঁছানো। ইচ্ছা-অনিচ্ছা অথবা পরিস্থিতিতে পড়ে তারা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তবে বাংলাদেশে মিডওয়াইফরা অনেক ভালো কাজ করছে এবং নিরাপদ মাতৃত্ব অর্জনে তারা ভূমিকা রাখছে।'

বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি সঙ্গীতা সাহা প্রেমা বলেন, 'আমাদের দেশে মাতৃমৃত্যুর বড় চ্যালেঞ্জ হলো হাসপাতালে ডেলিভারি করতে অনাগ্রহ, দূরবর্তী অবস্থা, আর্থিক অসচ্ছলতা, পরিবারের সহযোগিতা না থাকা, পর্যাপ্ত খাবারের অভাব, ছেলে সন্তান কামনা- এগুলোই একজন মায়ের বড় প্রতিবন্ধকতা। তবে বাংলাদেশে যাঁরা মিডওয়াইফ হিসেবে কাজ করছেন, তাঁদের কিন্তু মূল দায়িত্ব অন্তঃসত্ত্বা মায়ের সেবা।

মিডওয়াইফদের কিন্তু পোস্টিংই হচ্ছে ইউনিয়ন থেকে। ফলে দূরে যেতে হচ্ছে না মায়েদের। তারা যখন আসছেন, তখনই কিন্তু পরিবারের লোকজন সঙ্গে থাকছেন। একই সঙ্গে কাউন্সেলিংও হয়ে যাচ্ছে এবং তারা ফ্রি ওষুধও পাচ্ছেন। এখন কিন্তু মাতৃমৃত্যুহার অনেক কমে গেছে এবং এই সাফল্যে অনেকের চেয়ে কিন্তু আমরা এগিয়ে।'

লেখার শুরুতেই বলেছিলাম, খুঁজলেই পাওয়া যাবে সমাধান। আমরা জানি সমস্যা কোনগুলো। এসব সমস্যা সমাধান করাই বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেই তৈরি করতে হবে প্রত্যেক নারীর জন্য মাতৃত্ব বলয়, যেন কোনো নারী জীবন না হারায়, কোনো সন্তান জন্মের পর 'মা' ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত না হয়। বিশ্বব্যাপী মাতৃমৃত্যুর ভয়াবহতা উপলব্ধি করে মাতৃত্বকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর অঙ্গীকার নিয়ে ২৮ মে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস পালিত হয়। এই দিবসে নতুন করে মায়েদের মৃত্যুর তালিকার বদলে মাতৃমৃত্যু শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে- এমন সুসংবাদ পেতে চাই। সত্যিকার অর্থে মায়ের জন্য ঝুঁকিহীন ও নিরাপদ দেশ এবং পৃথিবী চাই।

লেখক :উন্নয়নকর্মী