পৃথিবীতে যেসব পেশায় জীবনের ঝুঁকি থাকে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সাংবাদিকতা। আর এই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন এ পেশার সঙ্গে জড়িত অনেক নারী। মার্থা গেলহর্ন বিশ্বের প্রথম যুদ্ধ সাংবাদিকতায় নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। নারীও যুদ্ধ সাংবাদিকতায় পুরুষের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়- মার্থা গেলহর্ন প্রথম এ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

দীর্ঘ ৬০ বছর সাংবাদিকতা পেশায় কর্মরত ছিলেন এই প্রথিতযশা সাংবাদিক। তিনি সর্বপ্রথম যুদ্ধ সাংবাদিকতা শুরু করেন ১৯৩৬ সালে ঘটে যাওয়া স্প্যানিশ সিভিল ওয়ার কভার করার মধ্য দিয়ে। এর পর কভার করেছেন একে একে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো দুনিয়া কাঁপানো যুদ্ধের ঘটনাবলি।

সে সময় যুদ্ধ সাংবাদিকতা ছিল সম্পূর্ণরূপে পুরুষের দখলে। সেখানে নারীর যেন ঠাঁই ছিল না। যুদ্ধের ময়দানে নারীর যাতায়াত নিরাপদ নয়- এই অজুহাতে নারীকে যেন অনেকটা কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল। তবে সে ভাবনায় ছেদ ঘটাতেই যেন আবির্ভাব হয় মার্থা গেলহর্নের। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি একজন লেখকও বটে। তাঁকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা যুদ্ধ প্রতিবেদক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

১৯০৮ সালে মিসৌরিতে এডনা ও জর্জ গেলহর্নের ঘরে মার্থার জন্ম। বাবা পেশায় ডাক্তার এবং মা সামাজিক সংগঠক। সাংবাদিকতার আকাঙ্ক্ষা থেকে ১৯৩০ সালে প্যারিসে যাওয়ার পর স্বল্পমূল্যে টাইপরাইটারের কাজ গ্রহণ করেন। প্যারিসেই প্রেস ব্যুরো তাঁকে গ্রহণ করে এবং লিগ অব নেশন্সে মার্থার সাংবাদিকতা জীবনের শুরু। সেখানে তিনি ধীরে ধীরে সাংবাদিকতার খুঁটিনাটি শিখে নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিলিটারি সদস্যরা নারী রিপোর্টারদের রণাঙ্গনে সাংবাদিকতা করার পক্ষে ছিলেন না। কিন্তু মার্থাকে তো আর দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকেই মার্থা সাবমেরিন যুদ্ধের রিপোর্ট করেন। কোনোরকম ফরমাল প্রেস কনফারেন্স ছাড়াই তিনি ইউরোপে চলে যান। কনসেনট্রেশন ক্যাম্প এবং ন্যুরেমবার্গ ট্রায়াল নিয়ে করা রিপোর্ট তাঁর সাহসিকতারই পরিচয় দেয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়েও মার্থা যথেষ্ট ছোটাছুটি করেছেন। উদ্বাস্তু ক্যাম্প ও হাসপাতাল প্রদর্শন করে তিনি অসংখ্য রিপোর্ট করেছেন।

গেলহর্ন মার্কিন কথাসাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের তৃতীয় স্ত্রী। তিনি ১৯৪০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত হেমিংওয়ের স্ত্রী ছিলেন। অসংখ্য প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি তাঁর পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। মৃত্যুর পর মরণোত্তর পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করেন মার্থা। তাঁর নামানুসারে সাংবাদিকতায় মার্থা গেলহর্ন পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়। মার্থা গেলহর্ন নারী সাংবাদিকদের জন্য একজন অনুকরণীয় আদর্শ।