শিল্প-সাহিত্যে আলোচনা-সমালোচনা-পর্যালোচনা খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কোনো শিল্পকর্ম, রচনা বা বইয়ের রিভিউ বা সমালোচনা পত্রিকায় ছাপা হলে সংশ্নিষ্ট শিল্পকর্মটি সম্পর্কে পাঠক আগে থেকেই সে সম্পর্কে জানতে পারেন, তাতে আগ্রহ জন্মায়। একজন পাঠক হয়তো সেই মতামতের ওপর ভিত্তি করে ওই গ্রন্থের গুরুত্ব কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারবে।
'দুর্গা : বিশ্ববরেণ্য ১০ নারীর কবিতা' শিরোনামের গ্রন্থটি অনুবাদ করেছেন কবি ও অনুবাদক মুম রহমান। এখানে গ্রিস, জাপান, ইউক্রেন, চিলি, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, পোল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও দক্ষিণ আফ্রিকার নারী কবিদের কবিতা রয়েছে। প্রত্যেকের দশটি কবিতা। মোট ১০০টি কবিতা দিয়ে বইটির পরিসর সাজানো হয়েছে। লেখক স্পষ্ট করে লিখেছেন- এগুলো তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ, নিজস্ব দর্শনের বহিঃপ্রকাশ।
সাহিত্যে কবিতার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। রয়েছে তার আলাদা শক্তি। যে শক্তি বিদ্রোহ জাগায়। প্রেম জাগায়। বাঁচতে শেখায়। নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। কবিতাহীন জীবন অন্ধ। নিষ্প্রাণ। যে কারণে বারবার কবিতার কাছেই ফিরতে হয়। কখনও পুরোনোকে আঁকড়ে ধরে এগোয়, কখনও নতুনের অন্বেষণ- 'দুর্গা : বিশ্ববরেণ্য ১০ নারীর কবিতা' বইটি ঠিক সে রকম অনুভূতিই দেবে। যেখানে রয়েছে ৬৩০-১৯৬৫ সালের রেখাকল্প।
একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমাদের এ কথা শুনতে হয় যে, সাহিত্যের জগতে নারীরা অনেক পিছিয়ে। অথচ মূল কথা হলো- তাঁদের সামনে তুলে ধরা হয় খুব সামান্যই, যে কারণে তাঁরা সেভাবে মর্যাদা পায়নি। যুগ যুগ ধরেই এ ইতিহাস রচিত হয়েছে। এটা সর্বত্র বিরাজমান। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিও এর বাইরে নয়। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, কাব্যচর্চা, গান গাওয়া এগুলো নারীর হাতেই শুরু হয়েছিল।
বইটি আরও প্রাসঙ্গিক হয়েছে এ কারণে যে, প্রত্যেক কবির সংক্ষিপ্ত জীবনচরিতও তুলে ধরা হয়েছে। যাঁদের ইতিহাস আমাদের জানার বাইরে ছিল। বইটির শুরুতেই আছে গ্রিসের কবি সাফো (৬৩০-৫৭০)। যে ইতিহাস কালের গহ্বরে হারিয়েই গিয়েছে। সে রকম একটি ইতিহাস এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
তাঁর কবিতাগুলো মূলত গীতিধর্মী। তিনি লায়ার নামে এক গ্রিক বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন। যে যন্ত্রের মাধ্যমেই কবিতাগুলোতে সুর দিতেন কিংবা গাইতেন। তিনি গীতিকবিতার পাশাপাশি শোকগাথা এবং আয়াম্বিক ছন্দের কবিতাও লিখতেন। আবার একই সঙ্গে তাঁর কবিতায় ইতিহাস, পুরাণ, এমনকিও সমকালও ঠাঁই পেয়েছে। রয়েছে প্রেমের আবহমান। তিনি লিখেছেন-
ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকি,
নীরব দরজাটিকে দেখি।
দেয়ালে ছায়ারা আসে যায়
আর সিঁড়িরা যায় রাস্তায়।
প্রত্যাশা আর দ্বিধা
ভীরু মনে ফেলে পা
কতজন আসে ঘরে ফিরে
আর তুমি এখনও কত দূরে।

এ কবিতায় কবির প্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কবির ভেতরে প্রেম-আবেগ-অনুভূতির সম্মিলন ঘটলেই লেখার সার্থকতা পাওয়া যায়।
জাপানি কবিদের মধ্যে অনো নো কোমাচি বিশেষ সম্মানীয়, যাঁর সময়কাল ৮২৫ থেকে ৯০০ সাল। তিনি ছিলেন জাপানের ধ্রুপদি ওয়াকা। তাঁর লেখা কবিতা এ সময় এসে পাঠ করলেও একেবারে তরতাজা মনে হয়। অনো নো কোমাচির ১৮টি কবিতা টিকে রয়েছে। যেগুলো মাত্র পাঁচ লাইনে লেখা। এটি বিস্ময়কর। যে কবিতাগুলো আবার বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে রয়েছে। তিনি লিখেছেন-
আমি কি প্রেমের ভাবনায় হারিয়ে গিয়েছিলাম
যখন চোখ ঝিমিয়ে পড়েছিল? সে
এসেছিল আর
সেটুকু কি আমি স্বপনে জেনেছিলাম
নইলে কেন আমি জেগে উঠলাম না।

এই যে প্রেমের বেদনানুভূতির প্রকাশ, যা এখনও ভাবায়, কাঁদায়। একই সঙ্গে প্রেমের ভাবনায় হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি যে কতটা মধুর সেটিও এ পাঁচ লাইনে কবি তাঁর ভাবনায় প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন।
এ ছাড়া কবি আনা আখমাতোভা, গ্যাব্রিয়েল মিস্ত্রাল, সিলভিনা ওকাম্পো, ন্যালি স্যাক্স, ভিস্লাভা সিমব্রোস্কা, মায়া এঞ্জেলো, ফোরাহ ফারুখজাদ ও ইনগ্রিড ইওস্কারের কবিতা রয়েছে এ বইতে। যাঁদের মধ্যে গ্যাব্রিয়েল মিস্ত্রাল ও সিলভিনা ওকাম্পো নামটির সঙ্গে সাহিত্যজগতের মানুষ কিঞ্চিৎ পরিচিত। এর বাইরের নামগুলো হারিয়ে গেছে। এই নামগুলোর ভেতর ফোরাহ ফারুখজাদের কবিতা এক বিস্ময়। কী সুন্দর বহিঃপ্রকাশ! কী আকুতি! প্রতিটি কবিতাই যেন প্রতিরোধের বারুদ। প্রতিবাদী আওয়াজ। তিনি একজন প্রভাবশালী চলচ্চিত্র পরিচালকও। যাঁর সময়কাল ১৯৩৫ থেকে ১৯৬৭ সাল। তাঁকে একজন প্রতিবাদী নারীবাদী হিসেবেও মূল্যায়ন করা হয়। মাত্র ৩২ বছর বয়স জীবনকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ফোরাহ ফারুখজাদের কবিতা ইংরেজি ভাষায় তো বটেই, রুশ, জার্মান, ইতালীয়, আরবি, উর্দু, নেপালি, তার্কিশ, উজবেক এবং বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
'দুর্গা : বিশ্ববরেণ্য ১০ নারীর কবিতা'র বইটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কেননা ঐতিহাসিক ব্যক্তিবর্গের জীবন জানতে হলেও ইতিহাসের দ্বারস্থ হওয়ার বিকল্প নেই। এ বইটি সে অভাব কিছুটা হলেও পূরণ করবে। বইটির প্রচ্ছদ সুন্দর। ১০ ব্যক্তির মুখাবয়ব রয়েছে প্রচ্ছদে। একই সঙ্গে কবিতার সঙ্গে আলাদাভাবে কবির ছবি যুক্ত করা হয়েছে। যাতে একজন পাঠকের বুঝতে সুবিধা হবে।
দুর্গা
বিশ্ববরেণ্য ১০ নারীর কবিতা
অনুবাদ : মুম রহমান
প্রকাশক : জলধি
প্রচ্ছদ : তাইফ আদনান
মূল্য : ৪০০