ত্যাগ-তিতিক্ষা আমাদের জীবনেরই অংশ। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় জীবনের নানা পর্যায়ে আমাদের কতকিছু ছেড়ে আসতে হয়। জীবনের স্তরে স্তরে ব্যর্থতা, বেদনার বাধা আসে- তার ভেতরে থেকেই জীবনে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আমাদের কঠিনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সংকল্প শক্ত হলেই শুধু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবে রূপায়ণ করা সম্ভব। জীবনের বিনিময়ে হলেও সেই সিদ্ধান্তের দিকে নিয়োজিত থাকতে হয়। জীবন একটা সংগ্রাম, এই সংগ্রামে জয়লাভের অন্য কোনো পথ নাই। এই পরিসরে আমি আমার জীবন সংগ্রামের কিছু কথাই শুধু বলতে পারি।
আমি পাড়াগাঁয়ের ছেলে। আমার জন্ম বর্তমান নেত্রকোনার কেন্দুয়া থানার চন্দ্রপাড়া গ্রামে। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম আমার। তবে পরিবারটি বিত্তের দিক দিয়ে দরিদ্র হলেও, তার চিত্তসম্পদ ছিল অত্যন্ত সম্পন্ন। আমার পিতামহ রামদয়াল সরকারের বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার অভ্যাস ছিল। ছোটবেলাতেই তিনি আমাকে পাশে নিয়ে বসে রামায়ণ-মহাভারতের গল্প থেকে আরম্ভ করে নানা মনীষীর জীবনী পড়ে শোনাতেন এবং আমার মুখ থেকে সেগুলো আবার শুনতে চাইতেন।
এইভাবে ছেলেবেলা থেকেই যেসব বিষয় সম্পর্কে আমি জেনেছিলাম, আমার আশপাশের সমবয়সী অনেকেই তেমনটা জানতে পারেনি। বলা যায়, আমি অনেকটা ইঁচড়ে পাকা হয়ে গড়ে উঠেছিলাম। সেই ইঁচড়ে পাকা অবস্থাতেই ১৯৪৮ সালে আমি নেত্রকোনা চন্দ্রনাথ হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই। আমার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে আমার হাইস্কুলে পড়াশোনা চলতে থাকে।
সে সময় একবার আমাদের এখানে একটা সভা হয়েছিল, যে সভাতে বক্তৃতা করতে বাইরে থেকে একজন অধ্যাপক এসেছিলেন। যতদূর মনে পড়ে তাঁর নাম ছিল সুধীন্দু চক্রবর্তী। তিনি যে বক্তৃতাটা দিয়েছিলেন সেই বক্তৃতাটি তীব্রভাবে দাগ কেটেছিল আমার কিশোর মনে, যা এখনও আমার মনে গেঁথে আছে; এবং শুনলাম তিনি হচ্ছেন একজন প্রফেসর। তখনকার দিনে বেসরকারি কলেজের সব শিক্ষকই প্রফেসর নামে আখ্যায়িত হতেন। সেই সুধীন্দু প্রফেসরের কথাগুলো আমার এত ভালো লাগল- সেদিন আমার মনে হয়েছিল যে, প্রফেসরের চেয়ে বোধহয় বড় কিছু নেই। আমাকে প্রফেসর হতে হবে। এবং প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হবে কথাটা যে, সেদিনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম যেভাবেই হোক আমি প্রফেসর হব। জীবনের তখনকার বাস্তবতায় সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবে রূপ দেওয়া যদিও কঠিন ছিল আমার পক্ষে, তবু সেই কঠিনতাকে অবলম্বন করে, কঠিনকে ভালোবেসে আমি সামনের দিকে কীভাবে অগ্রসর হয়েছিলাম- সেই কথাগুলোই কিছু কিছু বলব।
নেত্রকোনা শহরে যে বাসায় থেকে পড়তাম, তারা একসময় ভারতে চলে গেল। কাজেই আমারও সেখানকার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। গ্রামে ফিরে এলাম। সেখানে লেখাপড়া খুব কঠিন; আশপাশে কোনো স্কুল নেই। স্কুল আছে সাড়ে চার মাইল দূরে। সেই স্কুলে গিয়েই সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হলাম। কিন্তু স্কুলে তেমন কোনো শিক্ষকই নেই বলতে গেলে। পাকিস্তান আমল- শিক্ষিত মানুষ সব নানা দিকে চাকরি নিয়ে চলে গেছেন। আজ একজন শিক্ষক আসেন তো কাল চলে যান। এমন অবস্থায় আমার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া একরকম হয়নিই বলা যায়। এভাবেই ক্লাস সেভেন পাস করলাম।
অষ্টম শ্রেণিতে উঠলাম- তখন ১৯৫০ সাল। পাকিস্তানে একটা দাঙ্গা সংঘটিত হলো। যা-ও হিন্দু ছিল এ দেশে, তার অনেকেই সেই দাঙ্গায় দেশ ছেড়ে চলে গেল। আমরাও স্কুল থেকে চলে আসতে বাধ্য হলাম- কারণ তখন সপ্তম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত একটা বাধ্যতামূলক ক্লাস ছিল, আমরা তাতে সংস্কৃত পড়তাম। কিন্তু স্কুলের সংস্কৃত শিক্ষক পণ্ডিতমশাই ভারতে চলে গেলেন। কাজেই ওই স্কুলে আর পড়া হলো না।
আমার বাবা ছিলেন হোমিওপ্যাথির ডাক্তার। দাঙ্গায় অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণে বাবার সেই চিকিৎসা পেশা বন্ধ হয়ে গেল। আমাদের পরিবারের দারিদ্র্য আরও বেড়ে গেল। আমি সেই সময় আমাদের বাজারের কাছে একটা গাছতলায় পান-বিড়ি-সিগারেট ও বিভিন্ন মনোহারি দ্রব্য নিয়ে দোকানদারি করতে বসে গেলাম। সেই দোকানদারি করেছি বটে, তবে সেখানে বসে বসেও আমি বই পড়েছি। তখন একাডেমিক লেখাপড়ার দিকে যদিও আমার মনোযোগ ছিলই না একপ্রকার, পাঠ্যবইগুলো আমাকে পড়তে হতো ঠিক 'রোগী যেন নিম খায় মুদিয়া নয়ন'-এর মতো। তবে অপাঠ্য পুস্তক, যেগুলো ছোটবেলা থেকে পড়ে এসেছি- ছাত্রদের সেই অপাঠ্য পুস্তক পড়তে দেখলে অভিভাবকরা তাদের বলতেন, তাদের চরিত্র নষ্ট হয়ে যাবে। আমার অভিভাবকরা একটু আলাদা ধরনের ছিলেন- সেটা আমি আগেই বলেছি। অপাঠ্য পুস্তক পড়তে তারা আমাকে বাধা দেননি। ওগুলোই আমি পড়তাম বেশি। আমার তাই চরিত্র নষ্ট হবার জোগাড় হলো তখন। স্কুলের পাঠ্যপুস্তক আমি সেই রোগীদের নিম খাওয়ার মতো চোখ বন্ধ করে কোনোরকমে পড়তাম। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থাকাকালীনই আমি কৃত্তিবাসের রামায়ণ, কাশীরাম দাসের মহাভারত পড়ে শেষ করেছি, শরৎচন্দ্র পড়েছি। ম্যাট্রিক পাস করার আগেই আমার বঙ্কিমচন্দ্রের প্রায় সব রচনা পড়া শেষ হয়ে গেছে।
গ্রামের পূর্বদিকে তিন মাইল দূরে আরেকটি স্কুল ছিল- আশেকী হাইস্কুল। সেখানে আমার বাবাও পড়তেন। দোকানদারি করেটরে তখন সেই স্কুলে পড়া শুরু করলাম। সেই স্কুলের প্রবীণ শিক্ষক জয় চন্দ্র রায় আমাকে বলতেন নাতিছাত্র। সেই স্কুলে সংস্কৃতের শিক্ষক ছিলেন। সেখানে সংস্কৃতসহ পড়লাম। তবে বিনাবেতনে পড়তে না দিলে সেখানে পড়াও আমার জন্য সম্ভব হতো না তখন। এভাবে কষ্টেসৃষ্টে ১৯৫৪ সালে আমি ম্যাট্রিক পাস করি।
কলেজে ভর্তি হতে হবে। কিন্তু সে যোগ্যতা তখন আমার নাই। এক বছর কোনোরকমে টিউশনি করে টাকাপয়সা জোগাড় করে নেত্রকোনা কলেজে এসে ভর্তি হলাম। এক বাসায় থাকতাম যারা নিজেরাও ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। তাদের সম্ভব হলে কিছু চালটাল কিনে দিতাম। কাজেই খেয়ে না খেয়েই আমার দিন কেটেছে। এভাবেই নেত্রকোনা কলেজে আমি আইএ পড়েছি। এর ভেতরেই তখন আমি নেত্রকোনা কলেজে সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলাম। সে সময় বিভিন্ন বিতর্ক ও বক্তৃতাসভায় অংশগ্রহণ করতাম এবং এর মধ্য দিয়ে আমি রীতিমতো বক্তা হয়ে উঠলাম। তারপর কোনোরকমে আইএ পাস করলাম। নেত্রকোনা কলেজ আইএ পর্যন্তই তখন। আর তখনকার দিনে আজকের মতো হাটে-মাঠে-বাজারে এত কলেজও ছিল না- তাই আমাকে আরও পড়াশোনা করতে হলে যেতে হবে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে। সেই আনন্দমোহন কলেজে একরকম জোর করেই গিয়ে ভর্তি হলাম। ময়মনসিংহে আমার থাকার জায়গা নাই। এরওর বাসায় কোনোরকমে দিন কাটাচ্ছি। সে সময় মহাদেব সান্ন্যাল বলে এক লোকের সাথে আমার পরিচয় হলো। তিনি অনেক সাহায্য-সহযোগিতা করলেন। একটা লজিং জোগাড় করে দিলেন, যার দরুন বিএ ক্লাসের পড়াশোনাটা আমি কোনোরকমে চালিয়ে যেতে সক্ষম হলাম। বিএ পড়ার সময় অজয় রায় ও আরও কিছু মানুষের নেতৃত্বে একটা পাঠচক্র তৈরি হয়েছিল। সেই পাঠচক্রের সদস্য হয়েছি, সেখানে বিভিন্ন বিষয় বিশেষ করে মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা বইপত্র আমাকে পড়তে দেওয়া হতো; এবং সেইসব বই পড়ে আমি তখন মার্ক্সবাদী দর্শনে দীক্ষিত হয়ে গেলাম। যার ফলে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আমার একটা সংযোগ তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
বিএ পাস করলাম। কিন্তু এখন কী করব? নানারকম বিধিনিষেধের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ-তে ভর্তি হওয়াটা কঠিন হয়ে পড়েছে তখন। কী করব তাহলে! যেহেতু বিএ পাস করেছি- বারহাট্টা হাইস্কুলে আমার একটা মাস্টারি জোগাড় হয়ে গেল। সে সময়ে ১২৫ টাকা মাইনা আমার জন্য যথেষ্টই বলা যায়। সেখানে এক বাড়িতে থেকে, টিউশনি করে কিছু টাকা জমালাম। আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে, যেভাবেই হোক আমাকে এমএ পড়তে হবে।
কিন্তু বছরখানেকের মধ্যেই আমার টাকা জমানোর পথটা বন্ধ হয়ে গেল। কারণ তখন নেত্রকোনায় আমাকে একটা বাসা নিতে হলো- আমার ছোট বোন নেত্রকোনায় এসে স্কুলে পড়বে, গ্রামে নানান অসুবিধার কারণে পড়াশোনা করতে পারছে না। নেত্রকোনার বাসার খরচ জোগাতে গিয়ে আমার আর হাতে তেমন টাকা থাকত না।
দুই বছর পর আমি গেলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। উদ্দেশ্য সেখানে বাংলা বিভাগে পড়ব। কিন্তু সেখানেও ভর্তি হওয়া কঠিন। মাত্র দুইজন ছাত্র নেওয়া হবে, আবেদন করেছে ৩৫ জন। বলা হলো পরীক্ষা দিতে হবে। একটা পরীক্ষা হলো, যাতে আমি প্রথম স্থান অর্জন করলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়ে সেখানে শিক্ষক হিসেবে পেলাম ডক্টর মোহাম্মদ এনামুল হককে। তার কাছ থেকে ভাষাবিজ্ঞানের যে শিক্ষাটা পেয়েছি, সেই শিক্ষা আমার সারাজীবন কাজে লেগেছে। আর পেয়েছিলাম মুস্তাফা নূরউল ইসলামকে, যিনি আমাদের আধুনিক সাহিত্য পড়াতেন।
রাজশাহীতে থেকে এমএটা কীভাবে শেষ করেছি- সেটা বলে বোঝানো খুব মুশকিল। কারণ আমার কাছে কোনোরকমে এক বছর কাটানোর মতো টাকা ছিল। তাই দ্বিতীয় বছরে এসে এমন অবস্থা আমার হলো- যা ভাষায় প্রকাশ আসলেই দুরূহ। খেয়ে না খেয়ে- কোনোদিন একটা রুটি কিংবা একটা মুড়ির নাড়ূ খেয়ে দিন কাটিয়েছি। ফাইনাল ইয়ারে উঠে লাগল আরেক বিপত্তি। সালটা তখন ১৯৬৩- পশ্চিমবঙ্গে রায়ট লাগল। সেই রায়টের ধাক্কা এসে পড়ল বাংলাদেশেও। রাজশাহীতে রায়ট লেগে গেল। শুভেন্দু চক্রবর্তী নামে আমাদের এক শিক্ষক ছিলেন, তাঁর বাসায় গিয়ে রাতে থাকতাম। সেখান থেকে দেখতাম আশপাশের হিন্দু বাড়িগুলোতে সমানে আগুন জ্বলছে, নরনারীদের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। প্রায় সকালবেলা বহু লাশ বহন করে নিয়ে যেতে দেখতাম। অনেক হিন্দু ছেলেমেয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিল। আমি লেগে রইলাম। একপ্রকার ভিক্ষা করে জীবন চালাতে হয়েছে আমাকে এমএ ক্লাসে পড়ার সময়। তবু এমএ আমাকে পাস করতে হবে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি পড়াশোনাটা চালিয়ে গিয়েছি।
এমএ পরীক্ষার ফলাফল ভালোই হলো আমার। সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছিল সবাই, আমি সেকেন্ড ক্লাস ফার্স্ট হলাম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পেলাম না আমি। কারণ আমার তো বিএ-তে পাস কোর্স ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে হলে অনার্স প্রয়োজন।
রাজশাহী থেকে ফিরে আমি তখন গৌরীপুর হাইস্কুলে মাস্টারি শুরু করেছি। সেখান থেকে একদিন ময়মনসিংহ নাসিরাবাদ কলেজে গিয়ে আমি ইন্টারভিউ দিলাম। সেখানে অনেক রকমের প্রশ্ন আমাকে করা হয়েছিল। সেদিন যারা ইন্টারভিউ বোর্ডে ছিলেন, তাঁরা বলেছিলেন- আপনি তো হিন্দু, আপনি তো এই দেশে থাকবেন না, আপনি তো চলে যাবেন, আপনাকে চাকরি দিয়ে কী হবে? এইরকম নানান মন্তব্যে ও তির্যক প্রশ্নের কারণে আমি সেই চাকরির আশা বাদ দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, আমাকে এখানে শিক্ষকতা করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু পরে জানতে পারলাম যে, না আমার বক্তব্যে সবাই খুশিই হয়েছেন। ১৯৬৪ সালের আগস্ট মাসে নাসিরাবাদ কলেজে আমি যোগদান করলাম।
সেই যে ছোটবেলার সিদ্ধান্তের কথা আমি বলেছিলাম, আমি প্রফেসর হবো- সত্যি সত্যি একদিন আমি তাই হলাম। এবং আমার নিয়োগপত্রেও লেখা ছিল- যতীন সরকার, প্রফেসর অব বেঙ্গলি। এটা দেখে আমার বেশ ভালো লাগল। আমি যা চেয়েছিলাম, তা আমি হতে পেরেছি।