শায়ান চৌধুরী অর্ণব একাধারে কণ্ঠশিল্পী, সুরকার, সংগীতায়োজক ও চিত্রশিল্পী। একুশ শতকের শুরু থেকে ভিন্ন ধাঁচের শব্দ-সংযোজনার মধ্য দিয়ে তিনি রচনা করেছেন সংগীতের নতুন অধ্যায়। নন্দিত এই শিল্পীকে নিয়ে লিখেছেন রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ

'কেউ নতুন কিছু চাইতেই পারে। হোক সেটা ভালোবাসার দাবিতে, কিংবা সময়ের প্রয়োজনে। কিন্তু এটা তো বুঝতে হবে, সৃষ্টি আর ফরমায়েশ মেটানো এক নয়। সৃষ্টির জন্য মনের গহীন হাতড়ে বেড়াতে হয়। এই অনুসন্ধান চলতে থাকে দিনের পর দিন। তারপর কোনো এক সময় হঠাৎ মিলে যায় কাঙ্ক্ষিত সুর। এরপর চলে সংগীতের মূর্ছনায় তাকে বেঁধে নেওয়ার চেষ্টা। কথা-সুরের কাটাছেঁড়া শেষে তৈরি হয় কোনো একটি গান। তাই নতুন কিছুর জন্য কিছুটা সময় নিজেকে না দিলেই নয়।'- নতুন গানের প্রশ্নে এমন কথাই শোনা গেল নন্দিত কণ্ঠশিল্পী ও সংগীত পরিচালক শায়ান চৌধুরী অর্ণবের কাছে। তাঁর মুখে এমন কথা অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ অর্ণব বরাবরই স্রোতের জোয়ারে গা ভাসাতে নারাজ। স্বকীয়তা বজায় রেখে নতুন সব সৃষ্টিতে মেতে উঠতে আগ্রহী।

জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে যেকোনো কাজ নিয়ে তাঁকে ব্যস্ত হয়ে উঠতে দেখা যায় না। সে কারণেই সংগীতপ্রেমীরা অ্যালবাম থেকে শুরু করে একক গান, প্লেব্যাকসহ মঞ্চের পরিবেশনাতেও অর্ণবকে প্রতিবার নতুনভাবে আবিস্কারের সুযোগ পেয়েছেন। বাংলা ব্যান্ডের অ্যালবাম থেকে শুরু করে তাঁর একক 'চাই না ভাবিস', 'হোক কলরব', 'ডুব', 'রোদ বলেছে হবে', 'আধেক ঘুমে', 'খুব ডুব', 'অন্ধ শহর'সহ বন্ধুদের নিয়ে করা বিভিন্ন অ্যালবাম আয়োজনে পাওয়া গেছে অন্য সবার চেয়ে ভিন্নভাবে। কথা-সুর-সংগীত সবকিছু মিলিয়ে অর্ণবের প্রতিটি আয়োজন ছিল পুরোপুরি তাঁর নিজস্ব চিন্তাধারার। কারণ অর্থ নয়, আত্মতৃপ্তির জন্যই সমস্ত সৃষ্টি।

অর্ণব একাধারে কণ্ঠশিল্পী, গীতিকবি, সুরকার, সংগীত পরিচালক ও চিত্রশিল্পী। এর বাইরেও আমরা তাঁকে মডেল হিসেবে বিজ্ঞাপনে কাজ করতে দেখেছি। তাঁকে নিয়ে 'আধখানা ভালো ছেলে আধখানা মাস্তান' নামের মিউজিক্যাল সিনেমাও নির্মিত হয়েছে। অভিনয়, মডেলিংয়ের বাইরেও জনপ্রিয় শিল্পী, নির্মাতা পরিচয়েও নিজেকে উপস্থাপন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। অ্যানিমেশন সিনেমা নির্মাণে ইচ্ছা আছে বলেও জানিয়েছেন। এত কিছুর পরও সবার কাছে অর্ণবের কণ্ঠশিল্পী ও সুরকার পরিচয়ই প্রাধান্য পেয়েছে। সে কারণে সবাই প্রতীক্ষায় থাকেন তাঁর নতুন গানের। কিন্তু কবে তা প্রকাশ পাবে, সেটা শ্রোতা যেমন জানেন না, তেমনি জানেন না অর্ণব নিজেও। একটু আড়ালে থাকতে ভালোবাসেন তিনি। শহুরে কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে বাঁধেন আস্তানা।

এরপর হঠাৎ একদিন বেরিয়ে আসেন চমকে দেওয়া কোনো সৃষ্টি নিয়ে। যেমন অনেকদিন আড়ালে থাকার পর এবার হঠাৎ করেই হাজির হয়েছেন 'কোক স্টুডিও বাংলা' মঞ্চে। যেখানে দাঁড়িয়ে তুলে ধরছেন কালজয়ী গানের ফিউশনধর্মী একের পর এক আয়োজন, যা এরই মধ্যে দর্শক-শ্রোতার মাঝে দারুণ সাড়া ফেলেছে। মুখে মুখে ফিরছে 'কোক স্টুডিও বাংলা'য় অনিমেষ রায় ও পান্থ কানাইয়ের গাওয়া 'নাসেক নাসেক', মমতাজ ও মিজানের 'প্রার্থনা', ঋতুরাজ ও নন্দিতার 'বুলবুলি' এবং সুমি ও র‌্যাপ ব্যান্ড জালালি সেটের 'ভবের পাগল'সহ অন্য গানগুলো। অর্ণব নিজেও এই আয়োজনে তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম 'চাই না ভাবিস'র 'চিলতে রোদে' গানটি নতুনভাবে গেয়েছেন রিপন কুমার সরকারের সঙ্গে। কালজয়ী ও শ্রোতাপ্রিয় গানের ফিউশনধর্মী এই পরিবেশনা নিয়ে অর্ণব বলেন, ''আমরা সেই গানগুলোই নতুন করে শোনাচ্ছি, যেসব গানে পাওয়া যায় আমাদের শিকড়ের সুধা- পরিচয় পাওয়ায় যায় নিজস্ব সংস্কৃতির। যেখানে আমাদের বিশ্বাস আর ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটেছে সে সবই উঠে আসছে 'কোক স্টুডিও বাংলা'র পরিবেশনায়। বেশিরভাগ গানই পুরোনো, রি-অ্যারেঞ্জ করা। তবে কিছু মৌলিক গানও আছে। শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো মৌলিক গানগুলোই আমরা বাছাই করেছি। শ্রোতার সঙ্গে হৃদয়ের যে সংযোগ তা ধরে রাখতেই দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি। এভাবেই মাঝেমধ্যে কোথাও ডুব দেব। আবার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসব তাঁদের জন্য নতুন কিছু নিয়ে। আমি এমনই, তাই এভাবেই দেখা দেব বারবার।''
গান :তোমার জন্য
গীতিকার :সাহানা
সুরকার :অর্ণব
তোমার জন্য নীলচে তারার একটুখানি আলো
ভোরের রং রাতে মিশে কালো ...
কাঠ গোলাপের সাদার মায়া মিশিয়ে দিয়ে ভাবি
আবছা নীল তোমার লাগে ভালো।

আমার প্রথম অ্যালবাম 'চাই না ভাবিস'-এর কাজ যখন শুরু হয়, তখন সাহানা [সাহানা বাজপেয়ি] বেশ কিছু গান লিখেছিল। তাই দ্বিতীয় অ্যালবাম 'হোক কলরব'-এর জন্য হাতে কাগজ-কলম তুলে নিতে দেরি করিনি। তবে দিন-তারিখ নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন 'তোমার জন্য' গানটি ঠিক কবে লিখেছিল সাহানা। আমরা যাঁরা সুর বাঁধি, গান লিখি, সংগীতায়োজন নিয়ে মেতে থাকি, তাঁদের কমন একটা কাজ থাকে কথা-সুর নিয়ে কাটাছেঁড়া করা। সুর শেষ করার পরও মনে হয়, কোথায় যেন বাকি থেকে গেল। আবার নতুন করে শুরু হয়, সুর ও সংগীতের সংযোজন-বিয়োজন। অনেক সময় গীতিকথায়ও পরিবর্তন আনতে হয়। যে কারণে কোনো কোনো গানে একাধিক গীতিকারের নাম দেখা যায়। যেখানে গান নিয়ে কাটাছেঁড়া করার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু সাহানার 'তোমার জন্য' গানের কথা নিয়ে সেভাবে কোনো কাটাছেঁড়া করতে হয়নি। এর কথাগুলো শুনলেই বোঝা যায়, অনুভূতিকে নানা রঙে রাঙানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অনুভূতি প্রকাশে লাল-নীল-সাদা-কালোর এমন মিশ্রণ শুধু ছবি আঁকার ক্ষেত্রেই দেখা যায়। কিন্তু সুরের সঙ্গে যে অনুভূতি আর রং এমনভাবে মিশে যেতে পারে, তা সাহানার লেখা পড়েই উপলব্ধি হয়েছিল। তাই গানের কথা পড়ার পর সুর করতেও খুব একটা সময় নিইনি। সংগীতায়োজন করার সময় এই গানে নিজে এসরাজ বাজিয়েছিলাম। একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছিল গানের কাজ। 'হোক কলরব' অ্যালবামের এই গানটি অনেকের ভালো লাগবে, মনে হয়েছিল। কিন্তু প্রতিটি শোতে এই গান গাইতেই হবে- এটা বুঝতে পারিনি।

গান :চিলতে রোদে
গীতিকার :সারণ দত্ত
সুরকার :অর্ণব
চিলতে রোদে পাখনা ডোবায় মুচকি হাসে শহরতলি;
রোজ সকালে পড়ছে মনে এই কথাটা ক্যামনে বলি।
বালিশ চাদর এপাশ ওপাশ একটুখানি গড়িয়ে নেওয়া,
আলতো রোদে দুঃখটাকে খানিক সুখের প্রলেপ দেওয়া।

বাংলা ব্যান্ডের বাইরে আর কোনো অ্যালবামে তখনও গাইনি। তাই প্রথম একক অ্যালবামের আয়োজন নিয়েও অনেক ভাবতে হয়েছে। ব্যান্ডে যে ধরনের গান গেয়েছি, একক অ্যালবাম যেন তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়, তা নিয়ে ছিল যত পরিকল্পনা। তখনই হাতে পাই বড় বোনের কাছে লেখা শান্তিনিকেতনের এক বন্ধুর চিঠি। যেখানে লেখা ছিল- 'বালিশ চাদর গড়িয়ে নেয়া' আর 'এমনই আধো ঘুমে কাউকে ভীষণ রকমের মনে পড়া'- লাইনগুলো। এরপর এই কথা নিয়েই গান তৈরি করা যায় কিনা ভাবতে থাকি। ঘুমপাড়ানি গানের আমেজে এর সুর তৈরি করে ফেলি। সংগীতায়োজনে প্রাধান্য দিই আরবানি মিউজিক। সারণের লেখা কথাগুলোই মূলত মাথায় নতুন ধরনের গান তৈরি পরিকল্পনা গেঁথে দিয়েছিল। লিরিক যখন মনের মতো হবে, তখন সুর নিয়ে বেশি ভাবতে হয় না। 'চিলতে রোদে' গানটি তার প্রমাণ। এই গানটি আমার প্রথম অ্যালবামে 'চাই না ভাবিস'-এ রাখা হয়। এটি প্রকাশ পায় ২০০৫ সালে। কিন্তু এই গানটি আরও একবার নতুন করে রেকর্ড করতে হবে, তা সত্যি জানা ছিল না। কিছুদিন আগে হঠাৎ করেই 'কোক স্টুডিও বাংলা'র জন্য গানটি ফিউশন করেছি। যেখানে শিল্পী বগার কণ্ঠে [রিপন কুমার সরকার] 'ও কি একবার আসিয়া' কালজয়ী গানের মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। বাদ্যযন্ত্রের পরিমিত ব্যবহার আর শিল্পীদের কোরাস, হামিং সবকিছু মিলে দুই গান যেন দারুণভাবে এক সুতায় গাঁথা হয়ে গেছে। শ্রোতারাও দুই গানের এই ফিউশন ভালো লাগার কথা জানিয়েছেন।