মনিকা বেল্লুচ্চি। ইতালিয়ান আন্তর্জাতিক সিনে-অভিনেত্রী ও মডেল। 'ইরিভার্সিবল', 'দ্য প্যাশন অব দ্য ক্রাইস্ট' ও 'মালেনা'র মতো রয়েছে তার অসংখ্য সিনেমা। মনিকার বিভিন্ন সাক্ষাৎকার থেকে অনুপ্রেরণার গল্প বের করে এনেছেন জসিম উদ্দিন আকাশ
অল্প বয়সে খুব লাজুক ছিলাম। সুন্দরী হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে লজ্জাও ধীরে ধীরে কমতে থাকে আমার। কেননা, অন্যদের প্রতি আমি আকৃষ্ট হওয়ার বদলে, অন্যরাই আমার চারপাশে ভিড়তে থাকে। বলছি না, বয়সের সঙ্গে শারীরিক সৌন্দর্যও বেড়েছে আমার; বরং বলছি, আমি ভালো অনুভব করছি। যদিও সমস্যা এখনও অভিন্নই রয়ে গেছে, তবু জীবনে এমন একটা সময় নিশ্চিতভাবেই আসে, যখন তারুণ্যের সৌন্দর্য অতীত হয়ে যায়।
সৌন্দর্যের বিচারে নয় মেধার বিচারে
জানি, সৌন্দর্য নিশ্চিতভাবেই কৌতূহলের উদ্রেক ঘটায়। কিন্তু আইরিশ নাট্যকার অস্কার ওয়াইল্ড যেমনটা বলেছেন, আপনার মধ্যে যদি অন্য কিছু করার ক্ষমতা না থাকে, তাহলে শুধু সৌন্দর্য দিয়ে মাত্র পাঁচ মিনিটই সেই কৌতূহল টিকিয়ে রাখতে পারবেন। শুধু সুন্দরী বলেই ক্যারিয়ারে এত কাজ করতে পেরেছি- এমনটা মনে করি না আমি। ফিল্মমেকাররা অভিনয়শিল্পীকে কেবল তার সৌন্দর্যের বিচারে কাজে নেন না, বরং নেন মেধার বিচারে।
মুখোশের আড়াল থেকে
অভিনয়ে আমি এসেছি ফ্যাশন জগৎ থেকে। এ এক দ্বিগুণ ঝামেলা; অভিনয়শিল্পীর ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে ফ্যাশন আর সৌন্দর্য সবচেয়ে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে। কেননা, সবাই ধরে নেয়, আমি যেহেতু সুন্দরী, অতএব নির্বোধও! তবে শারীরিক সৌন্দর্য একটি মুখোশের মতো; সেই মুখোশটা আপনাকে ছিঁড়ে ফেলে দেখাতে হবে- এর পেছনের আসল সৌন্দর্য। আপনি কী- সেটা আপনাকেই দেখাতে হবে, যেন অন্যরাও আবিস্কার করতে পারে।
ঝুঁকিপূর্ণ কাজের প্রস্তাব
অন্যদের কাছে না পারলেও নিজের কাছে নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছি আমি। কেউ যখন আমার কাছে নতুন কোনো আইডিয়া কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ কোনো কাজের প্রস্তাব নিয়ে আসে, সেটির প্রতি যথাযথ আগ্রহ জন্মালে কাজটাতে নেমে পড়ি আমি। যে সিনেমা নানামুখি আলোচনার জন্ম দিতে সক্ষম, সেই সিনেমার প্রতিই আগ্রহ আমার। নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে সিনেমায় এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিকে ফুটিয়ে তুলি আমি। উদাহরণস্বরূপ 'ইরিভার্সিবল', 'দ্য প্যাশন অব দ্য ক্রাইস্ট' ও 'মালেনা' সিনেমার নাম নেওয়া যেতে পারে। মনুষ্যত্বের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকটি ফুটিয়ে তুলতে ভালো লাগে। আর এ জন্যই আমি অভিনেত্রী।
প্রয়োজন সময়ের ব্যবধান
নিজের অভিনীত কোনো সিনেমাই সাধারণত একবারের বেশি দেখি না। যদিও দেখি, সেক্ষেত্রে মাঝখানে অনেক বছর বিরতি দিয়ে। যেমন, বহুদিন পর আবারও 'মালেনা' সিনেমাটি দেখে আমার বেশ মজাই লেগেছে! এই যে কোনো একটা সিনেমা দ্বিতীয়বার দেখার আগে মাঝখানে এতটা সময় নেওয়া- এর কারণ, সিনেমাটিকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করার জন্য সময়ের এই ব্যবধানটি প্রয়োজন পড়ে আমার। কেননা, নিজেকে নিজেই দেখতে একদমই ভালো লাগে না!
শরীরই আপনার ইনস্ট্রুমেন্ট
আমি মনে করি, আমার শরীর আমার কাজেরই একটি উপাদান। এ কারণে একজন অভিনয়শিল্পীকে সবচেয়ে সহিংস চাকরিটিই করতে হয়। আপনি যদি পিয়ানিস্ট হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার একটা পিয়ানো থাকবে; আপনি গিটারিস্ট হলে আপনার থাকবে গিটার। কিন্তু আপনি নৃত্যশিল্পী কিংবা অভিনয়শিল্পী হলে, সে ক্ষেত্রে নিজের শরীরই আপনার ইনস্ট্রুমেন্ট। আমি নিশ্চিত, একজন নৃত্যশিল্পী যখন গ্রিনরুমে ফিরে যান, তখন তার পায়ের পাতা রক্তাক্ত হয়ে থাকে। কিন্তু নাচার সময় তারা সেই রক্তপাতকে অনুভব করতে পারেন না। এটি শারীরিক বেদনার চেয়েও বেশি কিছু। আমার ধারণা, অভিনয়শিল্পীরাও নিজের শরীরকে নিয়ে এ কাজটিই করেন। তারা ভুলে যান 'আমার-আমি'কে। তারা এমন সব চরিত্রে এমন অভিনয়ে মগ্ন হয়ে যান- সেগুলো হয়তো বাস্তব জীবনে তাদের বিব্রত কিংবা লজ্জিত করতে পারত।
জীবনের জন্য স্বাধীনতা
আমি আর ভিনসেন্ট ক্যাসেল, মানে আমার স্বামী দু'জন দুই পৃথিবীর মানুষ। ওর বন্ধুদের যেমন আমি চিনি না, সেও চেনা না আমার বন্ধুদের। আমাদের জীবন এক রকম নয়। আমি যখন 'আমার' পৃথিবী থেকে সরে আসি, আর সেও যখন 'তার' পৃথিবী থেকে আসে সরে- তখনই শুধু দেখা হয় দু'জনের! কিন্তু আমরা একেবারেই দুটি আলাদা প্রাণী! আমি ভীষণ স্বাধীনচেতা, সেও স্বাধীনচেতা। আর আমি মনে করি, জীবনের জন্য স্বাধীনতা খুব প্রয়োজন। আর শুধু এটিই আমাদের টিকিয়ে রাখে!