"মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও,
মানুষই ফাঁদ পাতছে, তুমি পাখির মতো পাশে দাঁড়াও,
মানুষ বড় একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।
তোমাকে সেই সকাল থেকে তোমার মতো মনে পড়ছে,
সন্ধে হলে মনে পড়ছে, রাতের বেলা মনে পড়ছে।''
উজান থেকে নেমে আসা পানি এবং টানা ভারি বর্ষণে সিলেট, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থান তলিয়ে গেছে। মানুষ গৃহহারা ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। বানের জলে ভাসছে পশুপাখি, মানুষের স্বপ্টম্ন। কোথায় পাবে খাদ্য, কোথায় পাবে মাথাগোঁজার ঠাঁই- সেই আর্তনাদই যেন ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। বানভাসিদের এই হাহাকারে বসে থাকেননি কেউ। যে যেভাবে পারেন এগিয়ে গেছেন তাদের পাশে। সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে সবাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বানভাসিদের এই আর্তনাদ সুহৃদদেরও করেছে ব্যথিত ও মর্মাহত। বরাবরের মতো সুহৃদরা সেই অসহায় মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদে মরিয়া হয়ে ওঠেন। শুরু হয় বানভাসি মানুষের পাশে কীভাবে দাঁড়ানো যায় তা নিয়ে নানা চিন্তাভাবনা। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ আসে সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেনের কাছ থেকে। পাশাপাশি ফিচার সম্পাদক মাহবুব আজীজের দিকনির্দেশনায় ঢাকা কেন্দ্রীয় নতুন আহ্বায়ক কমিটির জরুরি মিটিং ডাকা হয়। সবাই ভার্চুয়াল মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেন। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফান্ড সংগ্রহের জন্য সবাই নিজ থেকেই এগিয়ে আসার আগ্রহ দেখান। ফিচার সম্পাদক সুহৃদদের সরাসরি দিকনির্দেশনা দেন এবং তাদের কাজকে গতিশীল করতে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখেন।
পরে দ্রুত সময়ে ফান্ড সংগ্রহ করে তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সুহৃদরা প্রস্তুতি নিতে থাকেন। বিভাগীয় সম্পাদক মো. আসাদুজ্জামান, আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম, সদস্য সচিব ফরিদুল ইসলাম নির্জন ভার্চুয়াল মিটিংয়ে বসেন। কীভাবে, কোথায় কেনাকাটা করা যায় তার খসড়া করেন তাঁরা। পরে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আল আমীন, শাওন, তাইম, ফাহাদ চলে যান কারওয়ান বাজার। সেখান থেকে সব কেনাকাটা করে সমকাল দপ্তরে আসেন। শুরু হয় প্যাকেটিংয়ের কাজ। গভীর রাত পর্যন্ত চলে প্যাকেটিংয়ের কাজ। পরের দিন সকালে বাকি কাজ শেষ করতে আরও যুক্ত হন সদস্য জান্নাতুল বাকী। এভাবে ত্রাণ পাঠিয়ে দেওয়া হয় কুরিয়ার সার্ভিসে।
মালপত্র পৌঁছানোর আগেই চারজনের একটি টিম গিয়ে সুনামগঞ্জ উপস্থিত হয়। পানি নামা শুরু করলেও থেমে নেই মানুষের আর্তনাদ। সবাই শিশুর মতো অসহায়। কেউ যেন ভালো নেই। সবাই একটু ত্রাণের আশায় পথ চেয়ে বসে আছেন। সুনামগঞ্জ সমকাল প্রতিনিধি পংকজ কান্তি দে, সুনামগঞ্জ সুহৃদ সমাবেশের সভাপতি মাহবুবুল হাসান শাহীনসহ সুহৃদরা মিলে রওনা হই। ট্রলারে করে চলতে থাকেন তাঁরা। চারদিক অথৈ পানি। দূর থেকে মনে হয় কোনো পাখির বাসা। নৌকা দেখলেই শিশু থেকে শুরু করে সবশ্রেণির মানুষ হাতের ইশারায় আমাদের ডাকতে থাকেন। সাহায্যের জন্য বারবার আকুতি জানান। আমরাও তাদের ইশারায় সাড়া দেই। হাতে তুলে দেই খাদ্যসামগ্রীর প্যাকেট। কেউ নৌকা দেখলে সাঁতরে কাছে চলে আসার আগেই সুহৃদরা হাতের ইশারায় থামিয়ে দেন, নৌকা নিয়ে চলে যান তাদের কাছে। এসব দেখে সুহৃদরাও চোখের জল ধরে রাখতে পারেন না।
ত্রাণ বিতরণের মাঝেই নামতে থাকে রিমঝিম বৃষ্টি। খোলা আকাশের নিচে সুহৃদরা ভিজতে থাকেন। সুহৃদের আনন্দ একটাই- খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিতে পারা। বৃষ্টির মধ্যেও আমরা দূর-দূরান্তের বাড়িতে খাবার পৌঁছে দিচ্ছি। হঠাৎ দেখি এক শিশু হাত দিয়ে ইশারা করছে। আমাদের ডাকছে। আমরা তার কাছে যাই। তার চোখে-মুখে বিষাদের ছাপ। খাবার হাতে তুলে দিতেই মুখে তার হাসির ঝিলিক। একরাশ আনন্দ। জোরে আওয়াজ করে বলছে, 'আই সুহৃদদের ত্রাণ পাইছি।'
গৃহহীন মানুষ সুহৃদদের কাছে সাহায্য পেয়ে যখন মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় তখন এক অন্যরকম ভালোলাগার সৃষ্টি হয়। সুহৃদদের মাধ্যমে তিন শতাধিক পরিবারের জন্য ১৫ দিনের খাবারের প্যাকেট, শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ করা হয়।
এই ত্রাণ বিতরণে সবসময় সহযোগিতা করেছেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মেহেরুন রুমা, মাহবুবুল হাসান রানা, বাহাউদ্দিন ইমরান, রাসেল আহেমদসহ সব সদস্য। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে কাজটি সঠিকভাবে শেষ করা গেছে।
বিভাগীয় সম্পাদক, সমকাল সুহৃদ সমাবেশ