আকাশে মেঘ জমলে রাতুলের মন ভালো হয়ে যায়। উন্মাদের মতো সে যখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি গায়ে মেখে ঘরের বাহির হয়, মা তখন গর্জে উঠে বলেন, 'এই ঝড় বাদলের দিনে কোথায় যাস?' রাতুল মায়ের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে উঠান পেরিয়ে বাড়ির সদর দরজায় পা দিতেই মা আবার বললেন, 'যাবি যখন ছাতাটা নিয়ে যা। ভিজিসনে।' মায়ের আবদারকে অগ্রাহ্য করে রাতুল মৃদু বৃষ্টিতে ভিজে চলে এলো খানবাড়ির সামনে। খানবাড়ির সামনে যে বিশাল বটগাছটি, তার তলে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। অকারণে নয়, একটা কারণ তো আছেই। খানবাড়িতে একটা মেয়ে থাকে। নাম ফারিয়া, যাকে ভীষণ ভালো লাগে রাতুলের। যার রূপের চোরাবালিতে বারবার তলিয়ে যায় সে। সেই খানবাড়ির মেয়ে ফারিয়া যখন বৃষ্টি এলে তাদের দোতলা বাড়ির বারান্দায় আসে বৃষ্টি দেখতে, রাতুল তখন খানবাড়ির সামনের বটতলা থেকে ফারিয়াকে দু'চোখ ভরে দেখে। কী সুন্দর মায়াভরা মুখ। সেই মায়াভরা মুখ দেখার জন্য রাতুল বৃষ্টি এলে এখানে ছুটে আসে। বৃষ্টি থেকে রেহাই পেতে বটগাছ তলে আশ্রয় নিয়েছে- এই মিছে অজুহাত দেখিয়ে ছাতাওয়ালা পথচারীদের সন্দেহজনক দৃষ্টিকে স্বাভাবিক করে দেয়। 'এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন বাবু?' পথচারীদের এসব প্রশ্নের জবাব রাতুলের একটাই, 'বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে!' অথচ সত্যিকারের ঘটনা ভিন্ন। শুধু দোতলার ওই বারান্দার ফারিয়াকে একটু দেখার জন্য রাতুলের এসব যত অজুহাত।
তারপর গ্রাম কাঁপিয়ে বৃষ্টি নামে। খানবাড়ি ভিজে যায়। দোতলার বারান্দায় ফারিয়া ছুটে আসে বৃষ্টিবিলাস করতে। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ছুঁয়ে যায় জলকণা। হাসতে থাকে খিলখিলিয়ে। বটতলা থেকে সেসব দৃশ্য দু'চোখ ভরে দেখে রাতুল। বারান্দা থেকে কাঁঠালগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ফারিয়া রাতুলকে একটু একটু দেখতে পেয়ে ভাবে বৃষ্টি থেকে রেহাই পেতে ওই যুবক আশ্রয় নিয়েছে বটতলায়। অথচ বাস্তব ঘটনা অন্য। ফারিয়ার বোঝার সাধ্য নেই যে এই যুবকের ওই আশ্রয় হচ্ছে ছলনামাত্র। তার জন্য কেউ একজন এই পড়ন্ত বৃষ্টিতে বাড়ির সামনের বটতলায় এক অপেক্ষার প্রহর গুণে, সেটা আর জানা হয়ে ওঠে না ফারিয়ার।
যথারীতি আজও বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাতুল ফারিয়াকে দেখতে খানবাড়ির সামনে এসেছে। কিন্তু খানবাড়িতে আজ উৎসবের ঢল। আলোকসজ্জায় পুরো বাড়ি সজ্জিত। মানুষের আসা-যাওয়া চলছে খানবাড়িতে। বটতলায় কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর একজনের মুখে শুনল আজ ফারিয়ার বিয়ে। শহর থেকে বরপক্ষরা এসে তাকে নিয়ে যাবে।
রাতুল টের পাচ্ছে তার বুকে শূন্যতা অনুভব হচ্ছে। কীসের এক অজানা বিষাদে বুকের ভেতরটা খাঁ-খাঁ করছে। ঠিক তখনই বৃষ্টির গতি বেড়ে গেল। রাতুলের চোখ ভিজে যাচ্ছে। ভেজা চোখে সে বটতলা থেকে খানবাড়ির দোতলার বারান্দার দিকে তাকায়। আজ বারান্দায় ফারিয়াকে দেখা যাচ্ছে না। সে কোথায়! বান্ধবীরা তাকে বউ সাজাচ্ছে নাকি! নাকি বালিশে মুখ লুকিয়ে নিরিবিলি অঘোরে কাঁদছে! বিয়ের দিনে কান্নাকাটি মেয়েদের এক আদিম রীতি।
বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাড়ি ফিরে যায় রাতুল। এবার থেকে তাকে আর এখানে আসতে হবে না। বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ার অজুহাতে এই বটতলায় ছুটে আসার সব আয়োজন আজ থেকে শেষ হয়ে গেছে।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

বিষয় : কদম ফুল

মন্তব্য করুন