'অভিনয় জগতে আমার পদচারণা কতদিনের, কয়টি নাটক, সিনেমা, টেলিছবিতে অভিনয় করেছি- তার হিসাব-নিকাশ করতে বসিনি কখনও। অভিনয় দিয়ে দর্শক মনে ছাপ ফেলতে পেরেছি কিনা- তা নিয়েই ভাবি। এতদিন যে কাজগুলো করেছি, তার মধ্য দিয়ে অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছি কি? নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপনে অনেকে হয়তো দেখছেন, কিন্তু দর্শকের কাছে সেটাই কি পরিচিতির ভিত গড়ে দিয়েছে? এসব প্রশ্নই মনে বারবার সামনে উঠে আসে। বুঝতে পারি, অভিনয়ের মধ্য দিয়ে আমাকে আরও অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। কেননা, ভালোবাসা থেকে অভিনয় নেশায় পরিণত হয়েছে। অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সাহসও দেখিয়েছি; তাই পেছন ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। এ পথেই চলতে হবে অবিরাম।'
অভিনয় জগতে পথচলা নিয়ে এই কথাগুলোই এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন মনোজ প্রামাণিক। তাঁর এই কথা থেকে এটা স্পষ্ট যে, অভিনয়ের তৃষ্ণা তাঁকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। তাই 'মন বলছে যাব যাব', 'স্যারের মেয়ে', 'নিষিদ্ধ বাসর', 'ফুল ফোটানোর খেলা', 'কথা ছিল', 'টুইন রিটার্নস', 'ভাইরাল গার্ল', 'কিছু বিস্মরণের নদী', 'ভালো মানুষ হতে চাই', 'লাবনী', 'দ্য ডার্ক সাউন্ড অব ঢাকা', 'পতঙ্গ শিকারী ফুল', 'প্রেমপুরাণ', 'মনের টান', 'তুমি কোন গগনের তারা' নাটক-টেলিছবির পাশাপাশি 'বালুঘড়ি', 'শনিবার বিকেল', 'অপারেশন সুন্দরবন', 'মন মন্দির', 'মানুষের বাগান', 'মিশন এক্সট্রিম', 'ভালোবাসা প্রীতিলতা', 'সাহসিকা' ছবিগুলোয় অভিনয়ের পরও তাঁর অভিনয়ের তৃষ্ণা এতটুকু কমেনি। তাই নিবেদিতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন অনবরত। আসছে ঈদেও বেশ কিছু একক নাটক ও টেলিছবিতে দেখা যাবে মনোজকে। এতে বোঝা যায়, অভিনয়ের নেশা মনোজকে দারুণভাবে আসক্ত করেছে। কিন্তু মনোজ কি একের পর এক নাটক, সিনেমায় পরিতৃপ্তি খুঁজে পেয়েছেন? এ প্রশ্নের উত্তরে মনোজ বলেন, 'অভিনয়ে আনন্দ খুঁজে পেয়েছি, এটা অস্বীকার করছি না। কিন্তু যত কাজই করি না কেন, এখনও নিজেকে নবীনদের সারিতেই রাখতে চাই, যারা প্রতিনিয়ত কাজের মধ্য দিয়ে শিখে যাচ্ছে। এখন আলোড়ন তোলার মতো কিছু করে দেখাতে পারিনি।' মনোজের এই কথায় অনেকেই অবাক হতে পারেন। কেননা, শিল্পমনা পরিবারে যাঁর বেড়ে ওঠা, থিয়েটার অ্যান্ড পারফর্মিং আর্ট বিষয়ে যাঁর পড়াশোনা, অমিতাভ রেজা চৌধুরীর সহকারী হয়ে ক্যামেরার পেছনে কাজ করা এবং এক দশক ধরে অভিনয় জগতে যাঁর পথচলা- তাঁর মুখে এমন কথা শুনলে যে কেউই অবাক হবেন। কিন্তু মনোজ বাস্তবেই মনে করেন, অভিনয় জগতে এখনও তাঁর সেরা কাজটি দেওয়া হয়ে ওঠেনি। এখন প্রশ্ন হলো, নিজেকে শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার বিষয়ে তাঁর ভাবনা কী? এর উত্তরে মনোজ বলেন, 'প্রথম কথা হলো, কাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে পরিণত করে তোলা। শেখার কোনো শেষ নেই, তাই যখনই যতটুকু সুযোগ পাওয়া যায়, কিছু না কিছু শিখে নেওয়ার চেষ্টা করা। যেজন্য কোনো কাজের বিষয়ে আমি প্রথমেই গুরুত্ব দিই নির্মাতার বিষয়টি। গল্প ও চরিত্র যেমনই হোক, একজন গুণী নির্মাতাই পারেন অনবদ্য উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে তা দর্শকের কাছে বাস্তব করে তুলতে। নির্মাতার ভাবনা ও নির্মাণ যদি শৈল্পিক না হয়, তাহলে অনবদ্য রচনা কিংবা বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক, নাট্যকারদের সৃষ্টিও ফিকে হয়ে যায়।' তাহলে কি নিজেকে পরিচালক-নির্ভর অভিনেতা মনে করেন? এর উত্তরে মনোজ বলেন, 'পরিচালক-নির্ভর অভিনেতা হলেও চেষ্টা করি গল্প বিস্তার অনুযায়ী চরিত্রকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে। তবে এ বিষয়ে পরিচালকের পরামর্শ ও সহযোগিতা পেলেই অভিনয়ে নিজেকে ভেঙে নতুন রূপে তুলে ধরার সাহস দেখাই। তারপরও একটা বিষয় মাথায় রাখতে হয়, যে কাজটি করছি তা নিয়ে নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি। কারণ যে কোনো সৃষ্টির বিষয়ে নির্মাতাদের নিজস্ব একটা দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। নাটক, সিনেমা, টেলিছবি, ওয়েব সিরিজ- যেটাই হোক না কেন, গল্প ও চরিত্র উপস্থাপনে স্বকীয়তা ধরা রাখতে চান তাঁরা। বড় মাপের শিল্পী বা অভিনেতা-অভিনেত্রীরা সহজেই বুঝে নিতে পারেন, তাঁর কাছে নির্মাতাদের প্রত্যাশা কী? যে কারণে অভিনয়ে নিজেকে ভেঙে সহজেই ভিন্ন সব চরিত্রের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেন। আমিও তাই অগ্রজদের পথ অনুসরণ করে নির্মাতার প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করে যাচ্ছি।' এ তো গেল অভিনয়ের কথা। এখন প্রশ্ন হলো, নির্মাতা হওয়ার ইচ্ছা যার পথচলা শুরু হয়েছিল, সেই মনোজ হঠাৎ করেই কেন অভিনয়কে এত প্রাধান্য দিচ্ছেন? এ প্রশ্নে মনোজ হেসে বলেন, 'আমাদের অনেকেরই এমন হয়, যে একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাত্রা শুরু করলেও পথ বদলে ভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছে যাই। আমার বেলাতেও সেটাই হয়েছে।' তাহলে কি নির্মাতা হিসেবে আপনাকে কখনও দেখা যাবে না? 'আপাতত এ নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। অভিনয় আর শিক্ষকতা নিয়ে আছি এবং থাকতে চাই। ভবিষ্যৎ কী, কাজ করতে গিয়ে কখনও কোন গন্তব্যে পৌঁছাব- তা এখনই বলতে পারছি না।'