সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করলে পুরান ঢাকার সুহৃদরা বন্যাদুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ এবং ধর্মপাশার সুহৃদরা খাদ্যসামগ্রী এবং সাত দিনব্যাপী মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করে

পুরান ঢাকা
জাহাঙ্গীর আলম
হঠাৎ করে পানি এমন ভয়াবহ হয়ে উঠবে কেউ কল্পনাও করেনি। ফলে খাবারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে অনেকের পক্ষে ঘর থেকে বের হওয়া সম্ভব হয়নি। আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটতে হয়েছে সব ফেলে। কারও ঘরের চাল পর্যন্ত পানি, কেউ আটকা পড়েছিল বাড়ির দোতলায়। সিলেট ও সুনামগঞ্জে এমন পরিস্থিতিতে আমরা উদ্যোগ নিই বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। এতে যুক্ত হয় ইস্ট বেঙ্গল ইনস্টিটিউশনের ৯৫ ব্যাচের বন্ধুরা। আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে দেশ-বিদেশ থেকে আসতে থাকে সাহায্যের অর্থ।

২৭ তারিখ আমরা সিলেটে পৌঁছে যাই। সিলেটে কর্মরত সুহৃদ ইন্সপেক্টর শামসুজ্জামানের ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় লিটন লস্কর ও মোহাম্মদ হাফিজ, রফিকুল ইসলাম ও শফিককে সঙ্গে নিয়ে গোলাপগঞ্জে আমরা ২০০ প্যাকেট খাদ্যসামগ্রী প্যাকেট করে ফেলি। ২৯ তারিখ সকালে ট্রাকে করে ঘাটে নিয়ে যাই। ঘাট থেকে ট্রলারে করে মেহেরপুর গ্রামে পৌঁছায় আমাদের খাদ্যসামগ্রী। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে এক ট্রলার থেকে অন্য ট্রলারে হস্তান্তর করে আবার যাত্রা শুরু। হাকালুকি হাওরের ১১নং কালীগঞ্জ ইউনিয়নের কালীকৃষ্ণপুর, নুরজাহানপুর ও ইসলামপুর গ্রামে পৌঁছাতেই মানুষ এগিয়ে আসেন। সুহৃদরা অসহায় পানিবন্দি এসব মানুষের ঘরে ঘরে খাদ্যসামগ্রীর প্যাকেট পৌঁছে দেন। ত্রাণ নিতে এসে রেখা জানান, আজকে তিন দিন ধরে ঘরে কিছু নেই। বাইরে যেতে পারি না। আপনারা এত ভেতরে এসেছেন মনটা শান্তি পেল। তাঁর মতো অনেকেই তাঁদের অসহায়ত্বের কথা সুহৃদদের কাছে তুলে ধরেন।

খাদ্যসামগ্রীর প্যাকেটে ছিল- চাল, আলু, ডাল, পেঁয়াজ, তেল ও শুকনো খাবার। এ ছাড়া শাড়ি ও লুঙ্গি। কার্যক্রম সফল করতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন যেসব সুহৃদ তাঁরা হলেন- পলাশ খান, শুভ দাস, নুরুল আমিন, তপু, রয়েল, শাহ আলম, নাসির, চয়ন, রাজিব সিংহ রায়, মিতা, খালেদ, তাজুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলম, বিশ্বজিৎ, ইয়াসিন, অমিত, হাবিব, আনু, মাসুম, মামুনসহ অনেকেই।

ধর্মপাশা
এনামুল হক
মলয়শ্রী সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম। হঠাৎ নদনদী ও হাওরের পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়ে এ গ্রামের ৫০ ঘরের মধ্যে অন্তত ৪০টি বসতঘরে পানি উঠে যায়। ফলে ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়। শুরু হয় নানা দুর্ভোগ। সাম্প্রতিক বন্যায় এ গ্রামসহ প্রতিটি হাওরাঞ্চলের প্রতিটি গ্রামের মানুষ ভয়াবহ দুর্ভোগে পড়েন। ২৭ মে সকাল ১১টায় এ গ্রাম থেকেই ধর্মপাশা সমকাল সুহৃদ সমাবেশের পক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরে একে একে এ গ্রামের প্রতিটি পরিবারকেই দেওয়া হয় খাদ্য সহায়তা।

সুহৃদরা সদর ইউনিয়নের দেওলা, মধুপুর, জানিয়ারচর, কুড়েরপাড় গ্রামে ত্রাণ বিতরণ করেন। সব মিলিয়ে ১০০ পরিবারের মাঝে খাদ্য সহায়তা দেয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের উপজেলা শাখার সভাপতি সুভাস চন্দ্র সরকার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক গোলাম জিলানী, ধর্মপাশা প্রেস ক্লাবের সভাপতি তরিকুল ইসলাম পলাশ, সাংবাদিক সাজিদুল হক, সাদ্দাম হোসেন প্রমুখ।

দেওলা গ্রামের মোতালেব মিয়া বলেন, 'কে কী দিল সেটা বড় কথা নয়। মানবিক মানুষেরা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন সেটাই অনেক বড় কথা।' জয়শ্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সঞ্জয় রায় চৌধুরী বলেন, 'দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমকাল সুহৃদ সমাবেশকে সাধুবাদ জানাই।'

সমকাল সুহৃদ সমাবেশের ধর্মপাশা শাখার সভাপতি সুভাস চন্দ্র সরকার বলেন, 'সমকাল সুহৃদ সমাবেশের পক্ষ থেকে আমাদের মানবিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সবাই একসঙ্গে চেষ্টা করলে যে কোনো বিপর্যয় মোকাবিলা করা সম্ভব। এ কাজে যাঁরা আমাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছেন তাঁদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।' ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনতাসির হাসান বলেন, 'সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তা দুর্গত মানুষের উপকারে এসেছে। সমকাল সুহৃদ সমাবেশের মানবিক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকুক।'

সাত দিনব্যাপী মেডিকেল ক্যাম্প
ক্রমশ কমছে বন্যার পানি। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নানা দুর্ভোগ। বন্যাকবলিত হাওরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে এক অবর্ণনীয় সংকটের সৃষ্টি করেছে। এ সংকট খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের পাশাপাশি চিকিৎসারও। এই সময়ে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে পানিবাহিত রোগে। এ সংকটময় মুহূর্তে যেখানে দু'বেলা খেয়ে বেঁচে থাকাই দায় সেখানে এসব রোগের চিকিৎসা বন্যার্তদের কাছে অনেকটাই যেন বিলাসিতার মতো। অসুস্থ হলেও রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা এখানে কম।

এরই মধ্যে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও মধ্যনগরে ডায়রিয়ায় তিনজনের মৃত্যু (হাসপাতালে পৌঁছার আগে) ও কয়েক শতাধিক ব্যক্তি ডায়রিয়া আক্রান্ত হওয়ার খবর সমকাল সুহৃদ সমাবেশের সুহৃদদের ব্যথিত করে। ফলে পানিবাহিত রোগ যাতে মহামারি আকার ধারণ করতে না পারে সেজন্য মধ্যনগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সমকাল সুহৃদের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয় ৭ দিনব্যাপী (২৮ জুন-৪ জুলাই) বিনামূল্যে ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল ক্যাম্পের। মানবিক এ কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় জল জনপদ নারী ও শিক্ষা উন্নয়ন সংস্থা (জনাশিউস) বাংলাদেশ।

২৮ জুন ১২টার দিকে বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের উদ্বোধন করেন জনাশিউসের নির্বাহী পরিচালক সাজেদা আহমেদ। এ উপলক্ষে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় ধর্মপাশা সুহৃদের সভাপতি সুভাস চন্দ্র সরকারের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রাসেল আহমদ। মেডিকেল ক্যাম্পের স্বেচ্ছাসেবক সমন্বয়কারী নিউটন সরকারের পরিচালনায় প্রধান আলোচক হিসেবে স্বাস্থ্যবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মুক্তাদির হোসেন।

এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাওয়ার জন্য ৭ দিনের জন্য একটি ট্রলার ভাড়া করা হয়, যার মাধ্যমে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রামে চিকিৎসাসেবা দেন ডা. মুক্তাদির হোসেন, ডা. মিজানুর রহমান রনি, ডা. সৌরভ ঘোষ, ডা. শরিফুল ইসলাম, ডা. মো. মাজহারুল হক, ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন ও ডা. কাজল রায়। পরে একে একে বিভিন্ন গ্রামে ১২শর বেশি মানুষকে ফ্রি চিকিৎসা ও তাঁদের মাঝে বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করা হয়।

জনাশিউসর নির্বাহী পরিচালক সাজেদা আহমদ বলেন, 'এই মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনার সময় আমি প্রতিদিন সঙ্গে থেকে খুব কাছ থেকে অসহায় মানুষের আকুতি শুনেছি। সমকাল সুহৃদের এই আয়োজনের ফলে অনেক অসহায় রোগী ফ্রি চিকিৎসা পেয়েছে।'

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনতাসির হাসান বলেন, 'বন্যা-পরবর্তী সময়ে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন এবং গ্রামে গ্রামে গিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত প্রশংসনীয়।'