আকাশের বুকে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে নিভে আসে, নেমে আসে রাত। একে একে আলোকবিন্দু ফুটে ওঠে আকাশে। বিন্দুগুলো এক-একটা নক্ষত্র, সাধারণ মানুষ এগুলোকে 'তারা' নামেই ডেকে থাকে। আমাদের সূর্য যেমন নক্ষত্র, বিন্দুগুলোও ঠিক তেমন।

বৃক্ষচারী থেকে গুহাবাসী মানুষ স্থানান্তর হওয়ার পথে তারাগুলো অনুসরণ করত। রাতের বিভিন্ন সময়ে তারাদের অবস্থান পরিবর্তন, তাদের দৃষ্টি এড়ায়নি। আমরা দেখি, এই তারাদের নিয়ে তৈরি করে নানান গল্প-উপকথার। গল্পের তারা বা তারাগুলো একেক জন শক্তিমান দেব-দেবতা। সে সময়কার মানুষের বিশ্বাস, এই শক্তিমানরাই জীবনের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে।

মিসরে বর্ষার আগমনে, নিল নদে উপচে পড়ে জলের ধারা। উপচে পড়া জল বছরব্যাপী কৃষিকাজের ভরসা হয়ে ওঠে। সে সময়টাতে আকাশে অবস্থান করত, লুব্ধক নামের তারাটি।

লুব্ধক আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হওয়ার ফলে সবারই নজর তার দিকে। মানুষের ভাবনায় জায়গা করে নেয় লুব্ধক। লুব্ধক হয়ে ওঠেন এক শক্তিমান দেবতা!

প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনিগুলোতে অন্য আরও সব নক্ষত্রের এমন সব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার নানরকম নিদর্শন আমরা দেখতে পাই। সময়ের চাকায় ভাবনাগুলো বদলায়। বদলে চলে। বদলাতে হয়।

সে সময়টাতে মানুষ তার সাধারণ চোখে দেখতে পায়, রাতের আকাশের তারাগুলো পূর্ব দিগন্তে উদয় হয়ে পশ্চিম দিগন্তের নিচে চলে যায়। একইভাবে রাত শেষে পূর্ব দিগন্তে উদয় হয়ে পশ্চিমে অস্ত যায় সূর্য দেব। মানুষ ভাবতে শুরু করে, এই পৃথিবী হচ্ছে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে। যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় সূর্যসহ আকাশের সব তারা।

কোপার্নিকাস

মানুষের ইতিহাস বদলে দেওয়া এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম নিকোলাস কোপার্নিকাস। পোলিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাসের লেখা বইটির নাম 'দ্য রেভেলিউসনিবাস অরবিয়াম কোয়েলেস্তিয়াম'। কোপার্নিকাস আমাদের জানান দেন, সূর্য নয় বরং পৃথিবীই সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। সে সময়ের মানুষ বিষয়টা তেমন বুঝতে পারেনি।
কোপার্নিকাসের মৃত্যুর পাঁচ বছর পরে জন্ম নেন ব্রুনো। ইতালিয়ান দার্শনিক এবং বিশ্ব তত্ত্ববিদ জিয়োদার্নো ব্রুনো বিশ্বের দরবারে উচ্চকণ্ঠে প্রচার করেন কোপার্নিকাসের সৌরকেন্দ্র্রিক মতামত। প্রচলিত বিশ্বভাবনার বিপরীতে কোপার্নিকাসের ভাবনা মেনে নিতে পারেনি সে সময়কার মানুষ। বিশেষ করে চার্চের প্রচারিত বিশ্বভাবনার বিপরীত হওয়ার কারণে চার্চ ব্রুনোকে বিচারের মুখোমুখি করে এবং আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলে। একে একে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে নাম লেখান জোহান্স কেপলার, টাইকো ব্রাহেসহ অনেকে।

পৃথিবীর প্রথম টেলিস্কোপ

১৬০৮ সালে শিশুসুলভ ঘটনাচক্রে প্রযুক্তির এক নতুন জগতের দ্বার উন্মোচন হয়। হল্যান্ডের এক চশমার দোকানদার ছিলেন লিপারসে। এক বিকেলে লিপারসে খেয়াল করলেন, তাঁর দোকানের আশেপাশে খেলতে আসা শিশুরা কোনো একটা বিষয় নিয়ে খুব উত্তেজনাপূর্ণ আনন্দে উচ্চকিত!

দেখা গেল, চশমার বিভিন্ন লেন্সের একটাকে সামনে রেখে অপর একটি লেন্স তার পেছনে নিয়ে দূরের দিকে তাকিয়ে আছে। এতে করে দূরের প্রায় দেখতে না পাওয়া বস্তুটি অনেকটাই দৃষ্টিসীমায় এসে পড়ছে!

বাহ্‌! দারুণ বিষয়!

লিপারসে বিষয়টি বুঝতে পেরে একটি সরু পাইপের সামনে একটি লেন্স এবং পেছনে অপর একটি লেন্স স্থাপন করে তৈরি করে ফেলেন পৃথিবীর প্রথম টেলিস্কোপ।

তখন কিন্তু এর নাম টেলিস্কোপ ছিল না। নাম দেওয়া হলো স্পাইয়িং গ্লাস।

সে সময় হল্যান্ডের সাথে ইংরেজদের যুদ্ধ চলছিল। সেখানে প্রথমবারের মতো ইংরেজ বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হয় এই স্পাইয়িং গ্লাস। গ্লাসটি ক্রমেই ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

ঘটনাচক্রে ইতালিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলাই পেয়ে যান একটি স্পাইয়িং গ্লাস। শত্রুর গোপন গতিবিধির পরিবর্তে গ্লাসটি তাক করেন আকাশে চলে বেড়ানো বস্তুদের প্রতি। জ্যোতির্বিজ্ঞানে টেলিস্কোপের প্রথম ব্যবহারের শুরু।

বৃহস্পতি গ্রহের চারদিকে ঘুরে বেড়ানো চারটি উপগ্রহ, চাঁদের গিরিখাত, কৃত্তিকা নক্ষত্রপুঞ্জের নক্ষত্র, শনির বলয়- এগুলোই দেখা দেয় গ্যালিলিওর টেলিস্কোপে। গ্যালিলিওর এই পর্যবেক্ষণকে সে সময়কার চার্চ মেনে নিতে পারেনি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠত্ব দাবির বিপরীতের আবিস্কার মেনে না নিয়ে গ্যালিলিওকেও বিচারের মুখোমুখি করা হয়। টেলিস্কোপকে বলা হয় শয়তানের যন্ত্র; যা তাঁদের প্রচলিত ধর্মবোধের বিপরীতে ভাবায়। গ্যালিলিওকে দীর্ঘ কারাবাস বরণ করে নিতে হয়।

আকাশের বুকে চলমান নক্ষত্রগুলো দেখার জন্য গ্যালিলিও টেলিস্কোপের ব্যবহারে খুলে যায় জ্ঞানের এক নতুন জগৎ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের জগৎ। ভাগ্য নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় নক্ষত্রদের আর দেখা যায় না। শুরু হয় জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের পৃথক পথচলা।

টেলিস্কোপ আকাশ পর্যবেক্ষণের এক নতুন যুগের সূচনা করে। সে সময়টাতে অবতল লেন্সের ব্যবহার করে টেলিস্কোপ তৈরি করা হতো। পরে কেপলার উত্তল লেন্স ব্যবহার করে এই প্রতিসরণ টেলিস্কোপটির উন্নতি ঘটান। এতে আকাশের নক্ষত্রদের ছবি আরও পরিস্কারভাবে দেখা দেয়।

নিউটোনিয়ান টেলিস্কোপ

বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক অমর নাম স্যার আইজ্যাক নিউটন। লেন্সের পরিবর্তে অবতল এবং সমতল আয়না ব্যবহার করে নিউটন নতুন ধরনের টেলিস্কোপ তৈরি করেন। এতে আলো আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে দর্শকের চোখে দেখা দেয়।

সহজ ব্যবহারের উপযোগী হওয়াতে নিউটোনিয়ান টেলিস্কোপটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধরনের টেলিস্কোপের আবিস্কার হয়। টেলিস্কোপে আয়না যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি তার স্ট্যান্ডটিও পরিবর্তন হতে থাকে। ইকোয়েটোরিয়াল মাউন্ট, আল্ট্রাজিমুথ মাউন্ট, ডোবসোনিয়ান মাউন্ট ব্যাপক ব্যবহূত হয়ে আসছে।

বেতার টেলিস্কোপ

এতদিন আমরা শুধু অপটিক্যাল টেলিস্কোপ দিয়েই আকাশের রহস্য সন্ধানে ছিলাম। অপটিক্যাল টেলিস্কোপের সাথে চলে এলো বেতার টেলিস্কোপ। নক্ষত্র থেকে নির্গত বা বিকিরিত বেতার তরঙ্গ যা আমরা দেখতে পাই না, সেগুলো গ্রহণ করে যন্ত্রের মাধ্যমে তথ্যে রূপান্তরিত হয়ে আমাদের হাতে আসা শুরু হলো।

পৃথিবীর বিখ্যাত বেতার মানমন্দির হচ্ছে অ্যাঙ্গলো-অস্ট্রেলিয়ান অবজারভেটরি। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পুনায় খোদাদাদ গ্রামে রয়েছে অপর একটি পৃথিবীর বিখ্যাত বেতার মানমন্দির। খোদাদাদ গ্রামের মানমন্দিরটি ২৫ স্কয়ার কিলোমিটার জায়গাজুড়ে অবস্থিত।

নতুন আলোর হাতছানি

মানুষ জেনে গেছে তার দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতা। দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ৪০০ থেকে ৭০০ ন্যানোমিটার। নক্ষত্রদের থেকে বিকিরিত সমস্ত তরঙ্গ দৈর্ঘ্য মানুষ দেখতে পায় না। আর তাই নক্ষত্রদের থেকে বিকিরিত বেতার তরঙ্গ, ইনফ্রারেড তরঙ্গ, গামা তরঙ্গ বা অতিবেগুনি তরঙ্গ এত সব দেখার উপায় উদ্ভাবন করতে হয়।

আকাশ দেখতে গিয়ে একটা বিষয় মানুষকে ভাবায়! পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঘুরে বেড়ানো ধূলিকণা, বৈদ্যুতিক চুম্বকীয় তরঙ্গ, মেঘমালা, জলীয় বাষ্প আর ঘরবাড়ির আলো বাধা হয়ে দাঁড়ায় নিরবচ্ছিন্ন আকাশ পর্যবেক্ষণে। উপায়? টেলিস্কোপটি আমাদের বায়ুমণ্ডলের বাইরে স্থাপন করতে পারলে কেমন হয়? ততদিনে আকাশ জয় করেছে স্পুটনিক। একের পর এক মহাকাশে ছুটে চলেছে মনুষ্যবাহী নভোযান স্যুইজ, অ্যাপোলো, বুরান, চেলেঞ্জার, আটলান্টিস, কলাম্বিয়াসহ অনেক।

সেই ভাবনা থেকেই আকাশে প্রথম স্থাপন করা হয় অরবিটিং অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরি সংক্ষেপে OAO-2। সময়টা ১৯৬৮ সাল। সৌরজগতের গ্রহগুলো দেখার জন্য আর সৌরজগতের দূর দিগন্তে দেখতে পাঠানো হলো পাইওনিয়ার, ভয়েজার, পাথ ফাইন্ডার।

হাবল স্পেস টেলিস্কোপ

হাবলের পাঠানো তরঙ্গগুলো যন্ত্রের মাধ্যমে পরিবর্তিত করে আমরা পাই দূর গ্যালাক্সিগুলোর সুন্দর সুন্দর ছবি। আকাশের যেসব প্রান্ত আমাদের কাছে এক গভীর অন্ধকারের অজনা জগৎ ছিল, হাবল সেখানে দেখিয়ে দিল রংবেরঙের ছায়াপথ, নীহারিকার সব ছবি।

ক্রমেই মানুষের আকাঙ্ক্ষা এগিয়ে চলে। হাবল স্পেস টেলিস্কোপে তার তৃপ্ত হওয়ার নয়। মহাকাশে পাঠানো হয় চন্দ্র এক্স-রশ্মি মানমন্দির। বর্তমানে জেমস ওয়েভ টেলিস্কোপে ধারণকৃত ছবি আমাদের ভাবনা, বিশ্বাসের জগতে আলোড়ন তুলেছে।

এভাবেই মানুষের ভাবনা এগিয়ে যায়। এগিয়ে যায় মানুষের সভ্যতার চাকা। দূর থেকে আরও দূরে এ যাত্রা, কখনও থামার নয়।

বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান

বাংলাদেশের মানুষেরও রয়েছে আকাশের প্রতি এক অদম্য আকর্ষণ। সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ অথবা ধূমকেতুর আগমনে প্রচুর আগ্রহী মানুষের সারা মেলে। ব্যতিক্রম একটি দেশ আমার, যেখানে প্রবল আগ্রহ এবং প্রয়োজন থাকার পরেও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়টি কোনো স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর এই না থাকার প্রয়োজনেই আমাদের উদ্যোগ নিতে হয় বিকল্প ভাবনার। গড়ে উঠে জ্যোতির্বিজ্ঞান-বিষয়ক নানান ধরনের বিজ্ঞান ক্লাব।

বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার অগ্রদূত অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের লেখা জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক বইগুলো দিয়েই বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার শুরু। যদিও দেশ বিভাগের আগে আমরা রাধাগোবিন্দ চন্দ্র্রকে পাই। কিন্তু রাধাগোবিন্দ চন্দ্রের ব্যবহার করা তথ্য এবং টেলিস্কোপ বর্তমানে সংরক্ষিত আছে। তাঁর সম্পর্কে আমরা এখন বিস্তারিত জানতে পারছি।

জাতীয় পর্যায়ে সংগঠন হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর, ডিসকাশন প্রজেক্ট, বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতিসহ একাধিক বিজ্ঞান ক্লাব।

আশার কথা, বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে বর্তমানে ঢাকার বাইরে চারটি বিভাগীয় শহরে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার এবং ফরিদপুরে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম মানমন্দির।