ষাটের দশকের শুরুতে জন্ম আমার। মফস্বলে বাস করি। ঢাকা থেকে ভৈরবে ট্রেনে করে সংবাদপত্র বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে বিকেল হয়ে যেত। ঢাউস সাইজের রেডিওতে বিবিসি, আকাশবাণী কলকাতা, ভোয়া এবং রেডিও পাকিস্তান থেকে বিনোদন আর জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা চলত। তখনকার দিনে এ ক'টিই ছিল পৃথিবী তথা মহাবিশ্বকে জানার জানালা। এখনকার মতো এত কানেকটিভিটি চিন্তার চৌহদ্দিতেও আসেনি। এত দূরেই বা যাই কেন, আশির দশকের কথা। মেডিকেলে পড়ি। ছাত্র হোস্টেলে থাকি। চুটিয়ে কবিতা আর প্রেম হচ্ছে।

প্রেমিকার জন্মদিন। আমি চিটাগং, সে ঢাকায় গেছে বাবার বাড়িতে। এমন একটা দিনে দেখা না হোক কিন্তু কথা না বলে কি পারা যায়! চৌঠা জানুয়ারির সাতসকাল। ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই ট্রাঙ্ক-কল বুক করে রাখলাম ঢাকায় ওর বাসায়। সে সময় টেলিফোন এক্সচেঞ্জে অফিসে শহরের বাইরে কল করতে চাইলে আগেভাগে বুক করে রাখতে হতো। তারপর টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিস যখন লাইন ফাঁকা পেত তখনই সংযোগ দিত। এ প্রক্রিয়ায় কল বুক করে সারাক্ষণ টেলিফোন সেটের আশেপাশে ঘুরঘুর করতে হতো- কখন টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিস থেকে ফিরতি কল আসে, স্যার ঢাকায় কথা বলেন। হ্যাঁ, আমিও লাইন পেয়েছিলাম। তবে সেদিন নয়, পরদিন সকালে। আর তিনি রাতভর জেগেছিলেন একটি কলের আশায়।

'৬৯-এর কথা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপোলো ১১ মিশনের মহাকাশচারী নীল আর্মস্ট্রং চাঁদের মাটিতে পা রাখা প্রথম মানুষ। পৃথিবীজুড়ে সে কী হুল্লোড়! বাড়ির উঠানে টেবিলের ওপর সাদাকালো টিভি রাখা। গোটা উঠানে পাড়ার মানুষ ভেঙে পড়েছে- চাঁদে মানুষ হাঁটছে, এ দৃশ্য দেখার জন্য। অত ভিড়ে টিভির কোনো শব্দই শোনা যাচ্ছিল না। টিভির পাশে দাঁড়িয়ে আব্বা ইংরেজি ধারাবর্ণনা বাংলায় তর্জমা করে উপস্থিত জনতাকে শুনিয়ে যাচ্ছেন। একটা সময় মানুষের চন্দ্রাভিযানের দৃশ্য দেখানো বন্ধ হলো। সবার মধ্যে চন্দ্রবিজয় নিয়ে নানা কথা, নানা কৌতূহল, নানা সন্দেহ বিনিময় হতে শুরু করল। আমাদের বাড়ির এক বুয়া, মঞ্জুর মা। বাবলার কাঁটা চোখে বিঁধে তাঁর এক চোখ চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে- এ কথা পাড়ার সবার জানা। মাটির ঠিলা কাঁখে তুলে নিতে নিতে সে বলল-

'একটা চোখ নষ্ট বইল্যা তো আমি অক্কড়ে আন্ধা হইয়া যাই নাই। আরেক চোখে তো এখনও দেখি। চান্দে মানুষ হাঁটলে তো ঠিকই দেখতাম। কই, কাউরে তো হাঁটতে দেখলাম না!'
রোজ সকালে মাওলানা সাহেব আমাকে আর আমার বড় দুই বোনকে কোরআন পড়াতে আসেন। তিনি ব্যাপারটি আবার অন্যভাবে ব্যাখ্যা করলেন। তিনি বললেন-
এগুলো শ'তানের কাম। শ'তান (শয়তান) একটা ভুয়া চান বানাই হিতির মধ্যে রকেট নামাই দিছে। আসল চান্দে ন'। আর এত বছর পরও কেউ কেউ মানুষের সেই চন্দ্রাভিযান নিয়ে অনেক সন্দেহ, সংশয় প্রকাশ করে যাচ্ছেন।

সে সময় একটা আশঙ্কা নেমেছিল যে, কবিরা এখন কী করবেন? তাঁদের এত পছন্দের যে চাঁদ, যে চাঁদের আভায় হিল্লোলিত কবিচিত্ত, চাঁদ ও চন্দ্রিমা নিয়ে শিল্পীমনের ভাবনার যে লাগামহীন দৌড়, তার কী হবে? কী দশা দাঁড়াবে গাগনিক সংকেতের? কী হবে ...

না, কবিরা মোটেও থামেননি, এমনকি দমেও যাননি। বিজ্ঞান মানুষকে চাঁদে পৌঁছে দিয়েছে ঠিকই কিন্তু কবি কিংবা শিল্পীর চিত্তকে চুলমাত্র বিচ্যুত করতে পারেননি। কবিমন দূরগামী; ফলে মানুষ চন্দ্র বিজয় করুক আর জেমস ওয়েভ স্পেস টেলিস্কোপে ১৩৫০ কোটি বছর আগেকার অর্থাৎ পৃথিবী সৃষ্টির পরপরই মহাবিশ্বে যা ঘটেছিল তার দালিলিক প্রমাণ টেবিলে এনে রাখুক। এতে শিল্পভাবনায় কোনো মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে না বরং চিন্তার ব্যাপ্তি ঘটাতে সাহায্য করবে। কবি তথা শিল্পীমন ভাবনার পাখা মেলে উড়ে বেড়াবে নিরন্তর নিজস্ব আকাশে।

মহাবিশ্ব সৃষ্টি নিয়েও এন্তার তত্ত্ব পৃথিবীতে চলমান। এর মধ্যে 'বিগব্যাং তত্ত্ব'টি বহুল সমর্থিত। এ তত্ত্ব অনুসারে মহাবিশ্বের সৃষ্টি একটি ক্ষুদ্র পরমাণুর চেয়ে ক্ষুদ্রতর প্রোটন কণা থেকে। এখানে যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা হলো বিন্দুও নয়, অণুও নয়; এমনকি পরমাণুও নয়, তারও চেয়ে ছোট প্রোটন। এ ক্ষুদ্র্র পয়েন্টটিতেই এনার্জিঘটিত কারণে ঘটল ব্যাপক বিস্টেম্ফারণ এবং এর পরিণতিতেই বিস্তার। এ বিস্তার শুধু সে ক্ষণটাতেই থেমে থাকেনি- এ বিস্তার ক্রমপ্রসরমাণ। ফলে এটা চলছে তো চলছেই। এ চলার শেষ কোথায় কে জানে? এই তত্ত্ব অনুযায়ী ইউনিভার্স ধারণাটি বুঝি পাল্টেই গেল। এখন বলা হচ্ছে মাল্টিভার্স; ফলে মহাবিশ্বের সীমানা কোথায়, কত দূর? একটি পরমাণুর মধ্যে লুক্কায়িত একটি প্রোটন কণা- তার চেয়েও ক্ষুদ্র উৎসবিন্দুটি একের পর এক ছায়াপথ সৃষ্টি করে যাচ্ছে আর আমরা অপার বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছি আমাদের পুরোনো আকাশে। কীসব আশ্চর্য ঘটনা যে নিত্য ঘটে যাচ্ছে আকাশগঙ্গায়! কত কী!

কী যে অসীম বিস্ময় নিয়ে কবি তাকান তাঁর ভেতর-বাইরে, কত যে আকুতি নিয়ে চিত্রকর রং ঝরান ক্যানভাসে, কত যে আবেগ নিয়ে শিল্পী কণ্ঠ সাধেন, সুরের বাঁধনে- সেও তো এক অনুসন্ধিৎসা, একই অনুসন্ধিৎসার ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। আমি আমার লেখার গোড়ার দিকেই কানেকটিভিটি অর্থাৎ সংযোগের গুরুত্ব নিয়ে কিছু কথা বলতে শুরু করেছিলাম। কানেকটিভিটি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এখানে তার একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছি। যখন আমি এ লেখাটি লেখার জন্য টেবিলে বসেছি- এরই মধ্যে জানতে পারলাম আরেকটি নতুন সংবাদ। মানুষের হূৎপিণ্ড চলার সময় যে রকম ধুকপুকানি শব্দ হয়, ঠিক এ রকমই একটা সংকেত মহাকাশের কোথাও থেকে ভেসে আসছে। চার ঘণ্টা আগে সংকেতটি ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি শনাক্ত করল আর আমি বাংলাদেশে বসে তথ্যপ্রমাণসহ সে শব্দ এবং ওটার রৈখি বিশ্নেষণ চাক্ষুষ করলাম। বিজ্ঞানের ছাত্র আমি। অঙ্ক ও পদার্থবিজ্ঞান পড়তে খুব আনন্দ পেতাম। তবে অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ফিজিক্স আমি পড়িনি। এ দেশে আমাদের সময় এ বিষয়টিও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হতো না। তারপরও কেন জানি না মহাকাশ গবেষণা নিয়ে আমার আগ্রহ বরাবরই একটু বেশি। আর কবিতা লিখি বলেই হয়তো এসব অপার্থিব বিষয়ের প্রতি একধরনের টান অনুভব করি। এতে লাভ না হোক, ক্ষতি কী! আর কে না জানে ভাবনার পুলওভার গায়ে চড়ালে সব কবিই নভোচারী। ভ্রমণের এ আনন্দকে পরমানন্দে উন্নীত করা আরও বেশি সম্ভব হয় যদি এর সঙ্গে সংযোগ ঘটানো যায় নাক্ষত্রিক দ্যোতনার।
চোখ বন্ধ করে একটু ভাবলেই বোঝা যাবে মহাবিশ্ব সৃষ্টি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সব সৃজনশীলতা এক অপূর্ব মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। বিগ ব্যাং তত্ত্বকে স্থির ধরে যদি আমরা সামনে এগোই, মহাবিশ্ব তৈরি হচ্ছে (তৈরি হচ্ছে বললাম এ কারণেই যে বিগ ব্যাং তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্বের কলেবর প্রতিনিয়তই কেবল বাড়ছে, থামার কোনো লক্ষণই নেই) একটি প্রোটন কণার চেয়েও ছোট একটি সূচনা বিন্দু থেকে। এবং শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটতে থাকে চিন্তার অদেখা এক সূচনা স্তরে। অতিক্ষুদ্র্র একটা ঝিলিক, তারপর সেটাকে ক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে কবি একে অনিবার্য শব্দ ও লাগসই ছন্দে প্রয়োগে কবিতায় রূপান্তরিত করেন, চিত্রকর ক্যানভাসে রংতুলির সমন্বয়ে আঁকেন ছবি, গল্পকার কথার মাধ্যমে, সুরকার গীতকে আবৃত করেন সুরের বাঁধনে। মহাবিশ্ব যেমন অপার; প্রতিটি কালোত্তীর্ণ শিল্পই তেমনি সীমানাহীন, মুগ্ধকর। দিকচিহ্নহীন উপত্যকার দাঁড়িয়ে হোমার যা বলে গেছেন, রবিঠাকুর, জীবনানন্দও এরাও তা-ই বলে গেছেন; কেবল ভিন্ন সুরে অভিন্ন ব্যঞ্জনায়।

আমরা যদি সমীকরণটিকে এভাবে নিষ্পত্তি করতে থাকি তবে একসময় দেখতে পাব শিল্প, দর্শন, বিজ্ঞান সবকিছুর উৎসবিন্দুটি একই সমতলে, একই সমান্তরালে অবস্থিত। আর উন্নত চিন্তা যেহেতু বরাবরই দুর্লভ, তাই এসব চিন্তার প্রকাশ এবং এর সম্যক অর্থ বরাবরই সাধারণের নাগালের বাইরেই থেকে যায়। শিল্পরস কিংবা শিল্পের অন্তর্নিহিত বাণীর প্রচার তাই হয়তো অনেকাংশে শ্নথ। খ্রিষ্ট্রের জন্মের আগে সক্রেটিসকে বিচারিক আদালতের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বিচারে সেই আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করল। অথচ গত বছর আরও এক বড় আদালত তাঁকে বেকসুর খালাস ঘোষণা করে রায় প্রদান করল। ফলে দেখা যাচ্ছে, সময় সাধারণের ধারণা এবং বিচারবোধকে প্রভাবান্বিত করে থাকে। অর্থাৎ কাল যেটিকে আমরা সত্য বলে মেনে নিয়েছিলাম আগামী পরশু হয়তোবা আবার ভিন্ন কথা বলব।

এই যে সময় শব্দটি উচ্চারণ করলাম, এই সময়ের ধারণাটিও কিন্তু উৎপত্তি লাভ করেছিল সৌরমণ্ডলের নক্ষত্রের আবর্তনে পুনরাবর্তনের সঙ্গে সংগতি রেখে। কবি নিরন্তর তাঁর চিন্তার অক্ষপথে দার্শনিক ভাবনার লাটিম ঘুরিয়ে যাচ্ছেন নিমগ্ন ডুবুরির মতো, সত্যের সন্ধানে ব্যাপৃত থাকছেন অহর্নিশি আর একজন অ্যাস্ট্রোফিজিসিষ্ট আলোর রেখাচিত্র ধরে ধরে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন মহাবিশ্বের অতল তল। বেশুমার রহস্যে ঘেরা ছায়াপথগুলো আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে বস্তু আর আলোর দ্বিপাক্ষিক বিষয়াদির কথা। পদার্থবিজ্ঞান আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, কোনো বস্তুকেই আমরা দেখতে পাই না যতক্ষণ না আলো এসে এর গায়ে পড়ে। বস্তুর গায়ে আলো ঠিকরে আমাদের চোখের মধ্যকার আইরিস ভেদ করে রেটিনায় এসে বিম্বিত হয়। এই প্রতিবিম্বটি প্রথম দশায় চোখের রেটিনায় উল্টোভাবে প্রতিফলিত হয় এবং পরে এটি মস্তিস্কের কর্টেক্সের সাহায্যে সোজাভাবে প্রতিফলিত হয়।

ফলে দেখা যাচ্ছে, আলোই বস্তুকে শনাক্ত করার প্রধান নিয়ামক। আর আলো! কোথা থেকে আসে সে আলো! কবিগুরু তাঁর রচনায় বলে গেছেন, আলো আমার আলো ওগো আলোর ভুবন ভরা। হ্যাঁ, ঠিক তাই এই ভুবনভরা আলোর উৎস কোথায়। এককথায় বলতে গেলে সূর্য আমাদের ভুবনের আলোর উৎস তা ঠিক তবে মহাকাশে অযুত নক্ষত্ররাজি। আমাদের সৌরমণ্ডলে যেমন সূর্য, ঠিক তেমনি লক্ষ লক্ষ সূর্যবৎ নক্ষত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে আকাশগঙ্গায় ছায়াপথে। সৃষ্টির শুরুতে অন্তহীন এ মহাবিশ্ব অপার অন্ধকারে ডুবে ছিল দিশাহীন, বেপথু, অনিদ্র নাবিকের মতো। একসময় ছায়াপথের মধ্যিখান থেকে শক্তিধর একটা নক্ষত্র আলোকবর্তিকা হাতে আত্মপ্রকাশ করে। আমাদের পৃথিবী যে ছায়াপথের সদস্য সেখানে সূর্যই হচ্ছে মুখ্য। আমাদের ছায়াপথকে মিল্ক্কিওয়ে বলে ডাকা হয়। এই ছায়াপথে কম করে হলেও ২০০ বিলিয়ন থেকে ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। মহাবিশ্বের যে অংশটুকু আমাদের কাছে দৃশ্যমান শুধু সেই অংশেই ১০০ বিলিয়নেরও বেশি ছায়াপথ রয়েছে।

আমাদের সূর্যের মতো এবং তারও চেয়ে লক্ষগুণ ক্ষমতাধর নক্ষত্রের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে মহাকাশের অন্যান্য ছায়াপথে, যেখানে তারা বিকীর্ণ করে চলেছে আলোর বন্যা। আর সে আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছে মহাবিশ্বে ঘূর্ণমান ছোট-বড় নক্ষত্ররাজি ছায়াপথ তল। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এই যে, ছায়াপথের সব গ্রহই কিন্তু আলো পায় না। সব ভিখারি যেমন সব সময় তিন বেলা খেতে পায় না ঠিক তেমন; অনেক গ্রহই আছে চিরকাল অন্ধকারেই থেকে যায়। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, ওরা জন্ম উদ্বাস্তু, ঠিকানাবিহীন, ওদের কোনো ছায়াপথ নেই। কথাটা যদি অন্যভাবে ঘুরিয়ে বলি, ওরা কোনো ছায়াপথেরই সদস্য নয়। ফলে কোনো ছায়াপথের নক্ষত্রই ওদেরকে আলোকিত করে না। এরা কখনও কোনো সময় মহাবিশ্বে ডুবোচরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

এখন যদি আমি আরেকটা মনোগাণিতিক সমস্যাকে এখানে উপস্থাপন করি তা হলে কেমন হয়? জীবনে একজন ব্যক্তি বহু চড়াই উতরাই পার হয়ে সময়ের চৌকাঠে এসে অনুভব করল তার ফেলে আসা সময়গুলোর কথা। তার চিন্তার আলো প্রকম্পিত হতে থাকল সমুদয় ঘটনা প্রবাহের ওপর। চকমক করে জ্বলে উঠতে লাগল স্মৃতির উদ্বেল ধূলিকণা- তখন সেই নির্জন ব্যক্তিটি একের পর এক টুকে রাখতে শুরু করল সেই সামগ্রিকের খণ্ডবিখণ্ডকে- তার পর্যবেক্ষণের শানিত কৃপাণে ... এবং এভাবেই সৃষ্টি হতে থাকে, ফল ফলতে থাকে, জল ঝরতে থাকে। বহুল প্রচলিত একটি প্রবচন লিখিয়েদের জন্য বারবার বলা হয়ে থাকে, সৃষ্টি একদিনে হয় না- অনেক দেখা আর অভিজ্ঞতার নির্যাসে সৃষ্টি হয় শিল্প। মহাকাশের নক্ষত্ররাজি আবিস্কার করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা জেমস ওয়েভ স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহার করছেন আর সৃষ্টিশীল ব্যক্তি তাঁর ব্যাপ্তির গভীর গহিনে অনুভবের টেলিস্কোপে ক্ষুদ্রতম কষ্ট, আনন্দ এবং উচ্ছ্বাস ফ্রেমবন্দি করে তোলেন সহজাত নৈপুণ্যের মাধ্যমে। দুটোই একই প্রকৃতির- ভিন্নতা যা তা শুধু ইনস্ট্রুমেন্টাল।

আরও একটা বিষয়েও মহাকাশের অদ্ভুত শৃঙ্খলার সঙ্গে শিল্পীমানসের চমৎকার যোগসূত্রতা তুলনীয়। একজন শিল্পী একই সময়ে দুঃখ, আনন্দ এমনকি উল্লম্ম্ফনও তাঁর মহাকাশে অনুভব করে থাকেন। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন এ বোধগুলো তাঁর সৃষ্টিকর্মে একই সঙ্গে জটলা পাকাতে খুব একটা আসে না। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সময়ে তিনি তাই নতুন নতুন বিষয় সৃষ্টি করতে সক্ষম। ঠিক তেমনি বিগ ব্যাং তত্ত্ব অনুযায়ী মহাকাশে সঞ্চরণশীল বস্তুনিচয় অর্থাৎ গ্রহ, উপগ্রহগুলো নিজ নিজ স্থানে অবস্থান করেও নির্দিষ্ট ছায়াপথে নির্দিষ্ট পথরেখায় পথপরিক্রম করে চলতে থাকে। তারা কদাচিৎ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়; এর কারণ হিসেবে বলা হয়, কোয়ান্টাম রিজিওয়নের কথা। মানে মহাকাশ প্রতিনিয়ত বেড়ে যাচ্ছে বটে সেই সঙ্গে স্টম্ফারিত হচ্ছে দুই বা একাধিক নক্ষত্রের মাঝখানের দূরত্ব- এই সমানুপাতিক বর্ধন ব্যবস্থাই এখানে সংঘাতের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করছে; আর শিল্পীমানসে এই ঢালটি হচ্ছে পরিমিতিবোধ।
একটা সময় গেছে যখন শিল্পীরা তাঁদের শিল্পকর্মে আবেগের ওপর জোর দিতেন। তখন কবিতা মানে ছিল স্তুতি কিংবা দেবতার নান্দী। এখন সময় পাল্টেছে। এমনকি আমাদের দেশেই সত্তরের দশকে কবিতায় চন্দ্রবিজেেয়র প্রসঙ্গ এসে গেছে।

ষাটের দশকের কবি আবুল হাসান ক্ষীয়মাণ মানবিকতার প্রতি আঙুল তুলে উচ্চারণ করলেন, 'মানুষ চাঁদে গেল/ ... তবু হানাহানি কমল না।' এ বোধ শুধু একজন কবি আবুল হাসানের নয়, এ বোধ পৃথিবীর কবিকুলের। কবি জীবনানন্দ দাশ শুদ্ধ থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এ জগৎ তাঁর শুদ্ধাচারিতাকে সমর্থন করেনি। তাই বিপর্যস্ত কবি আকাশে, মহাকাশে নক্ষত্রের পথে পরিভ্রমণ করতে চেয়েছেন। পৃথিবীর সামাজিক কাঠামো তাঁকে এ জগৎ এ জীবন সম্বন্ধে যে নেতিবাচক কার্ড প্রদর্শন করেছে তাঁর বিপরীতে এটা ছিল তাঁর নির্জন ও কাব্যিক প্রতিবাদ। নির্বিরোধী দুর্বল চিত্তের এ কবির প্রতিবাদের ভাষা অভিমানের রাগে মহাকাশের ছায়াপথে নক্ষত্রে নক্ষত্রে আজও গুঞ্জরিত। ফলে এখানেও আমরা দেখব একজন সৃষ্টিশীল মানুষ কী করে নিজেকে সমর্পণ করে দেন অজেয়, অজ্ঞেয় মহাকাশপথে। তাই কবির প্রেমিকাও সেখানে সাধারণ রক্তমাংসে গড়া মানুষ নয়। তিনিও আকাশে বিলীন। তাই তার নাম হয় আকাশলীনা। ইংরেজ কবি সিলভিয়া প্লাথের কথা কে না জানে? চরম বিষাদগ্রস্ত নাক্ষত্রিক সিলভিয়া নক্ষত্রের পথে হাঁটবেন বলে গ্যাস ওভেনের অগ্নিশিখায় নিজেকে পোড়ালেন; তিনি নিজে পুড়ে নক্ষত্রগামী হলেন বটে, সেই সঙ্গে আমাদেরকেও নিমজ্জ রেখে গেলেন এক অসহ দহনে।
এভাবে বিশ্নেষণ করলে দেখা যাবে মহাকাশের তাবৎ শূন্যতা বুকে ধরে, মহাকাশের সমগ্র ব্ল্যাকহোল, হোয়াইট হোল, নেবুলাকে পুঁজি করেই শিল্পীসত্তা অনিদ্র্র জেগে থাকে এবং গেয়ে ওঠে, জানার মাঝে অজানারে করেছি সন্ধান, বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।