আমাদের শারীরিক সুস্থতা যেমন দরকার, তেমনি একটি সুন্দর জীবনযাপনে মানসিক স্বাস্থ্যের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মন ছাড়া শরীর কেবলই একটি খোলসমাত্র। জীবন মানে উত্থান-পতন- কখনও হাসি, কখনও বা কান্না। কিন্তু কখনও কখনও জীবনে আসে নানা বাধা। সেসব হয়ে ওঠে দুর্বিষহ মানসিক যন্ত্রণার কারণ, যা একটি গুরুতর সমস্যাও! বর্তমানে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও এগিয়ে চলেছে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধানের রাস্তায়। প্রচার, সচেতনতাসহ নানা কাজে লড়ে যাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান। অনেকে কাজ করছেন ব্যক্তিগতভাবেও। অন্যকে মানসিক অবসাদ থেকে সুস্থ করতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আছে লাখো তরুণ-তরুণীর নামও।

দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা সরকারি প্রতিষ্ঠান 'জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল'। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে তৈরি করা ৮৪ সদস্যের এ ইনস্টিটিউটে প্রাপ্তবয়স্ক মনোরোগবিদ্যা, শিশুরোগ ও উন্নয়ন মনোরোগবিদ্যা, প্রাপ্তবয়স্ক মনোরোগবিদ্যা, রেডিওলজি, অ্যানেস্থেশিওলজি, প্যাথলজি ও সমাজকল্যাণ বিভাগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণও দেয়। ছয়টি বিভাগ নিয়ে কাজ করা এ প্রতিষ্ঠানে করা হয় সব ধরনের মানসিক রোগের চিকিৎসা।

অন্যদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও এই লড়াইয়ে যুক্ত বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সচেষ্টভাবে কাজ করা এক প্রতিষ্ঠান 'কান পেতে রই'। ৯ বছর ধরে মানুষের পাশে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। 'কান পেতে রই' মূলত একটি অলাভজনক সংগঠন, যেটি মানসিক সহায়তার পাশাপাশি আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংগঠন হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। এটি বাংলাদেশের প্রথম মানসিক সহায়তা হেল্প লাইন, যেখানে যে কেউ ফোন করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবকদের কাছ থেকে জরুরি মানসিক সেবা পেতে পারে। এদের হেল্প লাইনের মূল উদ্দেশ্য সমাজের অনেক মানুষের মনে হতাশা, একাকিত্ব, মানসিক চাপ ও আত্মহত্যার প্রবণতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করা; তাদের মানসিক সমর্থন জোগানো। এ লক্ষ্য মাথায় রেখে 'কান পেতে রই' গোপনীয়তা ও সহমর্মিতার সঙ্গে, সম্পূর্ণ খোলা মনে মানুষের কথা শোনে।

বিশ্বের ৪০টি দেশে এই ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা আত্মহত্যা রোধ ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে অনেক অবদান রাখছে। বাংলাদেশে এটি এ ধরনের প্রথম প্রতিষ্ঠান। এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা প্রখ্যাত লেখক, শিক্ষাবিদ ও পদার্থবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবালের কন্যা ইয়েশিম ইকবাল। যিনি ২০০৯ সালে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞান নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করেন এবং ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত হার্ভার্ড ল্যাবে রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর হিসেবে ছিলেন। ইয়েশিম তাঁর গবেষণা পরিচালনার সময় বাংলাদেশে এ ধরনের একটি সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং দেশে এসে গড়ে তোলেন 'কান পেতে রই'।

এমনই আরেকটি প্রতিষ্ঠান 'মনের বন্ধু'। সংগঠনটি ফোন, অনলাইন কিংবা অফলাইনে মানসিক সহায়তা দেয়। দৈনন্দিন চাপে আমরা ভুলে যাই আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা। ফলে যারা মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়, তাদের জন্য জীবনের পথ কঠোর হয়ে ওঠার গল্পে এগিয়ে আসার তাগিদে প্রতিষ্ঠিত এ সংগঠন। মানসিক সেবা প্রদানের পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরি করতেও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে একঝাঁক উদ্যমী তরুণ দ্বারা পরিচালিত এই সংগঠন। তাদের তৈরি অ্যাপ্লিকেশন মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে অনেকাংশেই সহজ করে দিয়েছে। এর ফলে তাদের গ্রাহক বৃদ্ধি পাচ্ছে। লক্ষ্য অনুযায়ী আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে, যেন মানসিক সেবার অধিকার সমানভাবে পেতে পারে সবাই। কেবল তাই নয়, তারা বিভিন্ন থেরাপি ও প্রশিক্ষণও দিয়ে আসছে যাত্রার শুরু থেকে। এ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিষ্ঠাতা ফাইরুজ ফাইজা বিথার পেয়েছেন বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের 'গোলকিপার্স গ্লোবাল গোলস চেঞ্জমেকার অ্যাওয়ার্ড-২০২১'।

বাবাকে হারানোর পর প্রতিটা মুহূর্তে বিথার বুঝতে পেরেছেন একজন মানুষের কঠিন সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। সে সমস্যার সমাধানে জন্ম 'মনের স্কুল'-এর। লক্ষ্যের সঙ্গে মিল রেখে প্রতিনিয়ত শত শত মানুষকে দিয়ে আসছেন মানসিক সহায়তা।

সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে আছে অনেক মনোবিদের উপস্থিতি। এঁদের মধ্যে অন্যতম মনোবিদ ইয়াহিয়া আমিন, যিনি মানসিক স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে দিয়ে আসছেন সেবা। এর মধ্যে ৮০০-এর কাছাকাছি মানুষকে দিয়েছেন মানসিক উদ্যম। সেবার জন্য ইয়াহিয়া আমিন বেছে নিয়েছেন সহজলভ্য মাধ্যম, যেমন- ইউটিউব, স্পটিফাই, ফেসবুক; যেগুলোতে তিনি পডকাস্ট ও ভিডিওর মাধ্যমে পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে চলেছেন। ইতোমধ্যে যা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ ছাড়া নিজের ব্যক্তিগত সাইটে yahiaamin.com) সমানতালে নিয়মিত ব্লগ ও লেখালেখির মাধ্যমেও পরামর্শ দিচ্ছেন।

মানসিকভাবে ভেঙে পড়াদের পাশে দাঁড়াতে সবার এগিয়ে আসার ব্যাপারটিকে কীভাবে দেখছেন? প্রশ্নের জবাবে মনোবিদ নিলয় দেব বলেন, এটি আমাদের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক একটি দিক। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার এখনই সময়। সবাইকে নিজ নিজ স্থান থেকে এ সমস্যা সমাধানে কাজ করতে হবে। বিশেষত অভিভাবকদেরও খেয়াল রাখতে হবে সন্তানের মানসিক দিকে।

মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতায় গ্রামীণ পর্যায়ে কাজ করেন তরুণ কর্মী ইয়াসীর তালেব। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত তরুণদের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতায় ইয়াসীর জানান, 'আগের তুলনায় এখন সহজেই তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে, যার অন্যতম কারণ সামাজিক ইতিবাচক প্রভাব। ইতিবাচকতার প্রভাবে তাদের মনে এক ধরনের শক্তি তৈরি হচ্ছে, যা আগে অনুপস্থিত ছিল।'

'কান পেতে রই', 'মনের বন্ধু', ইয়াহিয়া আমিন ছাড়াও পাশে দাঁড়ানোর এই লড়াইয়ে আছে আরও প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি। যাঁদের সবার লক্ষ্য একটিই- ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক দেশের প্রতিটি মন।