পদ্মা সেতু চালুর পর এখন নতুন রূপে দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মোংলা। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের দূরত্ব ২৬০ কিলোমিটার। অন্যদিকে মোংলার দূরত্ব ১৭০ কিলোমিটার। এ কারণে অনেক আমদানি-রপ্তানিকারকের জন্য এ বন্দর এখন সুবিধাজনক। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় মোংলায় কর্মযজ্ঞ অনেকটাই বেড়েছে। এ বন্দর আরও গতিশীল হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ফেরি পারাপারের বিড়ম্বনা না থাকায় বন্দরটির গুরুত্ব এখন আগের চেয়ে কয়েক গুণ। ইতোমধ্যে এ বন্দরের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা। এ বন্দর দিয়ে গাড়ি আমদানির সংখ্যাও বেড়েছে। খুলনার চিংড়ি ও কাঁচাপাট রপ্তানিকারকদেরও আর আগের মতো ছুটতে হবে না চট্টগ্রাম বন্দরে।

বাড়তি চাপ সামাল দেওয়ার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত ৩-৪ বছরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। ৮টি বড় প্রকল্পের কয়েকটির কাজ শেষের দিকে। বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, পদ্মা সেতু দিয়ে যান চলাচল শুরু হওয়ার পর মোংলা বন্দরের কর্মব্যস্ততা বেড়ে গেছে অনেক। বন্দরের আশপাশে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠার প্রত্যাশাও করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়বে।

যেভাবে গড়ে ওঠে মোংলা :১৯৫০ সালের ১১ ডিসেম্বর ব্রিটিশ বাণিজ্যিক জাহাজ 'দ্য সিটি অব লায়ন' সুন্দরবনের মধ্যে পশুর নদের জয়মনিগোল নামক স্থানে নোঙর করে। এটিই ছিল মোংলা বন্দর প্রতিষ্ঠার শুভ সূচনা। এর পর ১৯৫১ সালের ৭ মার্চ জয়মনিগোল থেকে ১৪ মাইল উজানে 'চালনা' নামক স্থানে এ বন্দর স্থানান্তরিত হয়। এখানে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত এ বন্দরের কার্যক্রম চলে। এর পর বিস্তৃত জরিপের পর বন্দরটি চালনা থেকে সরিয়ে মোংলায় স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়। চালনা থেকে ১০ মাইল ভাটিতে মোংলা নদী এবং পশুর নদের মিলনস্থলের নাম 'মোংলা'। এখানে নদীর নাব্যও ছিল বেশি। সুবিস্টৃতত স্থলভাগ ও বন্দর নির্মাণের জন্য উপযোগী থাকায় মোংলায় বন্দর স্থাপিত হয়। অচেনা ক্ষুদ্র গ্রাম পায় আন্তর্জাতিক পরিচিতি। জনশূন্য এলাকা মুখর হয়ে ওঠে জনকলরবে। ১৯৮৭ সালের মার্চ মাসে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়।

বর্তমান সক্ষমতা :বন্দরে ৫টি জেটি, ৩টি মুরিং বয়া, ২২টি অ্যাঙ্করেজ এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন ১১টি প্রতিষ্ঠানের জেটির মাধ্যমে মোট ৪২টি জাহাজ একসঙ্গে হ্যান্ডল করা সম্ভব। চারটি ট্রানজিট শেড, দুটি ওয়্যার হাউস, চারটি কনটেইনার ইয়ার্ড এবং দুটি কার ইয়ার্ডের মাধ্যমে বার্ষিক এক কোটি টন কার্গো, এক লাখ টিইউজ কনটেইনার এবং ২০ হাজার গাড়ি হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা রয়েছে এ বন্দরের। এর সক্ষমতা বাড়াতে আরও কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান।
রাজধানীর একাধিক ব্যবসায়ী জানান, এর আগে রাজধানী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের আমদানি-রপ্তানিকারকদের মোংলা বন্দরের প্রতি আগ্রহ ছিল কম। কারণ এই জেলাগুলো থেকে মোংলা বন্দরে পণ্য পাঠাতে কিংবা বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে যেতে ছিল ফেরি পারাপার। এর ফলে তাঁদের সময়, ব্যয় ও দুর্ভোগ বাড়ত। সে জন্য তাঁরা পণ্য আমদানি-রপ্তানি করছিলেন চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। এখন পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এ বন্দর ব্যবহারে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এখান থেকে ইতোমধ্যে গার্মেন্টস পণ্য বিদেশে রপ্তানি শুরু হয়েছে।

বর্তমানে এ বন্দর দিয়ে আমদানি হচ্ছে সার, ক্লিংকার, রিকন্ডিশন্ড গাড়ি, মেশিনারিজ, গার্মেন্টসের কাঁচামাল, এলপিজি, কয়লা, পাথর, চাল, খাদ্য, কাঠ, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী প্রভৃতি। রপ্তানি হচ্ছে হিমায়িত খাদ্য, পাট, গার্মেন্টস ও ইপিজেডে উৎপাদিত পণ্য।
১৯৯০-৯১ থেকে ২০০১-০২ অর্থবছর পর্যন্ত বন্দরটি লাভজনক ছিল। ২০০২-০৩ থেকে ২০০৬-০৭ অর্থবছর পর্যন্ত লোকসান হয়। ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে আবার লাভের মুখ দেখে এ বন্দর। সর্বশেষ চার বছর ধরে লাভ হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা যা বলছেন :এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি এবং সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী সমকালকে জানান, পদ্মা সেতু চালুর পর রাজধানী থেকে চট্টগ্রামের তুলনায় মোংলা বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে সময় ও অর্থ ব্যয় কম হচ্ছে। এ কারণে গার্মেন্টস মালিক অনেকেই মোংলা বন্দর দিয়ে রপ্তানি শুরু করেছেন। তিনি নিজেও রপ্তানির ক্ষেত্রে এ বন্দর ব্যবহার করবেন।

বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএ) সভাপতি শেখ সৈয়দ আলী জানান, তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই কাঁচাপাট চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি করে আসছিলেন। কিন্তু ফেরিঘাটে সমস্যার কারণে খুলনা থেকে কাঁচাপাট চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় লেগে যেত। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর তাঁদের পাট চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠাতে হবে না।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) সহসভাপতি হুমায়ূন কবীর সমকালকে জানান, তাঁরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খুলনা থেকে হিমায়িত চিংড়ি চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি করে থাকেন। পদ্মা সেতু চালুর পর মোংলা বন্দরে জাহাজ আগমন বাড়বে। এখন মোংলা বন্দরের মাধ্যমে হিমায়িত চিংড়ি বিদেশে রপ্তানি করা যাবে। বিএফএফইএর পরিচালক মো. রেজাউল হক সমকালকে বলেন, মোংলা বন্দরে কনটেইনারবাহী জাহাজ কম আসায় তাঁদের হিমায়িত চিংড়ি চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠাতে হতো। পদ্মা সেতু চালুর পর মোংলা বন্দরে কনটেইনারবাহী বড় জাহাজের আগমন বেড়েছে। এখন আর তাঁদের চট্টগ্রাম বন্দরে যাওয়ার তেমন প্রয়োজন নেই।

মোংলা বন্দর ব্যবহারকারী সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর মোংলা বন্দর আরও গতিশীল হয়েছে। এখন খুলনা অঞ্চলের আমদানি-রপ্তানিকারকদের আর চট্টগ্রাম বন্দরে যাওয়ার তেমন প্রয়োজন হবে না।

বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি মো. হাবিবুল্লাহ ডন বলেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার ফলে আমদানি করা গাড়ি সাড়ে তিন ঘণ্টায় ঢাকায় আনা যাচ্ছে। সেতু চালু হওয়ায় এ বন্দর দিয়ে গাড়ি আমদানিতে আগ্রহ বেড়েছে। অ্যাসোসিয়েশনের বন্দরবিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান আহসান আরজু বলেন, 'মোংলা বন্দর দিয়ে আমদানি করা গাড়ি আরিচা ফেরি পার হয়ে কমপক্ষে ৭ ঘণ্টা সময় লাগে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় ৩ ঘণ্টা সময় লাগবে। সময় বাঁচার পাশাপাশি গাড়িপ্রতি ১ থেকে ২ হাজার টাকা খরচও কমবে তাঁদের।

কিছু পদক্ষেপ জরুরি :আমদানি-রপ্তানিকারকরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালুর পর মোংলা বন্দরে চাপ বেড়েছে। তা সামাল দেওয়ার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বন্দরের জেটি পর্যন্ত ৯ মিটার ড্রাফটের নাব্য। বর্তমানে জেটিতে আছে ৭ মিটার ড্রাফট। মোংলা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত হোসেন বলেন, বন্দরের জেটি ও পশুর চ্যানেল নিয়মিত ড্রেজিং, নির্মাণাধীন খুলনা-মোংলা রেললাইন দ্রুত চালু এবং ভাঙ্গা থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত সড়কটি ৪ লেনে উন্নীত করা প্রয়োজন।

মোংলা বন্দর বার্থ-শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ জাহিদ হোসেন বলেন, বন্দরের ওপর যে বাড়তি চাপ পড়বে, তা সামাল দিতে নাব্য বাড়াতে হবে। মোংলা পোর্ট পৌরসভার মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবদুর রহমান বলেন, মোংলা বন্দর ব্যবহারকারী, ইপিজেড ও মোংলার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য স্বল্প সময়ের মধ্যে এখানে পাঁচতারা মানের আবাসিক হোটেল নির্মাণ করতে হবে। এ ছাড়া পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ, খানজাহান আলী বিমানবন্দর ও খুলনা-মোংলা রেললাইন দ্রুত চালুর দাবি জানান তিনি।

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, ইতোমধ্যে ক্রেনসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। কয়েকটি প্রকল্পের কাজ চলছে। নতুন করে জেটি তৈরি করা হচ্ছে। ড্রেজিং সম্পন্ন হলে ৯ মিটার গভীরতার জাহাজ বন্দরের জেটি পর্যন্ত আসতে পারবে।