সমকাল :আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে মোংলা বন্দরের ব্যবহার কতটা হচ্ছে?
সৈয়দ নজরুল ইসলাম :আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে মোংলা বন্দর আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দর। এ বন্দর দিয়ে গত ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৪৪ হাজার টিইইউএস কনটেইনার পণ্য পরিবহন হয়েছে। যদিও চট্টগ্রাম বন্দরের তুলনায় এটি অনেক কম। চট্টগ্রাম বন্দরে ২৭ লাখ টিইইউএস কনটেইনার পণ্য পরিবহন হয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর মোংলা বন্দর ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাড়ার ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সমকাল :কবে থেকে পোশাক রপ্তানিকারকরা মোংলা বন্দর ব্যবহার শুরু করেছেন?
সৈয়দ নজরুল ইসলাম :গত ২৮ জুলাই মোংলা বন্দর দিয়ে প্রথমবারের মতো তৈরি পোশাক রপ্তানি শুরু হয়। দিন দিন এ বন্দর দিয়ে রপ্তানির পরিমাণ বাড়ছে। তবে এর পরিমাণ কতটা বাড়বে কিংবা রপ্তানিকারকরা এ বন্দরটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের সুবিধা পাবেন, তা নির্ভর করছে বন্দরের জাহাজীকরণ ব্যবস্থা কতটা ব্যবসা সহায়ক হবে তার ওপর। অর্থাৎ মোংলা বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য বাড়াতে হলে এর অবকাঠামোতে বড় ধরনের উন্নয়ন প্রয়োজন। ওয়্যারহাউজিং সক্ষমতা, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, ব্যাংক-বীমাসহ বিভিন্ন সুবিধা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

সমকাল :পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ বেড়েছে। এর ফলে রপ্তানি বাণিজ্যে বাড়তি কী সুবিধা পাওয়া যাবে?
সৈয়দ নজরুল ইসলাম :পুরোদমে মোংলা বন্দর ব্যবহার করা গেলে রপ্তানি বাণিজ্যে লিড টাইমে সুবিধা পাওয়া যাবে। লিড টাইম হচ্ছে, বিদেশি ব্র্যান্ড এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে রপ্তানি আদেশ পাওয়ার পর থেকে তাঁদের হাতে পণ্য পৌঁছানোর মধ্যকার সময়। এই লিড টাইম কম আসবে। এটা এখনকার রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের দুর্বলতা। চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি মোংলা বন্দর ব্যবহার করা হলে লিড টাইম কমে আসার সুবিধা পাব আমরা। দেখুন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দূরত্বের চেয়ে মোংলা বন্দরের দূরত্ব প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম। পাশাপাশি একটি বন্দরের ওপর অতি নির্ভরশীলতার ঝুঁকিও কমবে।

সমকাল :আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে সক্ষমতার প্রশ্নে বন্দরের ভূমিকা কতখানি?
সৈয়দ নজরুল ইসলাম :আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে বন্দরের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতদিন আমরা শুধু চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই বেশিরভাগ পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতাম। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানিতে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভর করতে হতো। পদ্মা সেতু চালুর মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক অন্যান্য কর্মকাণ্ডে সহায়ক ভূমিকার সঙ্গে মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ আমাদের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের জায়গাটিতে একটি নতুন অধ্যয় যুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড ক্রেতা এবং দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করার আগে ঝুঁকি বিশ্নেষণ করে তার পর বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি মোংলা বন্দর ব্যবহার করার সুযোগ অবশ্যই আমাদের দেশের বাণিজ্য সক্ষমতা অনেকাংশে বাড়াবে।

সমকাল :মোংলা বন্দরের ব্যবহার বাড়লে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কতটা কমবে?
সৈয়দ নজরুল ইসলাম :সক্ষমতার প্রশ্নে চট্টগ্রাম বন্দরের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। প্রায়ই জাহাজজটে আমদানি-রপ্তানি বিঘ্নিত হয়। শুল্ক্কায়ন প্রক্রিয়ায়ও অনেক জটিলতা আছে। এ রকম বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি আমরা। ঠিক একইভাবে মোংলা বন্দরেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে আমরা মনে করি, মোংলা বন্দরের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর কিছুটা হলেও চাপ কমবে। এই চাপ কতটা কমে আসবে তা নির্ভর করছে আগামীতে এই বন্দর দিয়ে কতটা সহজভাবে সেবা পাওয়ার সুবিধা আমরা পাচ্ছি। অর্থাৎ বন্দরটি কতটা ব্যবসা সহায়ক হলো তার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। অবশ্য বন্দর কর্তৃপক্ষের বাইরে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও কিছু ভূমিকা রয়েছে। কর্তৃপক্ষসহ সব পক্ষের সক্রিয় অংশীদারিত্ব থাকলে কার্যকরভাবে মোংলা বন্দর ব্যবহার করা সম্ভব হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর বাড়তি চাপ কমে আসবে।

সমকাল :মোংলার ব্যবহার বাড়াতে আপনাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
সৈয়দ নজরুল ইসলাম :স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে আমরা সার্বিক রপ্তানি ৫০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি। যেখানে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪২ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে পোশাক রপ্তানি বছরে ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা আমরা নিয়েছি। আমাদের রপ্তানি যেমন বাড়ছে, তেমনি আমদানিও বাড়ছে। ফলে চট্টগ্রাম ও মোংলা উভয় বন্দরের ব্যবহার বাড়বে। মোংলা বন্দরের ব্যবহার আরও কীভাবে বাড়ানো যায় সে বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। উদ্যোক্তা অনেকেই মোংলা বন্দরের বিষয়ে বেশ আগ্রহী।

সমকাল :মোংলা বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখন কী ধরনের সমস্যা রয়েছে?
সৈয়দ নজরুল ইসলাম :আমরা এই বন্দরটির ব্যবহার শুরু করেছি মাত্র। আগামীতে যখন বন্দরের ব্যবহার আরও বাড়তে থাকবে, তখন সময়ের সঙ্গে সেখানকার সুযোগ-সুবিধা ও সমস্যা ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের আরও বাস্তব অভিজ্ঞতা হবে। বন্দর সম্পর্কে আমাদের পর্যালোচনা চলমান রয়েছে। তবে এতটুকু খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারি, ওয়্যারহাউজিং সক্ষমতা, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, ব্যাংক, বীমা ইত্যাদি সেবাসহ সামগ্রিকভাবে বন্দরের আধুনিকায়ন করা গেলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে মোংলা বন্দরের সক্ষমতার শতভাগ ব্যবহার সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবু হেনা মুহিব