সমকাল :পদ্মা সেতু চালু হওয়ার ফলে কতটা গতিশীল হয়েছে
মোংলা বন্দর?
লিয়াকত হোসেন লিটন :পদ্মা সেতুর ফলে মোংলা বন্দর এখন ঢাকা থেকে সবচেয়ে নিকটবর্তী বন্দর। বন্দরটি এতদিন আমদানিনির্ভর ছিল। এখন রপ্তানিতেও গতি ফিরছে। নতুন যোগাযোগ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে কয়েকদিন আগেই প্রথমবারের মতো ঢাকার গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানি হয়েছে এই বন্দর দিয়ে। এটি অবশ্যই বন্দরের জন্য এক নতুন মাইলফলক। পদ্মা সেতুর ফলে মোংলা বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি আরও গতিশীল, সহজ ও সম্প্রসারিত হচ্ছে।

সমকাল :ব্যবসায়ীরা এই বন্দর ব্যবহার বাড়িয়েছেন কেন?
লিয়াকত হোসেন লিটন :ঢাকা থেকে এ বন্দরের দূরত্ব ১৭০ কিলোমিটার। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকার দূরত্ব ২৬০ কিলোমিটার। আর পায়রা বন্দর থেকে ২৭০ কিলোমিটার। ফলে আমদানি-রপ্তানিকারকরা খরচ কমাতে ও সময় বাঁচাতে মোংলা বন্দর ব্যবহার করছেন।

সমকাল :পদ্মা সেতুর কারণে মোংলা বন্দর ও বাগেরহাটে আর কী ধরনের পরিবর্তন দেখছেন?
লিয়াকত হোসেন লিটন :বর্তমানে মোংলা বন্দর এলাকায় ছোট-বড় মিলে ৩৮৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। শুধু পদ্মা সেতুর কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখানে জমি কিনেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজ চলমান। এসব কর্মযজ্ঞ শেষ হলে এ অঞ্চলে বেকারত্ব দূর হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে কয়েক লাখ মানুষের। পদ্মা সেতু মাত্র দেড় মাসের মতো হলো চালু হয়েছে। এখনই এ অঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে ধারণা করছি, চিংড়ি, মাছ এবং পাটশিল্পে রপ্তানি ও বিনিয়োগ আগের চেয়ে বেড়েছে।

সমকাল :স্থানীয় চাষিরা কতটা উপকৃত হবেন?
লিয়াকত হোসেন লিটন :মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য আর সিন্ডিকেটের প্রভাবে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে স্থানীয় চাষিরা দীর্ঘদিন বঞ্চিত ছিলেন। কৃষক পর্যায় থেকে খুচরা বাজারে যেতে কৃষিপণ্য কয়েক হাত বদল হতো। এতে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম তিন-চার গুণ বেড়ে যেত। এখন পদ্মা সেতু দিয়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্য, চিংড়ি ও কার্প জাতীয় মাছ সহজেই ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়ে ভালো দামে বিক্রি করছেন অনেকে। এতে একদিকে যেমন চাষিরা লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে পণ্য নষ্ট হওয়ার শঙ্কাও কমেছে।

সমকাল :বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পায়ন বাড়াতে নতুন কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন?
লিয়াকত হোসেন লিটন :মোংলা বন্দরে আটটি প্রকল্পের কাজ চলমান। এই কাজ শেষ হলে বন্দরের আমূল পরিবর্তন ঘটবে। এ ছাড়া বন্দরে ২৪ ঘণ্টা সেবা নিশ্চিতের পাশাপাশি সেবার মান আরও বাড়াতে হবে। বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা বাড়াতে হবে ব্যবসায়ীদের জন্য। লক্ষ্য রাখতে হবে, বন্দরকেন্দ্রিক ব্যয় যেন বেড়ে না যায়। এই বন্দরের খরচ আরও কমানোর চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি পাইপলাইনের মাধ্যমে এ অঞ্চলে যদি গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে হালকা শিল্পের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। পদ্মা সেতুর ফলে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। এ জন্য মাওয়া থেকে বাগেরহাট পর্যন্ত মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা প্রয়োজন।

সমকাল :মোংলা বন্দর দিয়ে সরকার যে রাজস্ব পায়, তার একটি বড় অংশ আসে গাড়ি থেকে। পদ্মা সেতু হওয়ার ফলে এই রাজস্ব বাড়ার কোনো সম্ভাবনা রয়েছে?
লিয়াকত হোসেন লিটন :আগে আমদানি করা গাড়ি ঢাকায় নিতে আরিচা ফেরিঘাট ব্যবহার করতেন ব্যবসায়ীরা, যার কারণে মোংলা থেকে একটি গাড়ি ঢাকায় নিতে ৮-১০ ঘণ্টা সময় লাগত। পদ্মা সেতু চালুর পরে এখন তিন ঘণ্টায় গাড়ি ঢাকায় পৌঁছে যাচ্ছে। সময় বাঁচার পাশাপাশি গাড়িপ্রতি খরচও কমেছে। বছর শেষে এই খাত থেকে রাজস্ব অবশ্যই বাড়বে।

সমকাল :স্থানীয়দের সার্বিক জীবনযাত্রায় পদ্মা সেতুর প্রভাব সম্পর্কে কিছু বলুন।
লিয়াকত হোসেন লিটন :আগে যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় এবং ফেরিঘাটে দীর্ঘ প্রতীক্ষার কারণে এখানে ভালো মানের কোনো যানবাহন ছিল না, দর্শনীয় ও ঐতিহ্যবাহী অনেক স্থান থাকলেও বাইরে থেকে মানুষ তুলনামূলক কম আসতেন। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় বাগেরহাটসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন যানবাহন। যোগাযোগ সহজ হয়েছে। কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে অগ্রগতি ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে মানুষের সার্বিক জীবনযাত্রায়।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাগেরহাট প্রতিনিধি তানজীম আহমেদ

বিষয় : বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি

মন্তব্য করুন