হরমোন টেস্ট করার জন্য শহরে যাওয়ার কথা ছিল। এই টেস্ট না করা পর্যন্ত মা কিছুতেই আমাকে নিস্তার দেবে না। ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি করে ফেলেছিলাম। গায়ে জ্বর। মা এসে শরীরে হাত দিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠেছিল। এমন কেন করেছিল বুঝতে পারলাম না। মায়ের দুই হাত ছোট ছোট পালকে ঢাকা। এই রকম তো ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। শুধু মায়ের কথাই বলছি কেন, আরও অনেকের হাত এ রকম দেখেছি। এ নিয়ে মায়ের সঙ্গে আগে কখনও কথা হয়নি। আমাকে চমকে দিয়ে মা বলল- মানুষের হাতে পশম থাকে আর তোর হাতে পালক!
-তুমি আমাকে বলছ কেন, তোমার দুই হাতেও তো পালক।
-চুপ! একদম চুপ। এ নিয়ে আর একটা কথাও বলবি না।
এরপর থেকেই মা আমাকে লুকিয়ে থাকার পরামর্শ দিল। তখন খেয়াল করে দেখলাম মায়ের হাতের পালকগুলো পোড়া। মা আমাকে তাড়াতাড়ি শহরে পাঠাতে চায়, সে তার গলার সোনার চেইন খুলে দিয়ে বলল- তুই শহরে যা। দেখ পালকগুলো ফেলে আসতে পারিস কিনা। যদি পারিস ফিরে আসিস। আর না পারলে আসিস না। পালকওয়ালা মানুষ সমাজের জন্য ভালো না, সংসারের জন্যও ভালো না। এমনিতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাপে আমাদের আয়ু নরম আর মোলায়েম হয়ে যাচ্ছে। বেশি রোদ দেখলে ছায়া খুঁজে নিস।
মাকে বললাম- পালক তো দাদার হাতেও ছিল, আমাদের ভূগোলের শিক্ষকের হাতেও দেখেছি। তারা তো কেউ শহরে চলে যায়নি।
মা সে কথা মানল না। সে আমাকে দিব্যি দিল, কোথাও যদি হাতওয়ালা পাখি দেখি তাহলে প্রথম দেখাতেই যেন বলি-
'তোমার হাত আমাকে দাও, আমার পালক তুমি নাও'।
মা বলল- এই ডানা নিয়ে তুই যদি মানুষের সামনে যাস শোরগোল পড়ে যাবে। তাহলে বংশের মান-সম্মান আর থাকবে না।
ডাক্তার দেখাতেও নিষেধ করে দিয়ে হাতওয়ালা পাখি খুঁজে তার সঙ্গে ডানা বদল করার পরামর্শ দিল মা।
ডানাওয়ালা পাখির খোঁজে আমি ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম। অভ্যাসবশত, মানুষ কিংবা পাখি দেখার সময় মুখটা খুব খেয়াল করে দেখি। যদিও চেহারা মনে রাখতে পারি না। মনে গেঁথে থাকে স্বর। মনে হয়, মায়েরা সবচেয়ে বেশি মিথ্যেবাদী। সন্তানের জন্য অসংখ্য, অজস্র মিথ্যে কথা বলে বেড়ায় এরা। মা আমাকে পাঠাল ডানাওয়ালা পাখির খোঁজে আর মানুষকে বলল শহরে খালার বাসায় বেড়াতে যাচ্ছে। মায়ের বলা মিথ্যে কী মোলায়েম! কত মিহি সেই বুনন। নিশ্চয় মা এই কৌশল রপ্ত করেছে প্রাচীন গ্রন্থের কোনো পাতা থেকে।
আমার ঘরে ফেরা নির্ভর করছে একটি পাখি খুঁজে পাওয়ার ওপর। যেখানে আমাকে পাঠানো হয়েছে এখানে প্রত্যেক মানুষের হাত পালকে মোড়ানো। ধুর! আমার ডানা কেন পাল্টাতে হবে। এখানে পথগুলো কাঁসার থালার মতো। রোদে উত্তপ্ত হয়ে যায়। এই পথে হেঁটে বেড়াতে ভালো লাগে না। উড়তে ইচ্ছা করে।
একবার উড়লে আর কোনোদিন মানুষের সৌভাগ্য আমাকে ছোঁবে না। আমি হবো পাখিগোত্রের মানুষ। তাতে সমস্যা নেই, কিন্তু মা অপেক্ষা করে থাকবে আমার ফেরার জন্য। ডানার পালকগুলো বড় হয়েছে, পাখিদের উড়ে যেতেদেখে, আমিও ওজন হারাতে থাকি। কখনও যদি অবচেতনে উড়তে শুরু করি আর ফেরা হবে না ...
যদি আর ফেরা না হয়, না হোক। উত্তপ্ত রাস্তায় হেঁটে যেতে না পেরে সত্যিই উড়াল দিলাম। ইকারুস আর ফিরনাসকে দেখতে পেলাম। তারা বলল- 'এখানে কী তোমার?'
একটা রক্তজবা হাতে দিল ইকারুস,
বলল- 'তোমার আত্মার মাতম এতে গেঁথে নিও। ফিরনাসের হাত থেকে পেলাম একখণ্ড পাথর।
এটি কী কাজে আসবে তা সে কিছু বলল না।
নিচে নামার চেষ্টা করে দেখি, মাটির সামান্য উঁচুতে আমার পা। অথচ আমি হাঁটতে পারছি। এরপর আর কোনো মানুষের হাতে পালক দেখতে পেলাম না। শুধু রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পালক দেখলাম। বুঝলাম, এগুলো কুড়িয়ে নেওয়ার ক্ষমতা আমি হারিয়েছি। মাটিতে হাঁটতে না পারার কষ্ট আমাকে আঘাত করতে থাকল। মা আর মায়ের মোলায়েম মিথ্যে কথাগুলোর প্রতি মায়া জাগিয়ে রেখে আমি একটি ডানাওয়ালা পাখির খোঁজ করতে থাকলাম।
এখানে-ওখানে-সেখানে খুঁজে বেড়াতে বেড়াতে আবার একদিন ইকারুসের সঙ্গে দেখা।
সে বলল-
'যদি অনেক পাখি দেখতে চাও তাহলে সমুদ্রের কাছে যাও। দূরদূরান্ত পর্যন্ত পাখিদের ওড়াউড়ি দেখা যাবে। সেসব পাখি ঝাঁকে ডানাওয়ালা পাখি থাকলেও থাকতে পারে।'
এরপর আমি প্রায়ই সমুদ্রের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। মনে মনে ইকারুসকে ধন্যবাদ জানালাম। কারণ একটি হাতওয়ালা পাখির দেখা পেলাম। কিন্তু সেদিনই অসাবধানতাবশত ইকারুসের দেওয়া রক্তজবাটি হারিয়ে ফেললাম। আমার কাছে জমা থাকল শুধু ফিরনাসের দেওয়া পাথরখণ্ডটি।
দূর থেকে উড়ে কাছ দিয়ে চলে গেল একটি হাতওয়ালা পাখি। আমার দৃষ্টি ছিল তার হাতে থাকা রক্তজবার দিকে। তার হাতে একটি রক্তজবা দেখলাম। আমি ডানা পাল্টানোর মন্ত্রটি সেই মুহূর্তে ভুলে গিয়েছিলাম। অথচ প্রথম দেখায়ই তা পাল্টে নেওয়ার কথা ছিল। আমি তাকিয়ে দেখলাম পাখিটির মুখ যেন রক্তজবার মতো। দ্বিতীয় বা তৃতীয় দেখাতেও হতে পারে যদি পাখিটি চায়! বদলে যাওয়া আর নিজের ওপর নির্ভর করে না।
রক্তজবা হারিয়ে ফেলার পর ইকারুসের দেখা আর পেলাম না। এরপর পাথরখণ্ডটি খুব যত্নসহকারে সংরক্ষণ শুরু করলাম। তা না হলে ফিরনাসের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগটুকুও হারিয়ে ফেলতে হতো। মা আসলে ব্ল্যাক ম্যাজিশিয়ান, তা না হলে ডানা বদল করার শর্ত দেবে কেন! প্রথম দেখায় যা হবার নয় তা তো দ্বিতীয় বা তৃতীয় দেখায়ও হতে পারে। এভাবেই পথ রুদ্ধ রাখা হয়েছে আর পথ পাড়ি দিতে না পারার দোষ দেওয়া হয়েছে আমাকেই।
এরপর আমি সমুদ্রের কাছে দাঁড়িয়ে থাকি। পাখিটির সঙ্গে দেখা হয়। একদিন পাখিটির পিছু নিলাম। কোনো এক সময় দেখলাম পাখিটির পিছু পিছু এত দূরে চলে এসেছি যে চারপাশে জল আর জল। বুকের ভেতর হুহু করতে লাগল।
পাখিটি বলল- ভয় পেও না। এসো চক্রাকারে ঘুরতে থাকি। আমরা একজন ভাষা আরেকজন স্বাধীনতার খোঁজে এসেছি। সৌভাগ্য আমাদের দেখা করিয়েছে।
আমি ভয়ের কথা ভুলে গেলাম। তখন নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ লাগছিল। পাখিটির দুই হাত ধরতে ইচ্ছে করছিল। আমার হারানো হাতগুলোর কথা মনে পড়ছিল। আমার ডানার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ চোখ বুজে ফেলল। কিছু সময় এক অন্ধপাখির সঙ্গে উড়লাম। বললাম- ফিরে যাওয়া দরকার।
বলল একা চলে যেতে।
-পথ চিনে একা ফিরে যাওয়া কঠিন। তোমার পিছু পিছু এসেছি,পথ চিনে রাখিনি।
-বোকা কোথাকার।
শুনে রাগে শরীর জ্বলছিল। কান্না আসছিল। পাখিটি বলল নিচে তাকাতে। দেখি স্বচ্ছ পানি। কিন্তু আমার কান্না ধরে রাখতে পারছিলাম না।
পাখিটি আবার বলল- বৃষ্টি হবে ফিরে যাও।
-একা যেতে পারব না। দরকার হয় সমুদ্রে ডুবে মরব।
-ইকারুস তোমাকে স্নেহ করেন, তার সঙ্গে যার দেখা হয় সে আর সমুদ্রে ডোবে না। আকাশ থেকে বৃষ্টি ফোঁটা ঝরার আগেই আমার দু' চোখ বেয়ে জল গড়াল। একফোঁটা জল পড়ে আর একটি রক্তজবা ভেসে ওঠে সমুদ্রের জলে। আবার একফোঁটা জল পড়ে- আরেকটি রক্তজবা ভেসে ওঠে। কয়েক ফোঁটা জল পড়ে, অঝোরে জল পড়ে- কত শত রক্তজবা যে ভেসে উঠল। তারপর সেই ফুলের মধ্যে পাখিটির মুখ দেখতে পেলাম। বুঝলাম ফুলটি হারায়নি। ফুলটি তার মুখ।
পাখিটি বলল- হয় কূলে ফিরে যাও, নয়তো কাঁদতে থাকো।
-আমার আর কূল আছে? কূল বলতে এখন মাটির কাছাকাছি যাওয়া, মাটি পাওয়া নয়।
-তাহলে এই শূন্যতায় ভেসে থাকো। আমার অন্য কোথাও যাওয়ার আছে।
-আমাকে নাও।
-না তোমাকে সেখানে নেওয়া যাবে না।
-কেন?
-কারণ তোমার হাতে পাথর আছে।
-তাতে কী।
-এতে কেউ আহত হতে পারে।
-বিশ্বাস করো আমি কাউকে আঘাত করব না।
-বিশ্বাস করার জন্য যে অগাধ শক্তি লাগে তা আমার পুরোপুরি নেই। ক্ষণে ক্ষণে সন্দেহ করা মানুষ আমি। এই যে তোমাকেও সন্দেহ করছি। কী এমন হলো যে তুমি আমার পিছু নিয়েছ? অন্য কোথাও যাও না কেন। তোমার এই উড়তে থাকার পেছনে কোনো স্বার্থ আছে। আবার তোমার পালকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছ পাথর।
-এটা আমাকে একজন দিয়েছে।
-জানি।
-কি জানো?
-ফিরনাসের কথা বলছো তুমি।
-তুমি কী করে জানো।
-তার সঙ্গে আমারও দেখা হয়েছিল। তবে পাথরটি আমি প্রথম হারিয়েছি। এখন এই রক্তজবা আছে। অথচ তোমার কাছে রক্তজবা নেই। তুমি আমার হাতের রক্তজবাকে তোমার মনে করছ। তুমি তোমার দুই হাত হারিয়েছ এখন আমার দুই হাতকে তোমার হাত মনে করছ। ভাবছ তোমার পালক-আবৃত ডানা আমি চাইব! কোনোদিনও না।
-তোমার এত অহংকার কীসের?
-অহংকার নয়, যা হারিয়েছি তা চাই না।
-পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া ঘন গভীর ছায়া চাও না?
পাখিটি আমার কথার উত্তর দিতে রাজি হলো না। তবে সে তার হাত দিয়ে আমার ডানা ধরে আরও কিছু সময় উড়ল। একটু ভয়ও আর পেলাম না। মনে হলো এভাবে যদি সারাজনম উড়তে পারতাম। পাখিটি আমাকে কূলে ফেরার রাস্তা দেখিয়ে দিল। আমি ফিরে এলাম। আমার হাতে লেগে থাকল তার স্পর্শ আর ফিরনাসের দেওয়া পাথর।
মায়ের একটি আদেশ মানতে চাই, হাত তো ফিরে পাইনি। কীভাবে পাবো! আমি বরং এই ডানায় ভর করে উড়তে থাকব দিজ্ঞ্বিদিক। আমি বরং আকাশে মেঘ হলে উড়ে যাবো সমুদ্রের মাঝ শূন্যতায়। কাঁদব। জল ঝরবে, সমুদ্রের পানিতে ভেসে উঠব রক্তজবার মতো পাখির মুখ।
ভাষার যুদ্ধে মানুষ আর স্বাধীনতার যুদ্ধ পাখিরাই আগে আক্রান্ত হয়। যারা এসবের আশায় তোমার দিকে তাকিয়ে থাকে, সেই মুখগুলো আমাদের।