মুখখানি তার অমুকের মতো। এই 'অমুকের' মতো তুলনার মানে কী? আমরা তো বলি না যে রবীন্দ্রনাথের মুখের চেয়ে নজরুলের মুখশ্রী আরও বেশি অর্থময়, আরও বেশি সুন্দর। বরং বলি, ছেলেটিকে দেখতে একেবারে রবীন্দ্রনাথের মতো। অথবা মেয়টিকে দেখতে একেবারে সুচিত্রা সেনের মতো। অমুকের সঙ্গে তুলনা দিয়ে তার মুখের আদল কেন নির্ণয় করতে হয়? তার মুখের সঙ্গে অমুকের মুখের যে সম্পর্ক আমরা রচনা করি, সেই সম্পর্কের মানে কী! তার মুখ কি তার মুখচ্ছবি বর্ণনার জন্য যথেষ্ট নয়? নাকি তার মুখটিকে নিয়ে আরও অধিক বাসনা আমরা রচনা করতে চাই? এই প্রশ্ন যদিও অমীমাংসিত, তবুও আমরা তা করি। কেন করি?
মুখখানি তার চাঁদের মতো। আচ্ছা, চাঁদের মতো কি কারও মুখ হয়? সুন্দর অর্থে এমন উপমা বসাই অহরহ। কিন্তু চাঁদ তো চাঁদের মতো। সে তো তার মতো। তুমি তো তোমার মতো। আমি তো আমার মতো। তবু তাকে কেন অন্য কারও, অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা করে নিরূপণ করতে হয়? তোমাকে কেন আরও অধিক করতে অন্যের সঙ্গে তুলনা বসাই? আমাকেই বা কেন আমি খুঁজে বেড়াই তার নামে, তার প্রাণে; তার মনে, তার মুখের মাঝে!
বনলতা সেনের চোখকে ব্যাখ্যা করতে চেয়ে পাখির নীড়ের সম্পর্ক জীবনানন্দ দাশ কেন টেনে আনেন? বনলতার চোখ কেন বনলতার মতো হয় না? কখনো মনে হয়, আরও অর্থময় করে তোলার জন্য। আবার কখনো মনে হয়, এই তুলনার মধ্যে একটি সামন্তবাদীয় সুই-সুতা জড়িত।
যখন বলি, মুখখানি তার দিগন্ত রেখার মতো আভাময়, তখন কি আমরা তাকে আরও বেশি আভাময় করতে বাসনা করি? কবি আল মাহমুদ লিখেন- মুখখানি তার নতুন চরের মত। হয়তো এটা আশাজাগানিয়া উচ্ছ্বাস। কিন্তু জেগে ওঠা নতুন চরটি তার মুখের মতো- এটা কেন বলি না?
আমরা কি তবে যা পাই তার মাঝে আরও কিছু না-পাওয়াকে খুঁজতে যেয়ে এমন উপমা বসাই? একটা গভীর গোপন তো রয়েই যায়; যায় না? যেমন এই পাতাটি, এই পাতাটির মতোই। কিন্তু এই পাতাটিকে বুঝাতে যেয়ে কেন আরেকটি পাতার সঙ্গ টেনে আনি! এই ঘোর, এই বিস্ময় আমার আছে। আছে আপনারও, জানি। কিন্তু তৃষ্ণা মেটে না! এই না-মেটা তৃষ্ণার পক্ষ তবে অন্য কোনো তুলনা? সে তুলনার স্বরূপ কী? বাংলায় বলি রূপক, উপমা কিংবা অলংকারবিশেষ। ইংরেজিতে বলি মেটাফর কিংবা এলিগরি। যে ভাষায় যা-ই বলি, বলা মূলত একই। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বলি? কেন তার নামে আরেকটি নাম চলে আসে? কেন তার নামে অন্য কোনো উপমা বসে?
কেন, তাকে দিয়ে তাকেই ব্যাখা করা যায় না? তাহলে কি ভাষার ব্যর্থতা, নাকি তার আরও কোনো বিশেষ মর্যাদা নিরূপণ করতে চাই? এই যে আজ ফেসবুকে কবি সরকার আমিন বলল- 'একেবারে ছোট্ট ছোট্ট লাইট জোনাকির মত জ্বলবে আর নিভবে।' কোনো বস্তুকেও কিন্তু আমরা তুলনা করি এইভাবে, অন্য কিছুর সঙ্গে। ব্যক্তি আর বস্তু। কিছু আর কারও সঙ্গে আমাদের তুলনায় জড়িয়ে পড়তে হয় কেন? 'ছোট্ট ছোট্ট লাইট'- এ কথাটা বললে কি আমরা এই জ্বলা-নিভা ছো্‌ট্ট ছোট্ট ইলেকট্রিক বাল্‌বের মহিমা বুঝতে পারতাম না? এর সঙ্গে কি জোনাকির জ্বলা-নিভার তুলনা ছাড়া?
এই যে আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু, কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল, মাঝে মাঝে তাকে বলি, 'তোকে দেখতে অনেকটা কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর মতো।' কেন বলি নাই, তোকে দেখতে ঠিক তোরই মতো অসাধারণ! তোর চোখ জোড়া মায়াময়। চোখের মণির ভিতর দারুণ এক পৃথিবী যেন কথা কয়। এই দেখার সঙ্গে দারুণ এক না-দেখাকে কি আমরা তুলনা করতে যাই; যাই নাকি? কেন আরজ আলী মাতুব্বরকে বলি, আমাদের কালের সক্রেটিস? একই সঙ্গে আমরা না-দেখা সক্রেটিসকে যেমন আরও বেশি করে তুলি, তেমনি মাতুব্বরকেও কি? এই প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত। কেন আঁকে একের পর এক একাধিক শিল্পী তোমার একটি মুখেরই ছবি!
এই যে আলিঙ্গন বুঝাতে সমুদ্রে সূর্যাস্তের তুলনা করি। এই যে পুরুষের যৌনাঙ্গ বুঝাতে মাটির অভ্যন্তর থেকে একটা লাল গাজর তুলে আনি; এই যে নারীর যৌনাঙ্গ বুঝাতে জ্যামিতির ত্রিভুজকে উপমা মানি। এই যে হলুদ বুঝাতে একটা শর্ষে ফুলকে ধার করি। এই যে সঙ্গম বুঝাতে ঘর্মাক্ত মাঝির হাতে নৌকার গলুইয়ে বসে জলের ভিতরে বৈঠা মারাকে সম্বোধন করি। এই যে বহুজাতিক কোম্পানির একটি পারফিউমের সুঘ্রাণ বুঝাতে হাসনাহেনার সুবাস বয়ান করি। এই যে কাঙ্ক্ষিত শরীরের গড়ন বুঝাতে একটি কচি লাউয়ের ডগাকে ব্যবহার করি। এই যে প্রেমিককে বুঝাতে তাজমল গড়ি। এই যে তোমার সঙ্গে আমার ব্যবধান বুঝাতে উপর-নিচের সিঁড়ি। মেঘ বুঝাতে কেন মেঘালয়? পৃথিবীর সব দেশের আকাশেই তো মেঘের উদয় হয়! উঁচু বুঝাতে কেন শুধু হিমালয়। নিচু বুঝাতে হিমালয়ের পাদদেশ। প্রেম বুঝাতে কেন আমরা ইউসুফ-জুলেখা, রোমিও-জুলিয়েট, বেহুলা-লখিন্দরের প্রসঙ্গ টানি। এই যে পর্বতের চূড়া বুঝাতে তোমার বুকের স্তন, কেন? কেন? এসবের কি অর্থ বহন করে, অজানা তোমার মন?
কেন আমি তোমাকে বুঝাতে অন্যকে ব্যবহার করি? নিঃসঙ্গতাকে বুঝাতে যেমন বলি, সে পাহাড়ের মতন একা। তুমি কি তোমার মতন একা নও? আবার বলেছি আকাশ- যেমন তুমি আজ আকাশের মতো একেলা!
রৌদ্দুরকে বুঝাতে চেয়ে ছায়ার কাছে গিয়েছি। অত্যন্ত কাছেরকে বুঝাতে চেয়ে বহুদূরকে ডেকে এনেছি। যেমন জীবনকে বুঝাতে চেয়ে মৃত্যুকে পাশে ডেকেছি। যেমন তোমার নাম বলতে চেয়ে আরেকটি নামের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছি!
যেমন মুখখানি তার লজ্জাবতী লতা। লতাগুল্ম লজ্জাবতীকে কেন তুলনায় আনতে হলো? লজ্জাবতী লতা স্পর্শ পেলেই গুটিয়ে নেয় তার মেলে ধরাকে। তোমার গালে চুমু দিলে তুমি যেমন লজ্জা পাও। এই লজ্জাকে ব্যাখ্যা করতে হলে আমার লজ্জাবতী লতাকে টেনে আনতে হয়, কেন? এই প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত।
কেন যৌবনকে ব্যাখ্যা করতে ফাল্কগ্দুনকে ব্যবহার করি। কেন তোমার কবিতাকে ব্যাখ্যা করতে চেয়ে আরেকজনের কবিতায় আমার কর্জ বাড়ে!
যেমন তোমার অম্লান মুখের হাসিটিকে বুঝাতে যেয়ে একটি চাঁদের আলোকচ্ছটাকে তুলনা করি, তখন কি তোমার নিজেকে ম্লান লাগে না? কেন এসব করি? তোমার অম্লান হাসিটি তো তোমার; তোমারই। তোমার ম্লান হাসিটিও তোমার; তোমারই। চাঁদ চাঁদের মতো। তুমি তোমার মতো। চাঁদের সঙ্গে কেন তুমি- কেন আমি তোমাকে মেলাতে চেয়েছি তার সঙ্গে? তোমাকে কি তার সঙ্গে মিলিয়ে আরও কিছু ব্যঞ্জনা তৈরি করতে চেয়েছি, যেখানে আমি একজন নিঃসঙ্গ এবং স্বার্থপর?
কবি একজন নিঃসঙ্গ মানুষ এবং অবশ্যই সে একজন একাকী স্বার্থপর। তাকে আরেকজনের সঙ্গে, নিজের সঙ্গে, আকাশের ওই প্রিয়তম তারাটির সঙ্গে, এবং অবশ্যই তোমার সঙ্গে কখনো তুমি মেলাতে যেও না। যদিও জানি, তুমি মেলাতেই চাইবে। কারণ তুমি কবি নও। কবি হতে কেউ চায় না। কে চায় এতটা নিঃসঙ্গ হতে!
কবি হয়তো মানুষ নয়, অন্য কিছু। ধরো, সে একটা তাবিজ। তুমি ভাবছ, এই তাবিজ ঘুমের। তুমি ভাবছ, এই তাবিজ জাগরণের। তুমি ভাবছ, এই তাবিজ তোমার শিশুটির বিছানায় পেচ্ছাব করা রোগের উপশম। কিন্তু এই তাবিজ তো একটি ভার; তোমার ভালো লাগে না। লাগে কিনা? তুমি কি তোমার ভালো লাগাকে অন্যের বাহুতে শনাক্ত করো? নিজের বাহুকে কি কখনো জিজ্ঞেস করেছ, ভালোবাসা কেন তুমি একটি গোলাপ; একটি প্রজাপতির পাখনা? কেন তুমি একটি বালুতীর, তাকে ধার করো?
সেই শুধু তোমাকে তুলনা করে; নিজেকে করে না। এই হচ্ছে আমার উত্তর। উত্তরের সঙ্গে যেমন দক্ষিণ জড়িত। পুবের সঙ্গে তেমন পশ্চিম আদৃত।
প্রিয়তমা, আমাকে তুমি কারও সঙ্গে তুলনা করো না। না রেললাইন, যা আত্মহত্যার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে প্ররোচিত। না এ মানব জীবন, যা কখনোই নয় তারায় তারায় খচিত। না কামাল, না ইলিয়াস, না মার্কেস, না চাঁদ, না বনলতা।
জীবন একটা তিন তাসের মতন। খেলব, হারব, জিতব। হেরে ঘরে ফিরব। জিতেও ঘরে ফিরব। জীবন একটা পিঁপড়ের মতন; কারও কারও কাছে পা দিয়ে পিষে ফেলার মতন। এখানেও তো জীবনকে বলা হলো, পিঁপড়ের মতো, তাসের মতো। কিন্তু জীবন আসলে কার মতো?
এই যে পাখির নীড়ের মতো চোখ; সে চোখ আসলে কার মতো? এই যে মুখখানি তার জেগে ওঠা নতুন চরের মতো; তার মুখখানি আসলে কার মতো? এই যে বলি, তার ছোট গল্প আসলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো; তার গল্প আসলে কার মতো? এই যে বলি, তার গান কাজী নজরুল ইসলামের মতো; তার গান আসলে কার মতো? এই যে বলি, তার কবিতা জীবনানন্দ দাশের মতো; তার কবিতা আসলে কার মতো? আমরা কেন সরাসরি বলতে পারি না? আমাদের কথাকে কেন ছাপাখানার মেশিনের ভিতর চাপা খেতে খেতে বের হয়; সরাসরি বের হতে পারে না! এই না-পারার যন্ত্রণাকে অন্যের কাঁধে তুলে দিয়ে আরাম অনুভব করি! তবে আমাদের কি মাধ্যম ছাড়া চলে না? যেমন এসব প্রশ্নই আমি কালের খেয়ার স্কন্ধে চাপিয়ে তোমাকেই ইশারা করি। মুখখানি তার- তার মতো নয়, বল স্বরূপ, কেন?