আজকাল একটু চোখ-কান খোলা রাখলে স্টার্টআপ শব্দটা হরহামেশাই হয়তো শুনে থাকবেন। স্টার্টআপ হলো এমন একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, যা মূলত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। এক বা একাধিক উদ্যোক্তা মিলে যখন বাজারে থাকা কোনো চাহিদার জন্য একটি উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে আসেন, সেটিকে আমরা একটি স্টার্টআপ বলি। স্টার্টআপের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো- এর খুব তাড়াতাড়ি প্রসার ও বৃহৎ ব্যবসা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে, যাকে স্কেল্যাবিলিটি বলা হয়ে থাকে।

একটি স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম তৈরি হয় ব্যবসার বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা স্টার্টআপ, তাদের সাহায্য করার জন্য বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং এ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত সব মানুষকে নিয়ে। এই সংস্থাগুলোকে আরও ভাগ করা যেতে পারে। যেমন- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী সংস্থা, সহায়তা সংস্থা (ইনকিউবেটর, অ্যাক্সিলারেটর, কো-ওয়ার্কিং স্পেস ইত্যাদি), গবেষণা সংস্থা, পরিষেবা দানকারী সংস্থা (আইনি, আর্থিক পরিষেবা ইত্যাদি) এবং বড় করপোরেশন।

বাংলাদেশি স্টার্টআপদের মধ্যে চালডাল ডটকম, পাঠাও, শপআপ, সেবা, টেন মিনিট স্কুল, পেপারফ্লাই ইত্যাদি সবার পরিচিত। এমনকি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বিকাশও শুরু করেছিল স্টার্টআপ হিসেবেই। স্টার্টআপদের হাত ধরেই বাংলাদেশি অর্থনীতির সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছানোর। বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম অনেক বড় হয়েছে। প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ এসেছে তাদের মাধ্যমে। ২০২২ সালের প্রথম মাসে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা ৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সংগ্রহ করেছেন। গত এক বছরেই বিনিয়োগ বেড়েছে ১০ গুণ। ফিনটেক, ই-কমার্স, লজিস্টিকস ইত্যাদি খাতে উঠে আসা স্টার্টআপগুলো বিশেষভাবে বিনিয়োগ বাড়াতে অবদান রেখে চলেছে।

সংশ্নিষ্টদের মতে, গত ১৩ বছরে স্টার্টআপের ইকোসিস্টেম তৈরির মাঝামাঝি জায়গায় এসেছে বাংলাদেশ। চলে এসেছে তৃতীয় প্রজন্মের স্টার্টআপ। প্রথম প্রজন্ম ছিল বিডিজবস থেকে বিকাশের শুরুর সময়টা। সে সময়ে এজন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বা বাংলাদেশের ভেতরে কোনো ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ছিল না। দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে বা দেশের বাইরে থেকে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পায় তারা। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, এঞ্জেল ইনভেস্টরদের থেকে তারা ফান্ড পেয়েছে। তবে স্টার্টআপের নানা দিক অংশীজনকে বোঝাতে এবং দেশের বাজারের উপযোগী করে বিভিন্ন পণ্য বা সেবা চালু করতে বেশ শ্রম দিতে হয় তাদের।

আর এখন তৃৃতীয় প্রজন্মের স্টার্টআপের উত্থান হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে। তারা শুধু দেশের বাজার নয়, বিশ্ববাজারকে লক্ষ্য রেখে কাজ করছে। বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে একটি অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে তারা। নতুন কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আনতে পারছে বড় অঙ্কের বিদেশি বিনিয়োগ।
ইতোমধ্যে অনেক আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল যেমন- সেকোয়া ক্যাপিটাল, টাইগার ক্যাপিটাল, এক্সেল পার্টনারস ও গোল্ডেন গেট ভেঞ্চার্স বাংলাদেশে বিনিয়োগ শুরু করেছে। আমাদের স্টার্টআপরা বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন পরিচিতি তৈরি করেছে। অনেক প্রবাসী বাংলাদেশিও স্টার্টআপগুলোতে বিনিয়োগ করছেন।

বিভিন্ন ধরনের স্টার্টআপের মধ্যে বিনিয়োগের দিক থেকে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে ফিনটেক বা আর্থিক প্রযুক্তিসংক্রান্ত স্টার্টআপগুলো। বিকাশ এখানে একটি বড় নাম। এই মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস একাই ২০২১ সালে ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ তুলে আনতে সক্ষম হয়েছে। সে বছর একই খাতে শপআপ নিয়ে এসেছে আরও ৭৫ মিলিয়ন ডলার। তথ্য ও যোগাযোগ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেছেন, 'ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা স্মার্ট বাংলাদেশের ভিশন পূরণের জন্য যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটিই হচ্ছে অর্থপ্রযুক্তির বিভিন্ন উদ্ভাবনী পণ্য ও সেবা।'

আইসিটির ভূমিকা
স্টার্টআপ খাতের এই সাফল্যের পেছনে কিছু স্পষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, স্টার্টআপ ব্যবসা বেশিরভাগ সময়ই প্রযুক্তিনির্ভর। বাংলাদেশে প্রযুক্তির ব্যবহার এখন ঊর্ধ্বগামী। প্রতি তিনজনের মধ্যে দু'জনের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) হিসাব অনুযায়ী, দেশে মোট ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা ১২ কোটি ৩৮ লাখ, যার মধ্যে ১ কোটি ব্রডব্যান্ড সংযোগ ব্যবহার করেন এবং বাকিরা মোবাইল ইন্টারনেট।

সরকারের ভিশন ২০২১-এর একটি মূল অংশ ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরি করা। তাই সহায়ক নীতিমালা, প্রণোদনা ইত্যাদির প্রভাবে দেশের আইসিটি খাত ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। এরই প্রভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি স্টার্টআপ খাতের এগিয়ে চলার মধ্যে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে- স্টার্টআপগুলোর ভোক্তাশ্রেণি। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। এই তরুণ এবং প্রযুক্তিপ্রেমী বৃহত্তর অংশটির চাহিদা অনুযায়ী বাজারে পণ্য আসছে। পণ্য ও সেবার চাহিদা পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এ চাহিদা নিয়েই কাজ করছে স্টার্টআপ ব্যবসাগুলো। ভোক্তার চাহিদা পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের দক্ষ জনবলও বেড়েছে। প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার আইটি গ্র্যাজুয়েট তৈরি হয় বাংলাদেশে। এর সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক জ্ঞানও এখন বেশ সহজলভ্য। তাই আমরা এমন একটি জনসংখ্যা পাচ্ছি যাঁদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা উদ্ভাবনী উপায়ে সমাধান করার প্রয়োজনীয় জ্ঞানটুকু আছে। দেখা যাচ্ছে, আমাদের এই প্রতিভাবান তরুণ প্রজন্মের অনেকের কাছেই দেশে ক্যারিয়ার গড়ার তেমন রাস্তা নেই। কারণ, একমাত্র তৈরি পোশাক শিল্প ছাড়া বৃহৎ পরিসরে শিল্পায়ন খুব একটা হয়ে ওঠেনি। এ শিল্পটিও তথ্যপ্রযুক্তির চেয়ে বেশি শ্রমনির্ভর। তাই তারা নতুন রাস্তা খুঁজতে গিয়ে নিয়ে আসছে বৈচিত্র্যময় সব স্টার্টআপের ধারণা।

নজর দিয়েছে সরকার
বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে সরকারি সহায়তা। দেশে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা থাকার পাশাপাশি স্টার্টআপ খাতের জন্য বিশেষায়িত কিছু উদ্যোগ সরকার নিয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে উদ্যোক্তাদের সার্বিক সহযোগিতার জন্য 'আইডিয়া' নামে প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০১৯ সালে রাষ্ট্রীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম স্টার্টআপ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০২০ সালে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ২৮টি হাইটেক পার্ক স্থাপন এবং ২০২২ সালে জাতীয় বাজেটে স্টার্টআপের জন্য স্যান্ডবক্স পরিকল্পনা নেওয়া হয়। স্টার্টআপ খাতে সাম্প্রতিক সময়ে যে উন্নয়ন ঘটেছে তা আমাদের অর্থনীতিতে বেশ ভালো পদচিহ্ন রেখে চলেছে। দেশে এখন ১ হাজার ২০০-এর বেশি স্টার্টআপ রয়েছে, যেখানে কাজ করছে ১৫ লাখের বেশি মানুষ। বৈদেশিক বিনিয়োগের কারণে ২০২১ সালে জিডিপিতে দশমিক ১০ শতাংশ অবদান রেখেছে আমাদের স্টার্টআপ খাতের বিনিয়োগ। ২০২৫ সালের মধ্যে সঠিক নীতিমালার সাহায্যে জিডিপিতে স্টার্টআপ খাতের অবদান ২ শতাংশে নিয়ে আসা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অন্য দেশের কী অবস্থা?
বাংলাদেশ ছেড়ে যদি আমরা একটু বাইরের বিশ্বে তাকাই, আমরা দেখতে পাব- কীভাবে স্টার্টআপ বেশ কিছু অর্থনীতির মানচিত্র বদলে দিয়েছে। ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি, ব্যবসায়ের অনুকূল পরিবেশ এবং বেড়ে চলা ইন্টারনেট অর্থনীতির সম্মিলিত প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম লাভজনক অর্থনীতি সিঙ্গাপুর স্টার্টআপের জন্য একটি আকর্ষণীয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সিঙ্গাপুরের স্টার্টআপ খাতে যে বিনিয়োগ আসে তা তাদের জিডিপির ২৮ দশমিক ২১ শতাংশ।

প্রতিবেশী দেশ ভারত বিশ্বে সব দেশের মধ্যে স্টার্টআপের জন্য তৃতীয় বৃহত্তম ইকোসিস্টেম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাদের স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগ আসে জিডিপির ১ দশমিক ৩২ শতাংশ। গত কয়েক বছরে সে দেশে স্টার্টআপে বিনিয়োগ বেড়েছে ১৫ গুণ। ইউনিকর্ন স্টার্টআপ বলে একটি ধারণা আছে, যেসব স্টার্টআপ স্টক মার্কেটে নাম লেখানো ছাড়াই ১ বিলিয়ন ডলারের মাইলস্টোনটি অতিক্রম করতে পারে তাদের বলে ইউনিকর্ন। ভারতে এই ইউনিকর্ন স্টার্টআপই আছে ১০৫টি। এমনকি তাদের চারটি স্টার্টআপ, ফ্লিপকার্ট এবং নাইকা নামে দুটি ই-কমার্স সাইট, বাইজু'স নামে একটি অ্যাডটেক কোম্পানি এবং সুইগি নামে ফুড ডেলিভারি সার্ভিস- এ কোম্পানিগুলো ডেকাকর্ন খেতাব অর্জন করে ফেলেছে। অর্থাৎ এ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিটির দাম এখন ১০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। স্বভাবতই এই স্টার্টআপগুলো শুধু উদ্ভাবনী সমাধান এবং প্রযুক্তি বিকাশ নিয়ে কাজ করছে তা নয়; পাশাপাশি বড় আকারের কর্মসংস্থান তৈরি করছে। স্টার্টআপ খাতে এশিয়ার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দেশ ইন্দোনেশিয়া। ২০২০ এবং ২০২১ এই দুই বছরে ইন্দোনেশিয়ান প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপগুলোতে মূলধন বিনিয়োগ ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঐতিহাসিক উচ্চতায় দাঁড়িয়েছে। কভিড মহামারি এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও টেকসই জিডিপি বাড়ার হার এবং দ্রুত ইন্টারনেট ছড়িয়ে পড়া ইন্দোনেশিয়ার প্রযুক্তিকেন্দ্রিক স্টার্টআপগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে উৎসাহিত করেছে।

সম্ভাবনা ব্যাপক
বাংলাদেশের দিকে তাকালেও আমরা দেখব, আমাদের জিডিপি বাড়ার হারও একটি টেকসই পর্যায়ে আছে এবং বাংলাদেশে ইন্টারনেটের ব্যবহারও বেড়ে চলেছে। ইন্দোনেশিয়ায় এখন আটটি ইউনিকর্ন রয়েছে। হয়তো সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশেও আমরা ইউনিকর্নের দেখা পাব। স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের প্রতিটির সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকাটা বর্তমান সময়ে আমাদের অর্থনীতির জন্য জরুরি। পাট বা তৈরি পোশাক শিল্পের মতো বাংলাদেশের অসাধারণ উদ্ভাবনী ও ব্যবসাসফল সব স্টার্টআপের মাধ্যমেও মানুষ বাংলাদেশকে এক সময় চিনবে।

বিশ্নেষকরা বলছেন, দেশের স্টার্টআপ খাতে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার সময় এসেছে। তাঁদের মতে, এ খাত অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখতে পারে। এজন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে দক্ষতা উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে। বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য প্রণয়ন করতে হবে সহায়ক নীতিমালা।