স্টার্টআপগুলো মূলত স্থানীয় বাজারের বিভিন্ন সমস্যার জন্য উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে আসে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এমন কিছু স্টার্টআপও আসছে, যেগুলোর লক্ষ্য বিশ্ববাজার। তারা এমন অনেক পণ্য ও সেবা নিয়ে আসছে, যেগুলোর চাহিদা রয়েছে অন্যান্য দেশেও। এই স্টার্টআপগুলোর জন্য সুযোগ রয়েছে সেই চাহিদার বিপরীতে জোগান দেওয়ার। এমন কিছু স্টার্টআপের মধ্যে রয়েছে- আইপেজ, লাইল্যাক, অন্ন, ওয়ানথ্রেড, গেম অব ইলেভেন, এয়ারওয়ার্ক ইত্যাদি।
আইপেজ নামের স্টার্টআপটি যাত্রা করে ২০১৯ সালের শুরুর দিকে। মাশরূর, মিঠু ও নিশাত নামে তিন বন্ধু খেয়াল করেছিলেন মাটির গুণগত অবনতি এবং অবকাঠামোগত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ অনেক দিন ধরেই চাষিদের সমস্যায় ফেলছে। ওই তিন বন্ধু আইপেজ নামের প্রতিষ্ঠান তৈরি করে ছোট দল নিয়ে এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করা শুরু করেন, যা মাটির অবস্থাভেদে কোন কীটনাশক ব্যবহার করা ঠিক হবে তা বলে দিতে পারে।

প্রতিষ্ঠানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মাশরূর জানান, কৃষক যাতে মাটি ও জলবায়ু সম্পর্কে সঠিকভাবে জেনে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সে ব্যাপারে সহায়তা দেন তাঁরা। একই সঙ্গে তাঁরা কৃষককে স্থানীয় বাজারে সরাসরি সংযুক্ত করে দেওয়ার কাজটিও শুরু করেন, যাতে পণ্য বাজারজাত করার জন্য কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন না হয়। এর পাশাপাশি আইপেজ ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে বাজার চাহিদা, মূলধন, বীমা, যান্ত্রিকীকরণ সংক্রান্ত তথ্য ও পরামর্শ প্রদান ব্যবস্থা চালু করেছে। ইতোমধ্যে আইপেজ ব্যবহারকারী কৃষকের উৎপাদন খরচ ২০ শতাংশের মতো কমেছে। লাভ বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ। দেশের বাইরে বেশ কয়েকটি আফ্রিকান ও কম্বোডিয়ান স্টার্টআপের সঙ্গে যোগাযোগ করছে আইপেজ। ভবিষ্যতে অংশীদারিত্ব মডেলের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করার পরিকল্পনা করছেন তাঁরা।

প্রজনন স্বাস্থ্যকে কেন্দ্র করে নারীর জন্য দেশের প্রথম ডিজিটাল ওয়েলনেস প্ল্যাটফর্মের নাম লাইল্যাক, যার শুরুও একজন নারী উদ্যোক্তার মাধ্যমে। ২০২০ সাল থেকেই রনিকা, কামরান ও সাদমান- এই তিন তরুণ-তরুণী চিন্তা করছিলেন নারীর জন্য অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার সমস্যাটি কীভাবে সমাধান করা যায়। নারীর ঋতুস্রাবকালীন বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য সাবস্ট্ক্রিপশনভিত্তিক পিরিয়ড কেয়ার সার্ভিস তৈরি করার মাধ্যমে তাঁরা ২০২১ সালে লাইল্যাক শুরু করেন। কোম্পানিটি তাদের গ্রাহকদের জন্য অনলাইনে চিকিৎসক দেখানোর ব্যবস্থা করেছে এবং পিরিয়ডের পাশাপাশি প্রসবপূর্ব যত্ন ও যৌন স্বাস্থ্যবিষয়ক পণ্য নিয়ে এসেছে। প্রতিষ্ঠানের সিইও রনিকা মনে করেন, বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশগুলোও লাইল্যাকের মতো মডেল থেকে উপকৃত হতে পারে। তাঁরা এ নিয়ে কাজও করতে আগ্রহী।

অন্ন হলো একটি ইন্টারনেট রেস্তোরাঁ প্ল্যাটফর্ম; যার প্রতিষ্ঠাতা তাহমিদ, নাফিউর, আশরাফুল ও ধ্রুবজিৎ নামের চার উদ্যমী তরুণ। গ্রাহকদের ডেলিভারি দেওয়ার জন্য বাণিজ্যিক রান্নাঘর ক্লাউড কিচেন হিসেবে যাত্রা শুরু করে অন্ন। তাঁরা একসময় বুঝতে পারেন- প্রযুক্তি, ডিজিটাল বিপণন, খাদ্যনিরাপত্তা, সাশ্রয়ী খাদ্য তৈরি পদ্ধতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সাহায্য করার মাধ্যমে ক্ষুদ্র রেস্তোরাঁগুলোর সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। সেখান থেকেই অন্নর যাত্রা শুরু। এর অপারেটিং সিস্টেমটি বিনা খরচে ব্যবহার করে পার্টনাররা উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। এটি ফ্রিগিস, পার্টি পিৎজা নামে নিজেদের কিছু খাবার ব্র্যান্ডও চালু করেছে। অন্ন শিগগিরই ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করতে চায়। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি সিলিকন ভ্যালির একটি স্টার্টআপ এক্সেলারেটরে যোগ দেওয়ার ডাক পেয়েছে।

ওয়ানথ্রেড একটি বাংলাদেশি প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট সাস সফটওয়্যার। এই সফটওয়্যার এজেন্সি, স্টার্টআপ ও অনলাইন ব্যবসায়ীদের অভ্যন্তরীণ কাজ পরিচালনা এবং নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য তৈরি করা হয়েছে। রাশিক, রবাত ও সিয়াম নামে তিন তরুণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে তাদের কার্যকারিতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন। ভিন্ন ভিন্ন শিল্প খাতে কাজ করা বিভিন্ন কোম্পানির অভ্যন্তরীণ কাজ ও যোগাযোগকে গুছিয়ে আনার জন্য তাঁরা ওয়ানথ্রেড নামে কাঠামোবদ্ধ ও ব্যবহারবান্ধব ইন্টারফেসটির পরিকল্পনা করেন।

ওয়ানথ্রেড এখন বিশ্বব্যাপী তাঁদের পণ্যটির প্রসারে কাজ করছে। শুরুতে সীমিত অর্থায়নের কারণে এটা কঠিন ছিল, কিন্তু সম্প্রতি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং ও ভারতের কিছু এজেন্সি থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছেন তাঁরা।

গেম অব ইলেভেন একটি ফ্যান্টাসি স্পোর্টস প্ল্যাটফর্ম। ফ্যান্টাসি স্পোর্টস সাধারণত অনলাইনে খেলা হয়। প্রথমে ক্রিকেট, ফুটবল বা অন্য কোনো খেলার ম্যাচের প্রকৃত খেলোয়াড়দের থেকে বেছে নিয়ে আপনার পছন্দমতো কাল্পনিক একটি দল গঠন করবেন। তারপর প্রকৃত ম্যাচটিতে খেলোয়াড়দের যে স্কোর হবে, সে অনুযায়ী আপনি পয়েন্ট অর্জন করবেন। ম্যাচে আপনার খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স যত ভালো হবে তত বেশি ফ্যান্টাসি পয়েন্ট। আর লিডারবোর্ডের ওপরে থাকলে টাকায় পুরস্কার তো আছেই।

বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক গ্লোবাল ফ্যান্টাসি স্পোর্টস ব্যবহারকারী রয়েছেন। গেম অব ইলেভেনের প্রতিষ্ঠাতা আশিফ, অনিক ও নাজমুল এই গ্রাহকদের দেশীয় এই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। বিশ্ববাজারের গ্রাহকদের জন্য বিশেষ কিছু সুবিধা তৈরি করে এবং ক্রীড়াসংক্রান্ত এনএফটি বিনিময়ের মাধ্যমে এই স্টার্টআপ অদূর ভবিষ্যতে সীমানার বাইরে সম্প্রসারণের অপেক্ষায় রয়েছে।

এয়ারওয়ার্ক আইবিএ গ্র্যাজুয়েট সায়েম করোনা অতিমারির কারণে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ৮৫ শতাংশ কর্মচারীকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ঘটনাটি তাঁকে দেশের চাকরির বাজার ও পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। তিনি উপলব্ধি করেন, প্রতিভাবান বাংলাদেশিদের এমন একটি প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন, যেখানে তাঁরা কেবল স্থানীয় চাকরি ক্ষেত্রেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়োগকর্তাদের কাছে নিজেদের তুলে ধরতে পারেন। এজন্য সায়েম ও সমমনা রাশেদ মিলে তৈরি করেন এয়ারওয়ার্ক; যে প্ল্যাটফর্মে বাছাই করা পেশাদার প্রযুক্তিবিদদের খুঁজে নিতে পারে দেশ-বিদেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠান। সায়েম বিশ্বাস করেন, আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ প্রযুক্তি প্রতিভা নিয়োগের জন্য একটি বড় গন্তব্যে পরিণত হবে।