আজ অনেকদিন হলো বউটা বাড়িতে নেই। সাথে আট বছরের খোকাটাও।
বিয়ের পর থেকে যদিও এই এদ্দিন অবধি তার বউটা কখনোই তেমন হাসিখুশি অন্য লোকদের বউগুলোর মতোন ছিল না, তবু তার মধ্যেই খোকাটা বেড়ে উঠল; একদম সুস্থ, চঞ্চল- অন্যদের খোকাগুলোর মতোই। সব সময় এটা-সেটা প্রশ্ন আর রংচটা ফুটবলটা নিয়ে সারাদিন ছোট ঘরটা আর ছ'ফুটের একটা উঠোনে দৌড়োদৌড়ি হট্টগোল করেই তার বেলা কেটে যায়। বাড়ির কাছের একটা সাধারণ স্কুলে তার পড়া চলে; স্কুলেরই একজন মাস্টারনি পড়া দেখিয়ে দিতে আসেন সন্ধ্যায়, মাস কাবারি ছ'শ টাকার চুক্তিতে।
হাসানউদ্দিন তার এনজিওতে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের দশ হাজার টাকা বেতনের চাকরি, বউ আর ছেলে নিয়ে টিনের ভাড়া বাড়ির একদম আটপৌরে এই জীবনটাতে আস্তে আস্তে এখন অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ছেলে যত বড় হয়ে উঠছে- জীবনযাপন নিয়ে হাসানউদ্দিনের খেদ, অপূর্ণতার বোধ তত যেন কমে আসছে দিন দিন। আজ সকালে গোসল সেরে ভিজে গামছাটা ভুল করে চেয়ারে জড়ো করে রেখে সে চলে গিয়েছিল অফিসে। ঘরে ফিরে গামছার চিমসে গন্ধটা তাড়াতে সেটা খাটের ফ্রেমে মেলে দিয়ে এসে বসতে বসতে সেই কবেকার কলেজ হোস্টেলের জীবনটা তার মনে পড়ল, কেন তা কে জানে? চাকরির বাজার টানটান জেনেও একটা সফল জীবনের স্বপ্টম্ন অন্য সবার মতো সেও দেখত। ভাবত, খপ করে একটা পরীক্ষা ভালো দিয়ে ফেলতে পারলেই তো সব সমস্যার সমাধান; কয়েকটা পরীক্ষা সে দিয়েছিলও ভালো। তবুও কেন যে ভালো থাকার ইচ্ছেগুলো পা হড়কে এদিক-সেদিক হয়ে গেল- সেই অঙ্ক হাসানউদ্দিন আজ অবধিও মেলাতে পারল না। অতঃপর আজকে একা ঘরে একটা বালিশ বগলের নিচে টেনে নিয়ে কাত হয়ে শুয়ে হাসান আবার তার এই জীবন নিয়ে তুষ্ট হয়ে উঠবার যুক্তিগুলো খুঁজে পেল। মনে মনে সে ভাবল- আমি তো একদম সামনের সারির কেউ ছিলাম না কখনও, ছাত্র হিসেবেও না; অল্প ক'দিন যে রাজনীতি করলাম তাতেও না। আমার তো সারা জীবন গড়পড়তাদের দলেই গড়াগড়ি, সেই হিসেবে তো ভালোই আছি। পরের প্রমোশনটা হয়ে গেলে! ... সে আরও ভাবল- এনজিওর ডিরেক্টর সাহেবদের তো এই রকম বালিশ বগলে করে ভাবনা চিন্তা করার সময় নেই। ডোনারদের মন রক্ষা, নতুন নতুন ফাঁকির কায়দা কৌশল আবিস্কার- তাদের জেগে থাকা তো এইসব ভেবে ভেবেই কাবার; তাদের ঘুম কেমন তা কে জানে। সেইসব গরিবের হক মারা উচ্চবিত্তদের তুলনায় তার এই নিরপদ্রব চাকরি-জীবন যে ঢের ঢের নিশ্চিন্ত আর নিরাপদ- এসব ভেবে মনে মনে খুশি হলো হাসান এবং একটু হাসল। শেষমেশ ছেলের কথা মনে পড়ল তার।
ছেলেটা বাড়ি থাকলে হয়তো এতক্ষণে বলত-
'আব্বু, বলো তো চার অক্ষরে একটা নদীর নাম, শেষের দু'অক্ষর মুছে দিলে চেটে খায়, আর প্রথম দু'অক্ষর মুছে দিলে একজনের নাম হয়, বলো তো কী?'
উত্তর দেবার কোনো সুযোগ না দিয়েই হয়তো বলে উঠত ... 'বলব, বলব! পারলে না তো তুমি! সেটা হলো মধুমতি।' বলেই ছাল ওঠা বলটাকে এক লাথিতে খাটের তলায় পাঠিয়ে দিয়ে দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে প্যানের ময়লা বেরিয়ে যাবার গহ্বরটা তাক করে পেশাব করতে থাকত শব্দ করে। ওর মা'টা তখন হয়ত বলত-
'নুন্তু ধুয়ে ফেলবে কিন্তু।'
বেরিয়েই 'আব্বু কই, আব্বু কই' করতে করতে বারান্দাটায় এসে হয়তো বলত-
'ও তুমি এইখানে, আচ্ছা বলো তো- বাগান থেকে বেরোল তুতে, ভাত ভরে দেলো মুইতে, এইটার মানে কী ?'
একা ঘরে ছেলেকে ভালো স্কুলে না পাঠাতে পারার দুঃখটা চাড়া দিয়ে উঠল হাসানের মনে। দামি স্কুলে যেতে পেলে খোকা হয়তো এমন করে কথা বলত না- হাসানউদ্দিন ভাবল। ঠিক তক্ষুনি নিজের ওপর রাগ হলো তার। প্রশ্নের উত্তরটা কী হতে পারে সেসবের দিকে হাসানউদ্দিন আর মন দিতে পারল না।
খোকা ততক্ষণে আবার হয়তো কথা বলা শুরু করেছে-
'এইটাও পারলে না তো! আচ্ছা ঠিক আছে, আমিই বলে দিচ্ছি। এইটার উত্তর হচ্ছে- লেবু, ভাত-ভরে মুতে দেওয়া মানে হলো লেবুর রস ... বুঝলে তো?'
বগলের বালিশটা বের করে মাথার নিচে এনে চিত হয়ে শুতেই রাতে খাওয়ার কথা মনে হলো হাসানের। তক্ষুনি মনে হলো স্টোভ জ্বালানোর হরকত না করে ঠান্ডা তরকারি ... তরকারি আর কী! ভাজি আর ডাল ... ডুমো ডুমো করে কাটা বেগুন-আলুর একটা ভাজি আর লম্বা ডাল। দুপুরের আগে তাদের ছুটা বুয়া মিলনের মা এসে রেঁধে রেখে গেছে। দুপুরে আর রাতে ঐ একতাতেই তার গর্ত পুজো। বউ বাড়ি না থাকলে যা হয় আরকি!
এবার বউয়ের মুখটা মনে এলো তার, পাতলা গড়নের লম্বা শ্যামলা মেয়েটার কিছুটা সাদামাটা বৈচিত্র্যহীন মুখ আর ঠান্ডামারা চালচলন মনে পড়ল অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের, যাকে তাতিয়ে তুলতে অনেকক্ষণ সময় লাগে। তবু যে দরকারের সময় হাতের কাছে পাওয়া যায়- এটুকুই সৌভাগ্য মানে হাসান। সর্দিগর্মির হোমিওপ্যাথিক ওষুধগুলো তার বউটা সারা বছর সাদা একটা কৌটোয় হাতের নাগালে রাখে। কী করে যেন আট বছর পর আবার এই পোয়াতি হয়েছে সে।
এ বারেরটা মেয়ে হবে মনে করতেই বছর দেড়েকের একটা নাদুস মতোন খুকি হাসানের বন্ধ হয়ে থাকা চোখ ছাড়িয়ে মনের জমিনে হাঁটতে থাকে থপথপ করে। ফুলো ফুলো গাল, মাথাভর্তি কোঁকড়ানো চুল ... কপালের কোনায় একটা কালো চাঁদ আঁকা, আদুল গায়ে তার দিকে তাকিয়ে সে যেন হাসছে।
হঠাৎ স্বপ্টম্নটা ভেঙে দিয়ে রান্নাঘরের তেজপাতা রাখা কৌটাটায় ধাক্কা মেরে একটা ছুঁচো দৌড়ে চলে যেতেই হাসানউদ্দিন আবার তার মধ্যবিত্ত জীবনটার মাঝখানে এসে দাঁড়াল- খালি পেটে। উঠে মিটসেফটা খুলে ভাতের গামলা, ভাজির বাটি আর ডালের হাঁড়িটা একে একে বের করে এনে পেতে রাখা পাটিটার সামনে রাখল সে, জগ গ্লাস আর নুনের বাটি আনল একসাথে, আসনগাড়া দিয়ে বসতেই হঠাৎ ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। চেনা জায়গা হাতড়ে কুপি আর দেশলাই আনতে হলেও সে অখুশি হলো না। অকৃত্রিম মধ্যবিত্তদের মতো ধৈর্য নিয়ে খেতে বসে গেল, ভাজিটা গালে মজা লাগতেই সব ভুলে ভাত তরকারিতে ধ্যানস্থ হলো সে। আর মনে মনে ভাবল খাওয়া হয়ে গেলে হেঁটে মোড়ের দোকানটা থেকে সে একটা পান খাবে আজ। মফস্বলের প্রায় নির্জন একটা এলাকায় একলা বাসায় থাকা মানুষদের চিন্তাগুলো যত দ্রুত পাল্টে পাল্টে আসে- তাতে যেন চিন্তাগুলোও মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কাল সকালে বাজারে যেতে হবে মনে করতেই সারাদিনে এই প্রথম বিরক্ত হলো হাসান।
ওদিকে ফরিদপুর সদর পোস্টাফিসের সিনিয়র ক্লার্ক একজন বাবার বড়-মেয়ে বুলু ছেলে-স্বামীসহ বাড়িতে এসে পৌঁছাতেই বাড়িটাতে আনন্দের এক হলকা বাতাস বয়ে গেল। অনেক দিন পর আবার পোয়াতি হওয়া মেয়ে, দস্যি নাতি, এসব পেয়ে বাড়ির মা'টা একটা বোন, একটা ছোট ভাই আর জামাইয়ের সামনে অকারণে লজ্জা পাওয়া বাড়ির বড় কর্তা সবাই খুশি হয়ে উঠল। পরদিন ফিরে আসার সময় বুলু হাসানকে বলল-
'চৌদ্দ তারিখ থেকে ছুটি নিও। এর মধ্যে কিছু না হয়ে গেলে ষোল তারিখ যাব সূর্যের হাসিতে; মা সব ঠিক করে রেখেছে। আর তুমি যেয়েই ঠিকমতো ডিপিএস-টা জমা দিও।'
মেয়ে পেটে থাকলে নাকি মায়েরা সুন্দর হয়। খুব সুন্দর লাগল বউটাকে আজ অনেকদিন পর। হাসান আরও খেয়াল করল, সেই অসুখে ভাবটা আর নেই বউটার চোখেমুখে। খালার বুকের সাথে লেপ্টে থাকা খোকাটাকে ডেকে হাসানউদ্দিন বলল-
'বাবা কাউকে জ্বালাবে না কিন্তু।'
আবার বউটার দিকে চাইতেই তার চোখে চৌদ্দ তারিখে আসার জন্য অনুনয় আর আকাঙ্ক্ষা দেখতে পেয়ে খুশি মনে হাসান তাদের নিজেদের ঘরটায় ফিরবার গাড়িতে চড়ে বসল।
আজ এই একলা রাতে ভাত খেয়ে পানের দোকানটার দিকে যেতে যেতে হাসান দেখল রাস্তার দু'ধারের ফাঁকা জায়গাগুলোয় আকন্দ আর ডুমুর গাছের বড় বড় পাতার তলায়, টুকরো টুকরো ছায়া বাতাসে নড়েচড়ে ছোট বড় হচ্ছে। দোকানগুলোর সামনের মহাসড়কে রাত্রিচারী বড় বড় বাসগাড়ি মাল আর মানুষে পেটভর্তি করে গোঁ গোঁ করে ছুটে চলে যাচ্ছে অনেকক্ষণ বাদে বাদে। দূরে দূরে কটা বাঁশের খুঁটিতে টাঙানো কম পাওয়ারের বাল্ক্বগুলো জন্ডিস রোগীর চোখের মতো লালে-হলুদে জ্বলে রয়েছে। বড় শহরগুলোতে সন্ধ্যার পর রাত যেমন অনেকক্ষণ আটকে থাকে, এদিকে এই মফস্বলে তেমন থাকে না। এখানে সন্ধ্যার পরপরই রাত হয়।
দোকান থেকে ফিরবার পথের মাঝখানে মানুষের জন্য খুবই অপমানজনক ভঙ্গিতে হোঁতকা একটা শেয়াল হাসানের সামনে দিয়ে হেলেদুলে রাস্তা পার হয়ে চলে গেল।
প্রথমবার পানের পিক ফেলে জর্দার তবক কমিয়ে নিয়ে চিবুতে চিবুতে ঘরে ফিরে এলো সে। বউটার ঢাউস পেট, ভারী হয়ে ওঠা বুক আর আসন্ন সন্তান সম্ভাবনার কৃতিত্বে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা চোখজোড়া মনে পড়ল তার। রাজৈরে থাকলে খোকা ঘুমিয়ে পড়ে এ সময়ে, ফরিদপুরের খোকা এখনও ঘুমায়নি, হাসান জানে।
হাসানের ম্যানেজার সাহেব অনেক দিন ধরে ঢাকার দিকে ট্রান্সফার নিতে ব্যাকুল। সেই ব্যাটার মনোবাসনা পূরণের জন্য হাসান দোয়া করল মনে মনে ... নিজের স্বার্থেই। ম্যানেজার হতে পারলে হাজার পাঁচেকের বেতন বৃদ্ধি আর বলার মতো একটা জুতসই পরিচয়ের লোভে। জীবন বীমার দালালরা যেসব কারণে তাদের গ্রাহকদের ভালো থাকা কামনা করে, অনেকটা যেন সেই রকম।
চৌদ্দ তারিখে তিন দিনের ছুটি নিয়ে হাজার দশেক টাকা পকেটে ফেলে হাসান ফরিদপুরের বাস ধরে। তাড়াতাড়ি বউ আর খোকাকে দেখতে পাওয়ার কামনা তার এবারের রাস্তাটাকে যেন লম্বা করে ফেলেছে। সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে সবাইকে ভালো দেখতে পেল হাসান। বুলুর মুখটা একটু যেন ফোলা ফোলা বিশেষ করে চোখ দুটো। বউটা বলল-
'রাত্তিরে ঘুম হয়নি বাদবাকি সব ভালো। ক'দিনের ছুটি হলো? ডিপিএস-টা দিয়েছ তো? বাবু গিয়েছে তার নানুর সাথে আমার জন্য একটা ম্যাক্সি কিনতে, কেমন ছিলে এ ক'দিন।'
'এত কথার জবাব একসাথে কীভাবে দেব'
বলে হাসান হাসল। বলল- 'ভালোই তো ছিলাম, তো কী ঠিক করলে? সূর্যের হাসিতেই যাবে?'
'হ্যাঁ, খেয়েদেয়ে দুপুরের পর। সব ঠিক করা আছে। তুমি লুঙ্গি পরে হাতমুখ ধোও, মা সুজি করেছে তোমার জন্য।'
সবাই জানে এ বাড়ির মায়ের হাতের সুজির হালুয়া খুব পছন্দ হাসানের, বুলুও চেষ্টা করে একটু বেশি করে ভেজে নিয়ে মা'র মতো করে রাঁধতে। কখনও হয়, কখনও হয় না।
কবে যেন মা বুলুকে বলেছিলেন- 'রান্নাটা হলো গিয়ে খানিকটে লেখাপড়ার মতোন, মন না দিলি কিচ্ছু হয় না।'
বুলবুলির মনে পড়ে।
সুজি-পরোটা খেয়ে আর বউটাকে হাসিখুশি দেখে হাসান খুশি হয়ে উঠল। এর মধ্যে হইহই করতে করতে নানুর সাথে বাজার থেকে খোকা ফিরে এলো। কটা সাবান, একটা ম্যাক্সির প্যাকেট- এইসব তার হাতে। নানুটার হাতে একটা মুরগি আর সবজির বড় ব্যাগটা। খোকাটা একটা লজেন্স চুষছে। সবাই চোখের আড়াল হতেই হাসান বউটার পেটের ওপর হাত রাখল। বউটা ঘন হয়ে গায়ের কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল- 'তোমার ছেলে কী বলে জানো!'
'কী বলে?'-
হাসান ঔৎসুক্যভরা চোখে জানতে চাইল।
'সে নাকি বাবু হওয়া দেখবে, কত্তো বড় পাজি একবার ভাবো!'
হাসান আশ্চর্য হয়ে দেখতে লাগল- এই অসুস্থতাটুকুর মধ্যেও বুলু কেমন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। কারণ-টারণ সে হাতড়ে পেল না। বউটাকে তার ধরতে ইচ্ছে হলো। সে মনে মনে ভাবল, রাজৈরের নির্জনতাই কি বউটাকে এতকাল মনমরা করে রেখেছিল, তাকে ম্রিয়মাণ করে ফেলেছিল আস্তে আস্তে!
হাসান ভাবল, এটা তার ভেবে দেখা উচিত ছিল। তবে এটাও ঠিক যে, কোনো নির্দিষ্ট মানুষের জন্য নির্দিষ্ট কোনো কিছু চিরকাল প্রয়োজনের থাকে না। নির্জনতার চাপে মেয়েটা কোণঠাসা হয়ে পড়লেও এই নির্জনতাটুকুই হয়তো আবার কতজনের আরোগ্যের কারণ হয়ে উঠতে পারে। ভালো বা মন্দ নয়, জীবন আসলে অদ্ভুত!
কোথা থেকে যেন, খানিকটা দার্শনিকতা এসে ভর করল হাসানের ওপর।
এতক্ষণে সদ্য বড় হয়ে ওঠা শালিটা ঘরে এস ঢুকল, বড় হওয়ার জন্য একটু যেন লজ্জা তার। বলল-
'মুড়ি মাখব? খাবেন? ও দুলাভাই।'
'ও তুলি মাখ না রে, আমিও একটু খাই। এট্টু ঝাল বেশি দিস'-
বুলু বলল।
অকারণে একটু কুঁজো হয়ে দুই বাহুতে বুকটা আড়াল করে তুলি বেরিয়ে গেল মুড়ি মাখতে।
সবকিছু সবার প্রত্যাশামতো ঘটল রাত দশটায়। ছয় পাউন্ডের খুকিটা জন্মেই চিল্লাপাল্লা শুরু করল ত্রাহি-স্বরে। সাড়ে দশটায় কাপড় জড়িয়ে লেবার রুম থেকে তাকে বের করে আনল তুলি। ওড়না যে তার গলায় বেঁধে থেকে পিঠের দিকে ঝুলছে তা আর তার মনে থাকল না। আর আশ্চর্যজনকভাবে খুব তাড়াতাড়ি সেরে উঠতে লাগল বুলবুলি ওরফে বুলু।
এক মাস দশ দিনের মাথায় ফরিদপুরের সবাই মিলে যখন বুলুকে পৌঁছে দিতে এলো, ছোট্ট মেয়েটা ততদিনে ফালুক ফুলুক চাইতে শিখেছে। আর বউটা এতদিনে একটু যেন মুটিয়েছে, হাসান মনে মনে ঠিক যেমনটা তাকে চাইত।
ফরিদপুরের সবাই ফিরে গেলে, এক ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে বুলু যেন এ পৃথিবীর সব থেকে ব্যস্ত, প্রাণবন্ত, সুখী আর স্বাস্থ্যবতী একজন বুলবুলি হয়ে উঠল এবং কয়েকদিনের মধ্যেই হাসানের ম্যানেজার সাহেব তার বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত ট্রান্সফার অর্ডারটা হাতে পেলেন।
হাসান ভাবল, ছোট্ট মেয়েটা কি তার প্রমোশনের চিঠিটা হাতে বয়ে আনল! বাবার জন্য অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার থেকে ম্যানেজার হবার আনন্দ তার কোঁকড়া চুলের কোন ভাঁজে গোঁজা ছিল, কে জানে!
কই হাসান তো দ্যাখেনি!

বিষয় : গল্প ফিরোজ আহমদ

মন্তব্য করুন