চেরাগী পাহাড় মোড়। জড়ো হলো ১৫-২০ জনের একটা দল। সবার কাঁধে ঝুলছে ক্যামেরা। লেখক-সাংবাদিকদের তীর্থস্থান চেরাগী। রাস্তার দুই পাশে রয়েছে ফুলের দোকান। আশপাশে কী আছে, কতদূর যাবেন, কতক্ষণ থাকবেন, কয়টায় শেষ হবে- এসব নিয়ে একজন সংক্ষিপ্ত করে ব্রিফ দিলেন। শুরু হলো ক্যামেরা হাতে ঘোরাঘুরি। এদিক থেকে ওদিক।

কেউ হকারের ছবি তুলতে ব্যস্ত, কেউ ক্যামেরা তাক করেছেন ফুলের দোকানের দিকে। ওদিকে একজন খুব কসরত করে মনের মতো একটা ফ্রেম পেয়েছেন বলে হাসি এ কান-ও কান হয়েছে।

ক্যামেরা হাতে দেখে এরই মধ্যে কেউ কেউ হয়তো তাঁদের সাংবাদিক ভেবে বসলেন; কাছে এসে গড়গড় করে বলতে শুরু করলেন নানা সমস্যার কথা। কেউবা এগিয়ে এসে আবদার করেন, 'একটা ছবি তুলে দেবেন প্লিজ!' চাটগাঁর ছবিয়ালের সদস্যদের এমন অভিজ্ঞতা হয় হরহামেশাই।

কেবল চেরাগী নয়; কালুরঘাট, বটতলী রেলওয়ে স্টেশন, রিয়াজউদ্দিন বাজার, সিআরবি, ফিশারি ঘাটসহ চট্টগ্রামের যে কোনো জায়গায় হঠাৎ কখনও আপনার দেখা হয়ে যেতে পারে এই ছবিয়াল দলটির সঙ্গে।

২০১৭ সালে যাত্রা করা সংগঠনটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গ্রুপে মোট সদস্য সংখ্যা আট হাজারেরও বেশি। সদস্যদের জন্য সারাবছর নানা আয়োজন থাকে সংগঠনের পক্ষ থেকে। কেমন আয়োজন? 'নিয়মিত ফটোগ্রাফিবিষয়ক কর্মশালা, ফটো আড্ডা, আর্টিস টক, ফটোওয়াক, ফটো এক্সিবিশন হয় বললেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রুবেল।


ফটো আড্ডা বা ফটো ওয়াক ব্যাপারগুলো কী, সেটা বুঝতে চেষ্টা করি সংগঠনের আরেক সিনিয়র সদস্য মনোজ কুমার দে থেকে। জানা গেল, সুযোগ পেলেই তাঁরা দলবেঁধে ছবি তুলতে বের হন। এই আয়োজনই ফটোওয়াক। চেনা শহরটাকেও যে কত ভিন্ন ভিন্ন চোখে দেখা যায়, সেই প্রমাণই মেলে এই 'ছবি হণ্টন' থেকে। একই জায়গা অথচ একেকজন ছবিয়ালের ক্যামেরায় ফুটে ওঠে একেক রূপ। সাধারণ মানুষ হয়তো সব সময় এই পথে হাটে, এই চেরাগী চত্বরে আড্ডা দেয়, কিন্তু এই জায়গা একজন ছবিয়াল তাঁর তৃতীয় চোখে দেখেন ভিন্নরূপে; ফটো আড্ডায় আলাপ হয় নিজেদের তোলা ছবিগুলো নিয়ে। ভুল করলে সমালোচনা হয়, ভালো করলে সবাই পিঠ চাপড়ে দেন। আড্ডায় অভিজ্ঞরা নিজেদের মতো করে দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেন।

এসব কার্যক্রমের ফলও হাতেনাতে পাচ্ছেন চাটগাঁর ছবিয়ালের সদস্যরা। সংগঠনের সভাপতি মইন চৌধুরী অর্জনের কথা বলতে গিয়ে বেশ কয়েকটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার নাম বললেন। জানালেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কারসহ অনেক অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন তাঁদের সদস্যরা। এর মধ্যে রয়েছে- ডেইলি স্টার সেলিব্রেশন লাইফ অ্যাওয়ার্ড ২০১৮, লন্ডন স্ট্রিট ফটো অ্যাওয়ার্ড ২০১৯, দোহা ইয়ুথ ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড ২০২০, ইউনিসেফ মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড ২০২১। ৩০টিরও বেশি দেশে প্রদর্শিত হয়েছে এ দলের সদস্যদের ছবি।

কিন্তু এত কিছুর লক্ষ্যটা আসলে কী? সংগঠনের সিনিয়র সদস্য সাইফুল ইসলাম শিপু বলেন, 'তরুণদের কাছে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ফটোগ্রাফি। ক্যামেরায় ক্লিক করে সময়কে ধরে রাখার এই অভিনব পদ্ধতি আজকের অনেক তরুণকেই বানিয়ে তুলছে শৌখিন থেকে প্রফেশনাল ছবিয়াল। ছবি তুলতে হলে ভালোবাসাটা জরুরি। ছবির জন্য আপনার ভালোবাসা থাকলে এ পথে আপনি সহজেই এগোতে পারবেন। তরুণ ছবিয়ালের মাঝে সেই ভালোবাসাটা ঢুকিয়ে দিতে চাই; চাই তাঁদের উৎসাহিত করতে এবং যাঁরা নতুন ফটোগ্রাফিতে আসতে চান, তাঁদের সঠিকভাবে গাইডলাইন দেওয়া। ফটোগ্রাফি এক শক্তিশালী মাধ্যম। হাজারো শব্দের গল্প একটি ছবিতে বলা যায়। তাই এর মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি সমাজ বিনির্মাণে কাজ করতে ও তুলে ধরতে চাই বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের এই বাংলাদেশকে। এই লক্ষ্যেই কাজ করছে চাটগাঁর ছবিয়াল।'

বিষয় : ছবিয়াল

মন্তব্য করুন