১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন থেকেই সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি ও জানি। ৬ দফা আন্দোলনে সামনের সারিতে না থাকলেও পেছন থেকে সমথর্ন দিয়েছেন তিনি। তাঁর সক্রিয় সহায়তা আন্দোলনকে গতি দিয়েছে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময়ও আমরা একসঙ্গে আন্দোলন করেছি। বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর যে নির্বাচন হয়, সেখানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর বিরাট ভূমিকা ছিল। তিনি নারীদের জন্য আলাদা ক্যাম্প তৈরি করেন। সেখানে আহত নারী মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নার্সিং ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় উপস্থিতির মাধ্যমে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে বলা হয় দলের দুর্দিনের কাণ্ডারি। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর সাজেদা চৌধুরী আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৬ সালে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। '৭৫-পরবর্তী কঠিন সময়ে তিনি সাহসী ভূমিকা পালন করেন। জিয়া ও এরশাদের দীর্ঘ সামরিক ও স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে থেকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবনে ১৯৫৬ সাল থেকে সাজেদা চৌধুরী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। ১৯৬৯-৭৫ সময়ে তিনি বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে কলকাতার গোবরা নার্সিং ক্যাম্পের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন তিনি। দেশ স্বাধীনের পর নারীদের সংগঠিত করেন। মহিলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে তাঁর নেতৃত্বে মহিলা আওয়ামী লীগ নতুন মাত্রা পায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর সাজেদা চৌধুরী আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক হন। সে সময় তিনি দলের জন্য সাহসী ভূমিকা রাখেন। আওয়ামী লীগের নিবন্ধন নেওয়ার সময় জিয়াউর রহমান বললেন- দলের ইশতেহারে বঙ্গবন্ধুর নাম থাকলে নিবন্ধন দেওয়া হবে না। সাজেদা চৌধুরী পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছেন- বঙ্গবন্ধুর নাম বাদ দিয়ে নিবন্ধন নেবেন না। এ বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বেশ কিছুদিন কারা নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল তাঁকে, কিন্তু নীতির প্রশ্নে আপস করেননি। তিনি দুর্দিনে সহায়ক শক্তি হিসেবে দল ও জাতির জন্য কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছিলেন; আমৃত্যু সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।
১৯৭২-৭৫ সময়ে বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন বোর্ডের পরিচালক, ১৯৭২-৭৬ সময়ে বাংলাদেশ গার্ল গাইডসের ন্যাশনাল কমিশনার এবং বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৭৬ সালে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ থেকে '৯২ সাল পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯২ সাল থেকে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রদত্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি বন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা, সালথা ও সদরপুর) থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নবম সংসদ নির্বাচনে সাজেদা চৌধুরী এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ২০০৯ সালে তিনি জাতীয় সংসদের উপনেতা হন। এর পর থেকে পরপর তিনবার জাতীয় সংসদের উপনেতার দায়িত্ব পান তিনি।
১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে আসার পর অনেক বিপর্যয় মোকাবিলা করতে হয়েছে। সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী সব সময় ছায়ার মতো তাঁর পাশে ছিলেন। বিপদ-আপদে অকৃত্রিম বন্ধু হয়ে দল ও জাতির প্রয়োজনে কাজ করে গেছেন।
আবদুর রাজ্জাক বাকশাল গঠন করে দল ছেড়ে গেলে আওয়ামী লীগের ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক থেকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হন সাজেদা চৌধুরী। সে সময় তিনি আবদুর রাজ্জাকের ওই তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যথাযথ ভূমিকা পালন করেছেন। বাকশাল পুনরুজ্জীবিত করে বঙ্গবন্ধুর শেষ ইচ্ছা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়েছিল। এটা ঠিক ছলনা। এ সময় সাজেদা চৌধুরীর
বক্তব্য ছিল সুস্পষ্ট। শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ নামেই দলের দায়িত্ব নিয়েছেন। এত দেরিতে এসে রাজ্জাক সাহেব বাকশালের কথা বলবেন কেন?
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কঠিন মুহূর্তগুলোতে এবং দেশের সব গণতান্ত্রিক ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশে থেকেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে সব সময় ফুফু বলে শ্রদ্ধা করতেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁকে শ্রদ্ধার জায়গায় রেখেছিলেন। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক থেকে সম্মেলনের মাধ্যমে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর সময় থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার সঙ্গেও আপসহীন নেতা হিসেবে অবিচল ছিলেন।
শেখ হাসিনাকে গৃহবন্দি করা হয়েছে। তাঁকে বারবার প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়েছে। এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে সব সময় দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন সাজেদা চৌধুরী।
রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী স্লোগান দিয়ে বক্তৃতা শেষ করতেন। তিনি মঞ্চ থেকেই স্লোগান দিতেন এবং উপস্থিত জনগণকে উজ্জীবিত করতে পারতেন। জনগণের উদ্দেশে তিনি জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিতেন। তাঁর স্লোগানের সঙ্গে উপস্থিত জনতাও সাড়া দিত। মানুষকে উজ্জীবিত করার এক অসাধারণ গুণ ছিল সাজেদা চৌধুরীর।
আমি ব্যক্তিগতভাবে সাজেদা চৌধুরীর কাছে কৃতজ্ঞ। আমার স্ত্রী যখন সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন, তখন তিনি নিজে তিন-চারবার সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন। আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। আমার স্ত্রীর মৃত্যুর পর যত মিলাদ মাহফিল হয়েছে, সব জায়গায় তিনি অংশ নিয়েছেন। তাঁর যে স্নেহ পেয়েছি, তা কোনোদিন ভুলতে পারব না। তাঁর মৃত্যুতে শুধু আওয়ামী লীগ একজন পরীক্ষিত নেতাকেই হারায়নি; দেশ হারিয়েছে একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিককে। আমি তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং পরিবারের শোকাহত সদস্যদের সমবেদনা জানাচ্ছি।
আমির হোসেন আমু :সংসদ সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ