শেভনিং বৃত্তি পেয়ে প্রথমে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলাম। দুয়েক দিন ছিলাম ঘোরগ্রস্ত। দাদির সুরক্ষিত কৌটায় নাবিক দাদাজানের চিঠি আর রুপার টাকায় ব্রিটিশ রাজার ছবি দেখেছিলাম একদম ছোট্টবেলায়। কথক দাদির পান-খাওয়া মুখে বিলেতের রাজরাজড়ার বিচিত্র গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম। প্রেমিকার জন্য সিংহাসনত্যাগী এক বোকা রাজার জন্য শিশু বয়সে আক্ষেপও হতো খুব। কিছুটা বড় হয়ে বিলেতি আইন আর সাহিত্য পড়েছি বিভোর হয়ে। এবার রাজকীয় মুকুট আঁটা বৃত্তির কাগজ হাতে পেয়ে গায়ে চিমটি কাটি- সত্যিই বিলেত যাচ্ছি! দাপ্তরিক কিছু আনুষ্ঠানিকতা সেরে একদিন আল্লাহ-রসুলের নাম, মা-বাবার দোয়া, সদ্য কেনা সুটকেস, উৎসুক মন আর ক্লান্তির পাহাড় নিয়ে হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছলাম। এই আমার প্রথম বিলেত যাত্রা। নির্বিঘ্নে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হবার পর ব্রিটিশ কাউন্সিলের এক কৃষ্ণবর্ণ কর্মকর্তা উৎকট-গম্ভীর হয়ে বাম হাতে খসখস করে কী যেন লিখলেন। এরপর আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন বেশ কিছু পাউন্ড। লন্ডনে থিতু হবার প্রাথমিক ভাতা। ভদ্রলোক শুভাশিস জানিয়ে বিদায় নিলে চকচকে নোটগুলো শুঁকে ভাবলাম, এই প্রৌঢ় ব্যাটার বদলে নীলাভ চোখের এক স্বর্ণকেশী তরুণী এলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত?
ব্রিটিশ পাউন্ডে অঙ্কিত রানী এলিজাবেথই হলেন প্রথম সফেদ মেম; যিনি পাতলা ঠোঁটে স্মিত হেসে আমাকে বিলেতে সাদর সম্ভাষণ জানিয়েছিলেন। হোক না কাগজে মুদ্রিত, প্রথম দর্শনের ভালোবাসা বলে একটা কথা আছে না- হার এক্সেলেন্সি কুইনকে কুর্নিশ করে বিমানবন্দরের বাইরে পা বাড়ালাম।
মনে পড়ে, এই রাজমুকুটের দেশে এসে প্রথম কদিন শুয়ে-বসে কাটালাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগদানের কিছু পর এক দুপুরে ব্রিটিশ সহপাঠী এমিকে নিয়ে ঘুরতে এসেছি মধ্য লন্ডনের সেন্ট জেমস পার্কে। ছায়াময় প্রাঙ্গণে বুড়ো বুড়ো ছায়াতরু। নিরিবিলি দেখে এক ওক গাছের গোড়ায় বসে ব্রিটিশ তন্বী মিটিমিটি হেসে বৃদ্ধা-তর্জনী-অনামিকার ছোঁয়ায় বাদামের ভোজ সাজায়। ভোজবাজির মতো চকিতেই কালচে গাছের গা বেয়ে কাঠবিড়ালিরা চিঁ চিঁ করে দৌড়ে আসে, হইচই করে চিনাবাদামে হামলে পড়ে। আহার সাঙ্গ হলে এরা মোটা লেজ উঁচু করে ঝোপের দিকে পালিয়ে যায়। প্রাণময় সবুজ চত্বরে বসে লক্ষ্য করলাম, একটা ত্যাড়াব্যাড়া গাছের ডালে কয়েকটা বড়সড় পাখি আপনি নাচে। এদের নাম ম্যাগপাই। সহপাঠীর কাছে জানলাম, বিচিত্র উপকথা চালু আছে এই বিহঙ্গ নিয়ে। খ্রিষ্টীয় পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, এই শাদা-কালো বিহঙ্গ নাকি নুহ নবীর কিস্তিতে না উঠে অভিশপ্ত হয়ে পড়ে। তাই সনাতনী মানুষজন ম্যাগপাই দেখলেই নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করত, এমনকি খুন করত। পাখি তাড়াতে নিজ বাড়ি বা খামারের পাশে কাকতাড়ূয়া বানিয়ে রাখত। এই বিপন্ন ম্যাগপাইকে বাঁচাতে পঞ্চদশ শতকে এক রাজকবি কৌশলে রচনা করলেন এক অপূর্ব ছড়া- 'ওয়ান ফর সরো, টু ফর জয়'।
কারণ, এই পাখি কখনও একা থাকে না। যুগল ম্যাগপাই মানেই আনন্দের বারতা।
কিন্তু জটাধারী উইপিং উইলো গাছকে দেখায় বিষণ্ণ, সাধু-সন্ন্যাসীর ন্যায়। জীর্ণ সেতুর পাশে হর্সনাট গাছ দাঁড়িয়ে আছে উদ্ধত হয়ে। বামুনাকৃতি বার্চ গাছের ডালে নানান কিসিমের পাখপাখালির হল্লা। প্রাণময় ঝোপের দিকে মৃদু বাতাস বয়। মালবেরি গাছের ওপাশটায় ফলভারে আনত বেরি গাছ। সারবন্দি বনস্পতির ঘন পল্লব মিলে এদিকে মায়াবী ছায়াতপ তৈরি করেছে। একটা জবুথবু ডুমুর গাছ দেখে এক পথিক বুড়ি বুকে ক্রুশ এঁকে প্রণতি জানাল। উড়ে এসে ছাইরঙা দাঁড়কাক ঠোকর দেয় লালচে ডুমুরে। এমির কাছে জানলাম, এটি বিলেতের সবচেয়ে পুরোনো ডুমুর গাছ। খসখসে কাণ্ডের এই বৃক্ষকে ঘিরেও নাকি অনেক রহস্যময়তা চালু আছে। আমি বললাম, তাওরাত, ইঞ্জিল ও কোরআনে ডুমুর গাছের উল্লেখ রয়েছে। আদিপিতা আদম ও মা হাওয়া নিষিদ্ধ গন্দম খেয়ে লজ্জাতুর হয়ে যথাক্রমে তিনটি ও পাঁচটি ডুমুরপল্লব দিয়ে আব্রু ঢেকেছিলেন। বৌদ্ধ ভিক্ষু জ্যোতিঃপাল মহাথেরোর কাছে একান্তে শুনেছিলাম, গৌতম বুদ্ধ নির্জন তপোবনে সাধনার সময় শুধু ডুমুর ঝরনার জল খেয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করতেন। নিয়মিত ডুমুর খেলে শরীর-মন প্রফুল্ল থাকে। এমি চোখ স্থির করে আমার দেওয়া তথ্য ঝালিয়ে নেয়-
ইজ ইট ট্রু?
আমি হ্যাঁ সূচক মাথা ঝুঁকলে সহপাঠী ঘোষণা দিয়ে বসল-
বিষাদ কাটাতে এখন থেকে নিয়মিত ডুমুর ফল খাব। আমি হেসে বললাম-
খুব একটা দরকার নেই। তুমি এমনিতেই প্রফুল্ল।
রীতিমতো হাসির ফোয়ারা। সহপাঠিনী খিলখিল করে হাসে। লতাপাতার ফাঁক গলে সূর্যও হাসে আপনমনে।
রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন অনিন্দ্যসুন্দর সেন্ট জেমস পার্ক।
এই রাজ-অতিথির বাদামি হাত ধরে গোরা সহপাঠী আবার সামনে এগোয়। এই রাজকীয় উদ্যান থেকে পাথরছোড়া দূরত্বে রানীর বাসস্থান বাকিংহাম প্যালেস। রাজকীয় এই প্রাসাদটিই এলিজাবেথের কর্মস্থলও। বেশ কিছু মনোহর মর্মর ভাস্কর্য চোখে পড়ল আশপাশে। রোদঝলমলে গেট দিয়ে অকুস্থলে প্রবেশ করতে গিয়ে দেখি শালপ্রাংশু প্রহরীরা ঠায় দাঁড়িয়ে। মসৃণ রাজপ্রাঙ্গণ লাগোয়া ছোপ ছোপ হলদেটে-সবুজের প্লাবন আর বর্ণাঢ্য ফুলের নকশা। রাজ-উদ্যানে দাঁড়িয়ে আছে বীথিবদ্ধ বনস্পতি। একটু আগে খানিকক্ষণ বৃষ্টি হয়েছিল বলে মাঠের ঘাস-লতাপাতাকে দেখায় গাঢ় সবুজ। মেঘহীন আকাশে এখন ঝলমলে নীলাভ আভা। একটু এগিয়ে গিয়ে দৃষ্টি মেলে দেখি, মূল প্যালেসের মস্তক ছুঁয়ে বর্ণিল রংধনু ছড়িয়ে পড়েছে দিগন্তের কোলে। আমার অনুসন্ধিৎসু প্রশ্নে ব্রিটিশ তন্বী ওষ্ঠে হাসি এঁকে ঢেউখেলানো উচ্চারণে খুচরো জবাব দেয়-
মহামান্য রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথই ব্রিটিশ সার্বভৌমত্বের প্রতীক। একাদশ শতাব্দী থেকে নরম্যানদের ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড অধিগ্রহণের মাধ্যমেই এই রাজতন্ত্রের সূচনা। ব্রিটিশ রাজা প্রথম হেনরি চার্টারের মাধ্যমে প্রজাদেরকে আশ্বস্ত করলেন, কিছু ব্যতিক্রম বাদে গুরুতর সাজা বা অপরিমেয় ট্যাক্স আরোপ নয়। এরপর রাজমসনদ ঘিরে কত অশ্রুবিয়োগ, রক্তপাত, বারুদের ঝনঝনানি আর গুজব। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে কত পালাবদল। কয়েক শতাব্দী ধরে ব্রিটিশ রাজসিংহাসন নিয়ে খণ্ড খণ্ড রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও হয়েছিল অজস্র। কারণ, বিজয়ী রাজাই ছিলেন সর্বময় ক্ষমতার প্রতীক। রাজকীয় ফরমানেই জারি হতো সব আইনকানুন। রাজাকে মনে করা হতো প্রভুর প্রতিনিধি- দৈব ক্ষমতার উৎস। সেজন্য ঈশ্বর ছাড়া রাজা কারও কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন। স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের নিরঙ্কুুশ ক্ষমতা কিছুটা খর্ব করে একসময় আইনের শাসনের সূতিকাগার রচিত হলো বিভিন্ন চুক্তি আর প্রথার মিশেলে। ১৭০৭ সাল থেকে ব্রিটেনের রাজা বা রানী মূলত সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের এক মায়াবী পালক। রাষ্ট্রাচারে শীর্ষ ব্যক্তি রানী। তবে কালের পরিক্রমায় টনি এখন ঠুঁটো জগন্নাথ। তবু হাজার বছরের রাজতন্ত্র বলে কথা। সবাই রানীকে প্রচ সম্মানই করে। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত প্রতি মঙ্গলবার মাথা ঝুঁকে সালাম জানিয়ে রানীকে রাষ্ট্রের হালহকিকত জানিয়ে যান।
প্রজাহিতৈষী রানী এলিজাবেথের পছন্দ রঙিন পোশাক। আনুষ্ঠানিক আয়োজনে সফেদ হাতমোজা পরে থাকা কুইন গোলাপি, নীল, লাল, সবুজ, ম্যাজেন্টা, বেগুনি, গাঢ় হলুদ বা এরূপ কোনো উজ্জ্বল গাউন পরে থাকেন। রাজমুকুট ছাড়াও রানী হরহামেশা গাউনের সাথে মিলিয়ে বাহারি সব হ্যাট পরতে পছন্দ করেন। অনেক সময় হ্যাটে গেঁথে রাখেন গোলাপ বা পারিজাতের মতো বড়সড় ফুল। অফিসিয়াল তথ্যমতে, স্টাইলিশ রানী এ পর্যন্ত অর্ধলক্ষাধিক টুপি পরেছেন। কখনওবা টুপির সাথে মিলিয়ে নানান কিসিমের পালক। স্টাইলিশ রানীর আরেকটা ট্রেডমার্ক হাতব্যাগ। এ নিয়েও আছে তেলেসমাতি। যেমন- রানী তাঁর পার্স টেবিলের ওপর রাখলেন। এর অর্থ তিনি শিগগিরই ভোজ সমাপ্ত করবেন। আর সঙ্গে সঙ্গে সবাই খাবার গ্রহণের সমাপ্তি টানবে। কুইন যদি ব্যাগ ফ্লোরে রাখেন, এর মানে তিনি সহসা প্রস্থান করবেন। বিভিন্ন আয়োজনে হাজির হয়ে মিহি ঠোঁটে হাসি এঁকে তিনি বনেদি স্বরে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য প্রদান করেন। রানীর ভাষাশৈলী ঝরঝরে, তবে অভিজাত। এমির কথা শুনে আবারও তাজ্জব হওয়ার পালা। পাক্কা সাত দশক ধরে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ঝাণ্ডা উঁচু করে বয়ে বেড়ানো রানী নাকি প্রাতিষ্ঠানিক স্কুল-কলেজে কোনোদিন পড়েননি! আমার একদমই বিশ্বাস হয়নি বিড়ালাক্ষী এই তরুণীর কথা। আমি প্রশ্ন করলাম-
তা কীভাবে সম্ভব? এমি বলল-
প্রিন্সেস এলিজাবেথ বাকিংহাম প্যালেসে বিশ্ববিখ্যাত সব গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে নিবিড় জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন ছিলেন।
আমি কৌতুকস্বরে বললাম-
ভালোই হয়েছে, তরুণী রাজকুমারীকে কোনো হতচ্ছাড়া সহপাঠীর সঙ্গে এক বেঞ্চিতে বসতে হয়নি, চাচা অষ্টম এডওয়ার্ডের মতো সাধারণ কারও প্রেমে পড়তে হয়নি!
এমি চোখ পিটপিট করে বলল-
প্রেম এত সুলভ নয়, জনাব।
গোরা-রূপসীসহ একদম বাকিংহাম প্যালেসের সন্নিকটে চলে আসি। প্রাসাদ সন্নিহিত সরোবরে রাজহাঁস ভেসে ভেড়ায় আপনমনে। ঝোপের দিকে বিহাররত হংসযুগলের আনন্দমুখর ছটফটানি দেখে সামনে হাঁটি। রাজপ্রাসাদের বাইরে অনেকক্ষণ ধরে পাথুরে-থামের মতন গোমড়ামুখে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তা-প্রহরীদেরকে আমি ভেবেছিলাম বুঝি কোনো মূর্তি-ভাস্কর্যের মতন কিছু। বাহারি রক্তিম কোট, কালো প্যান্ট আর অতিদীর্ঘ পশমি কুচকুচে টুপির জন্য এদেরকে আরও দীর্ঘ দেখাচ্ছে। দিনের আলো কমে এসেছে দেখে এদের ছায়াও হয়ে গেছে দীর্ঘতর। কয়েকশ বছর ধরে একই বেশবাস আর বেঢপ শিরাবরণে সজ্জিত এই নিশ্চুপ বাহিনীকে প্রাগৈতিহাসিক কোনো কল্পিত চরিত্র বলে ভ্রম হয়। এমি রয়্যালটির রীতিনীতির আরও কী সব গল্প করেছিল, ঠিক মনে নেই। তবে এই যুগেও মধ্যযুগীয় রাজতন্ত্রের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা দেখে অবাকই হয়েছি।
আমি বোকার মতো প্রশ্ন করলাম-
এই রানীর বয়স কত হলো?
এমি বলল-
রানীর জন্ম ১৯২৬ সালের এপ্রিলে। ব্রিটিশ সরকারের সবকিছু ছকে আঁকা; এমনকি সেই ষাটের দশক থেকেই রানীর মৃত্যু-পরবর্তী করণীয় কাগজে-কলমে মুসাবিদা করা। বিবিসিও নাকি ষাটের দশক থেকেই রানীর প্রয়াণ নিয়ে প্রোগ্রাম সাজিয়ে রেখেছে। রানীর মৃত্যুর কোড নেম- 'লন্ডন ব্রিজ ইজ ডাউন'।
আমি বললাম-
লন্ডন ব্রিজ অক্ষুণ্ণ থাকুক; রানী অনূ্যন শতবর্ষী হোক। এমি বুকে ক্রুশ এঁকে বিড়বিড় করে বলল-
আমেন।
ফেরার পথে অনিন্দ্যসুন্দর টাওয়ার ব্রিজে দাঁড়িয়েই এমি চোখ চকচক করে বলল-
এলিজাবেথের রানী হবার কাহিনিটাও কিন্তু বেশ মজার। কেনিয়া সফরকালে প্রিন্সেস এলিজাবেথ একদিন ঘুম ভেঙে শুনলেন- তিনি রানী হয়ে গেছেন! সংবাদটা প্রথম জানিয়েছিলেন রাজকুমারীর স্বামী প্রিন্স ফিলিপ। ঘুমকাতুরে রাজকুমারী আড়মোড়া ভেঙে প্রথমে ভাবলেন, পরিহাসপ্রিয় স্বামী বুঝি বরাবরের মতো মজা করছেন। তবে স্বামীর গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে সাথে সাথেই এলিজাবেথ ডুকরে কেঁদে উঠলেন- এর মানে তাঁর পিতা রাজা ষষ্ঠ জর্জ আর জীবিত নেই! রাজার মৃত্যু হলেও রাজসিংহাসন তো কখনও খালি থাকে না। তাই পঁচিশ বছর বয়সে মুকুটবিহীন এলিজাবেথের রানী হিসেবে দায়িত্বপালন শুরু হয়ে গেল সুদূর আফ্রিকার কটেজে। উনিশশ বায়ান্ন সালে! অনভিজ্ঞ রানীর শুরুর জড়তা কাটাতে সহায়তা করেছেন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল। বংশের ছোটবড় রটনা, দুর্ঘটনা, অসবর্ণ বিবাহ, অনাকাঙ্ক্ষিত তালাক বিতর্ক এসব এড়িয়ে এলিজাবেথ সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের ঝাণ্ডা সমুন্নত রেখেছেন দশকের পর দশক। অবশ্য আনুষ্ঠানিক অভিষেকের অনেক আগেই পিতার ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে এলিজাবেথকে রাজকাজে যুক্ত হতে হয়েছে। রাজকুমারী এলিজাবেথ শিশুকালে পিতামহ পঞ্চম জর্জের শেষ আমল (১৯১০-১৯৩৬) দেখেছেন, জ্যেষ্ঠ পিতৃব্য অষ্টম এডওয়ার্ডের স্বল্পতম সময়ের রাজত্বকালসহ (১৯৩৬) তাঁর বিতর্কিত সিংহাসন ত্যাগ দেখেছেন দশ বছর বয়সে। আর পিতা ষষ্ঠ জর্জের আমলে (১৯৩৬-১৯৫২) তো ক্রাউন প্রিন্সেস-ভবিষ্যৎ রানী হিসেবে সব সময় পাদপ্রদীপেই ছিলেন। এলিজাবেথ দিনে দিনে ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়েছেন ব্রিটিশ রাজমুকুটের; যা গ্রেট ব্রিটেনের ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক।
আমরা এবার দ্রুতলয়ে ফিরে আসি টাওয়ার অব লন্ডনে। এমি হাত উঁচিয়ে বলল-
ওই দেখ, একপাল আধ্যাত্মিক কাকা।
বলে কী পাগলি!
সত্যিই, বেশ অবাক হয়েছিলাম বেশ কয়েকটা দাঁড়কাক দেখে। এই বায়সকুলের তত্ত্বাবধান ও পরিচর্যায় নিয়োজিত থাকেন সুবেশ রাজকর্মচারী। এর পদবি র‌্যাভেন মাস্টার। কিংবদন্তি আছে, এইসব কাক যদি এই টাওয়ার ছেড়ে চলে যায় বা মরে যায়, তবে রাজমসনদ ভেঙে খানখান হয়ে যাবে, চরম ক্ষতি হবে রানীর আর ব্রিটেনের। ষোড়শ শতক থেকে রাজ পৃষ্ঠপোষকতায় এই টাওয়ারে কাক পোষার এই সংস্কার চলে আসছে। কাকমহলটি কিন্তু রাজবাড়ির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এইসব প্রশিক্ষিত কাকের পদবি হলো সৈনিক। এমনিতে বিলেতে মুক্ত কাকের অভাব নেই। এই কষ্টসহিষুষ্ণ বেহায়া পাখিটিকে সর্বত্র দেখতে পাবেন- গাছের আগায়, বিভিন্ন স্থাপনায়। তবে পাখিটির আকার বেশ বড়, আর রং যেন কিছুটা ছাইচাপা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও বোমা হামলার ভয় উপেক্ষা করে নির্দিষ্ট সংখ্যক রাজকীয় কাক পোষা অব্যাহত ছিল এই টাওয়ারে। নইলে যে রাজপরিবারে দুর্ভোগ নেমে আসবে, অমানিশায় ঢেকে যাবে বিলেতের আকাশ। লক্ষ্য করলাম, সৌভাগ্যের রক্ষক রাজকীয় কাক দেখতে বেশ জনসমাগমও হয় প্রচুর। অবাক ব্যাপার হলো, এ যুগেও ব্রিটিশ দর্শনার্থীদের সিংহভাগই রাজকীয় কাকের অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করে। শুনলাম, কাকগুলো সাঁঝের বেলা আপনাআপনি খাঁচায় ঢুকে পড়ে। প্রত্যুষে কাকরক্ষকের সাড়া পেয়ে কাকের দল খাঁচা ছেড়ে উন্মুক্ত মাঠে বা গাছে গিয়ে বসে। একটু উড়ে গিয়ে আবার ফিরে ফিরে আসে। এই পাখিরা যখন ঠোঁট বাঁকিয়ে সবুজ মাঠে মাস্টারের ছুড়ে দেওয়া খাবার খায়, তখন বেশ মায়া হয়- কেন যে এরা কুসংস্কারের জন্য এই চঞ্চল কাকগুলোকে খাঁচায় আটকে রাখে। জানি না, এইসব রাজকীয় বায়সকুল কি আজ সহিসালামতে আছে? এদের পৃষ্ঠপোষক রানী এলিজাবেথ তো দূর আকাশের তারা হয়ে গেছেন। শোকার্ত মানুষের হাতে ফুল আর চোখে অশ্রু। বিলেতের আকাশও আজ কাঁদছে অঝোর ধারায়।