সব সময় তিনি চাইতেন, নিজে কিছু করবেন। যেখানে থাকবে অপার স্বাধীনতা। আবার থাকা চাই মোটামুটি আয়ের সুযোগ। সে কারণেই কিছুদিন শিক্ষকতা করলেও তাতে তাঁর মন বসেনি। ২০১৫ সালে শুরু করেন গাছের ব্যবসা। অবশ্য গাছের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছোটবেলা থেকেই। গাছ কিনে সেটা অনলাইনে বিক্রি করে করেছেন বাজিমাত। মাসে তাঁর আয় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। সফল এই উদ্যোক্তার নাম সেলিনা আহমেদ।

শেখ বোরহানুদ্দীন থেকে বিবিএ সম্পন্ন করেছেন। স্বামী, শাশুড়ি আর মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। সাভারে জামগড়ায় ছাদ ভাড়া নিয়ে গড়ে তুলেছেন বিভিন্ন প্রজাতির গাছের এক অপূর্ব সমারোহ। ২৫ থেকে ৩০ প্রজাতির গাছ রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- পথোস, হয়া, স্নেক ক্যাকটাস, সাক্কুলেট, বাগানবিলাস, ক্যালাডিয়াম, ফিলোডেনন্ড্রোন, পাতাবাহার, কাঁটামুকুট ইত্যাদি। কাঁটামুকুট আর বাগানবিলাস সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। শৌখিন বাগানপ্রেমীরা এসব ক্রয় করেন বলে তিনি জানান।

প্রজাতি অনুযায়ী এসব গাছের দাম ৫০ থেকে শুরু করে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। গাছের সব কাজ এক হাতে সেলিনা নিজেই সামাল দেন। সংসারের কাজের পাশাপাশি তিনি এসব করেন। সেলিনা বলেন, 'গাছ লাগানো থেকে শুরু করে অর্ডার নেওয়া, প্যাকিং করা, কুরিয়ার করা- সবকিছুই নিজে করি।' তিনি আরও বলেন, 'ছোটবেলা থেকে গাছ আমাকে অদ্ভুতভাবে আকৃষ্ট করত। নিজের ভালো লাগা, মন্দ লাগা সবকিছুতেই গাছের সম্পৃক্ততা ছিল। তাই নেশাকে পেশায় রূপদানের মাধ্যমে কাজের প্রতি আকৃষ্ট আরও বাড়ে।'

সেলিনার ফেসবুক পেজের নাম গ্রিনি বিডি। সেখানে গিয়ে গাছের অর্ডার দেওয়া যায়। গাছ বিক্রির আয়ের টাকার একাংশ তিনি ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করেন। কিছু অংশ দিয়ে মেটান সংসারের প্রয়োজন। নিজে সরাসরি সব গাছের দেখভাল করেন। যে কারণে তাঁর গাছগুলো থাকে সতেজ। হুমায়ূন জহির নিয়মিত গাছ ক্রয় করেন সেলিনার কাছ থেকে। তিনি বলেন, 'যেমন সুন্দর তাঁর গাছ, তেমনি প্যাকেজিংও অনেক ভালো। প্যাকেজিং ভালো হওয়ায় গাছ নষ্ট হয় না। ১৮টি বাগানবিলাস চারা নিয়েছি। সঙ্গে পাথোস উপহার পেয়েছি।' সামর্থ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব, ক্রেতাকে কিছু না কিছু উপহার দিতে চেষ্টা করেন সেলিনা।


সেলিনা বলেন, 'গাছের প্রতি ভালো লাগা আর ভালোবাসা থাকলে যে কোনো বয়সেই এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। যে কেউ এসব করে মানসিক শান্তির পাশাপাশি আয়ের মাধ্যমও তৈরি করতে পারেন খুব সহজেই।' ঘরের গাছ বা ইনডোর প্নান্ট- এ বিষয়ে সেলিনার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি শুধু গাছ বিক্রি করেন না। গাছের ভালো-মন্দ, রোগবালাই বেশ বুঝতে পারেন। এ জন্য অনেকেই তাঁর সহায়তা নেন। অন্যদিকে গাছের বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে জড়িত তিনি। সেখানে গাছকেন্দ্রিক পরামর্শ দেন।

শিক্ষকতা ছেড়ে গাছের ব্যবসায় আসায় শুরুর দিকে অনেক সমালোচনা হলেও এসব একদম পাত্তা দেননি তিনি। সেলিনা বলেন, 'সমালোচনা তাকে নিয়েই হয় যে বা যিনি তাঁর যোগ্য হন। তাই কখনোই এসবে কান দিইনি।' গাছ ডেলিভেরির মাধ্যম কুরিয়ার। সে জন্য নষ্ট তো হতেই পারে। নষ্ট হলে তার দায়ভার কি সম্পূর্ণই ক্রেতার? সেলিনার ক্রেতাদের এ বিষয়ে কোনো লোকসানই নেই। সে পথ সেলিনা নিজেই তৈরি করেছেন। তিনি কুরিয়ারে গাছ নষ্ট হলে নতুন গাছ পাঠিয়ে দেন। গাছ স্টকে না থাকলে টাকা ফেরত দেন। ক্রেতাকে তিনি 'ঘরের লক্ষ্মী' মনে করেন। তাঁর কাছ থেকে গাছ নিয়ে যত্নআত্তির পরে যখন গাছের ফুল ফোটে, সুন্দর পাতা ছড়িয়ে পড়ে চারদিক আলো করে, এসব ছবি যখন ক্রেতারা তাঁকে দেন, তখন সেলিনার খুব ভালো লাগে। নেপথ্যে শত কষ্ট থাকলেও তিনি সব ভুলে যান।


তবে বাগানটা উন্মুক্ত জায়গায় হলে কষ্ট একটু কম হতো বলে মনে করেন সেলিনা। মানুষ সরাসরি দেখেশুনে কিনতে পারতেন। বড় একটি নার্সারি দিতে চান তিনি। যেখানে থাকবে সব রকমের গাছের সমারোহ। পছন্দের সব গাছ পাওয়া যাবে এক জায়গায়। এমনটাই সেলিনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।