গ্রীষ্মের শুরুর দিকের এই দিনগুলো আব্দুল হামিদের খুব ভালো কাটল এই বছর। দক্ষিণের শীত তার ষাট ছুঁতে চাওয়া দেহটাকে যতভাবে যন্ত্রণা দেওয়া সম্ভব দিয়েছিল। যদিও ষাটকে এমন কিছু বেশি বয়স বলে মনে করে না ওরা।

ওরা বলতে গ্রামের লোকজন, বিশেষ করে সত্তর পার হবার পরেও যারা ঘর-গেরস্থালির টুকটাক কাজ করতে ভালোবাসে, সেজেগুজে ভোরের বেলা বা সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে নিজেদের অতীত জীবনের গৌরব আর বর্তমান জীবনের সফল অবসরের গল্প করে। তারা আব্দুল হামিদকে সুযোগ পেলেই টোকা দিত-

‘এইটে কোনো কতা কলি হামিদ, এই বয়সে তোর বিচিবুচি শুকোইয়ে গেল?’

‘বিচি শুকোবে কিসির জন্যি? নুংরা কতা ছাড়া কিছু নেই তুমাইগে মনে?’

‘তালি তোর এই আদমারা দশা কেন? শীত কি আমাইগে লাগে না নাকি?’

শীত যে আর কারও লাগত না, শুধু আব্দুল হামিদেরই লাগত, এটা তাকে দেখে মনে না করে উপায় থাকত না কারও। ডাবল পাজামা ফুলে থাকবে, পায়ে মোজাসহ ক্যানভাসের শু, গায়ে জাবড়া মোটা ছাই রঙের বিশাল জ্যাকেট যা তার ছেলে কিছুদিন আগে এসে কিনে দিয়েছিল। আর বাঁদরটুপি। চোখ-নাক ছাড়া সন্ধ্যায় সে চায়ের দোকানে এলে কিছুই দেখা যেত না প্রায়। মোটামুটি গোল একটা কাপড়ের স্তূপ মনে হতো।

সেই আব্দুল হামিদ গ্রীষ্মের প্রথম দিনগুলোতেই বদলে গেল। চুলে তেল দিয়ে সিঁথি করা, হালকা আকাশি ফতুয়া আর সবুজ কালোর চেক লুঙ্গি পরনে, কণ্ঠে গুনগুন কিশোর কুমারের গান-

হাম যাব হোঙ্গে সাট সাল কে

অর তুম হোগি পাচপান কি-

চায়ের দোকানে বসে সে এইসব করলে অন্যরা অবাক হয়ে চেয়ে থাকল। আব্দুল হামিদ চা আর পান একসাথে খায়। তার গুনগুন তেমন থামল না। সমবয়সীরা ঠাট্টা করে আবার তাকে টোকা দিল-

‘খুব কালার লাগিছে নাকি রে মনে? বিয়েশাদি করবি নাকি আবার?’

আব্দুল হামিদ ছোট্ট সাধারণ এক উত্তর দেয়-

‘গরম পড়ায় খুব আরাম লাগতিছে বুজদি পাইল্লে? হেবি আরাম। আমি তো ভাবিছিলাম শীতে আর বাঁচতি পারব না এইবারা।’

একটু যারা বয়স্ক, তারা কিছু বলল না। গম্ভীর মুখে বিড়ি ফোঁকাটাই যেন এখন তাদের সবচেয়ে জরুরি কাজ।

কিন্তু যা সাধারণ, তাকে সবাই জটিল ভেবে নিলে কাকেই-বা দোষ দেওয়া যাবে? গরমে আরাম লাগছে এইটা কেমন কথা? গরমে কি কারও আরাম লাগে? জলের পিপাসা বাড়ে, বারবার গোসল করতে ইচ্ছা যায়, একটু হাঁটলেই ঘেমে হাঁসফাঁস, আর শান্তি মেলে না রোদের যন্ত্রণায়। অনেকেই ভেবে নিল যে ঘটনা অন্যকিছু হবে। আব্দুল হামিদের আরাম লাগছে হয়তো অন্য কারণে।

যদিও নারীবিষয়ক চিন্তার বাইরে কোনো কিছুই লোকে ভেবে উঠতে পারল না। নিজের টিন ছাওয়া পাকা ঘরের বারান্দায় বসে তালপাখার বাতাস খেয়ে গেল আব্দুল হামিদ। ছেলের কিনে দেওয়া মোবাইল ফোনে অজস্র সেভ করা গান। বেশির ভাগই কিশোর কুমার আর তালাত মাহমুদের। সেসব একটার পর একটা বেজে চলল। আব্দুল হামিদের বউ মালেকা বানু তার পায়ের কাছটায় বসে সুপারি কুচি করছিল। কিছুটা নিচু সরে সে বলল-

‘শুনেন।’

মন ভালো থাকলে আব্দুল হামিদ নিজেকে নবাব মনে করে। সে জবাব দিল-

‘কউ বেগাম, কী হইছে?’

‘মুল্লাদের বউ বিলকিছ আসিছিল সকালে। আপনারে নিয়ে গিরামে কিসব কথা হচ্ছে শুনিছেন?’

‘মাইনষির কতায় কান দিলি হবে বেগাম? মাইনষি কি আমাইগে খাতি-পরতি দেয়?’

বিলকিস বানু মাথা নাড়ল। সুপারি কুচি হলে একটা পান বানিয়ে আব্দুল হামিদের হাতে দিল-

‘না তাউ, নাতি-নাতকুইড়ে পন্তিক বড় হয়ে যাচ্ছে আমাইগে। এইসুমায় এইসব কতা খুব মন্দ শুনায়।’

আব্দুল হামিদ নিঃশব্দে পান চিবাতে লাগল। বিকেল শেষ হচ্ছে। মার্চের মাঝামাঝি এখন। হঠাৎ হঠাৎ কেমন কোমল মোলায়েম হাওয়া দেয়। গরমের সাথে মিলে বড় ফুরফুরে লাগে।

তার ছেলে অনেক বছর হলো দূরের এক মফস্বল শহর নিবাসী। সেখানে ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে। দুই কন্যা আর বউ নিয়ে সংসার। বাবা-মাকে ওখানে নিয়ে যেতে প্রাণপণ। মাঝেমধ্যে আব্দুল হামিদ আর মালেকা বানু সেখানে গিয়েছেও বেড়াতে। কিন্তু স্থায়ীভাবে থাকা তাদের কারও পক্ষেই সম্ভব মনে হয়নি। নিজেদের জগৎ ছেড়ে তারা কোথাও গিয়েই বেশিদিন থাকতে পারে না, কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। মালেকা বানুর হাঁস-মুরগি, কয়েকটি রামছাগল, আর পাড়ার বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে গল্পগুজব। আব্দুল হামিদের এদিক-সেদিক ঘুরে ফেরা, সন্ধ্যার পর বাজারে চায়ের দোকানে আড্ডাবাজি। এই এলাকার সাথে তাদের সম্পর্ক দড়িবাঁধা।

জুটমিল প্রধান এ অঞ্চলে আব্দুল হামিদ নিজেও তার জীবন কাটিয়েছে শ্রমিক হিসেবে। মাস ছয়েক আগে মিল বন্ধ হবার ঘোষণায় প্রথমে খুব খারাপ লেগেছিল। যদিও সবাই বলছিল দক্ষিণাঞ্চলের জুটমিলগুলো বন্ধ হতোই। প্রফিট নেই। যুগ যুগ ধরে লস দিয়ে কেনই-বা চালাবে সরকার? কিন্তু শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, সাধারণ শ্রমিক এরা শেষ চেষ্টা হিসেবে কম দৌড়াদৌড়ি করেনি। অনশন পর্যন্ত করল তারা খালিশপুরের মেইন রোডে। হাজার হাজার লোক। দিন-রাত সটান হয়ে চটের ছালা বিছিয়ে রাস্তায় শুয়ে থাকা না হয় বসে থাকা গুটুলি পাকিয়ে। এরপরই না সরকার থেকে ঘোষণা এলো যে, মিল বন্ধ হলেও যার যা প্রাপ্য টাকাপয়সা আছে, সব গুনে গুনে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

বাজারে যাওয়ার হাঁটা পথের এক পাশে পড়ে প্রশস্ত নদী। ভৈরব বড় স্নিগ্ধ ও প্রাণময়। কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকলে হুহু বাতাসে তার মন কেমন করে ওঠে। আর দশজনের থেকে চিরকাল নিজেকে আলাদা মনে হতো আব্দুল হামিদের। যুদ্ধের আগে আগে নিয়মিত স্কুলেও যেত। খুব সিনেমা দেখত সে ঐ স্কুলের বয়সেই। গান শুনত। ফুটবলে তুখোড় ছিল। 

অন্যদের সে বরাবর বলত- কলেজে পড়বে একদিন, এইটা নিশ্চিত। ক্লাস টেনে যখন সে উঠল, ঐ সময়েই যুদ্ধটা এসে তার পড়ালেখার সমাপ্তি ঘোষণা দেয়। দিনগুলো কষ্টে কেটেছিল খুব। আব্বা ছিল কাঠের মিস্ত্রি। ঐ সময়ে কাঠের কাজ আর কে করাবে? চন্দনীমহল থেকে মাঝেমধ্যে খালিশপুর মুজগুন্নি বৈকালী হয়ে খুলনা শহরে চলে যেত তার বাপ। সঙ্গে আব্দুল হামিদ নিজেও যেত কাজের সন্ধানে। কাজ আর কী, কিছু অবস্থাপন্ন বাড়ি ছিল, টুকটাক ফুটফরমায়েশের বিনিময়ে টাকাপয়সা দিত। আর একবার তো মিলিটারির হাতেও ধরা পড়ে গেল। তাকে জিপে উঠিয়ে বাপকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিয়েছিল ওরা। সেসব আরেক রকমের ঘটনা। আব্দুল হামিদ স্মরণ করতে চায় না, তার মন হঠাৎ করেই খুব খারাপ হয়ে যায়। বাপ কী জিনিস ঐ বয়সে প্রথম বুঝেছিল সে। তাকে উদ্ধার করতে কত কাণ্ডই-না করেছিল লোকটা।

সে নিজে কেমন বাপ? সন্তান কত দূরের কোনো মহল্লায় পড়ে আছে। বছরে দুই-চারবার আসে। তাকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে চায়। চায়ের দোকানে বসে অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজেকে মনে মনে একজন সফল বাপ হিসেবে স্বীকার করে আব্দুল হামিদ। যা-ই হোক, তার পুত্র বখে যায় নাই। আলাদা পরিবার করেছে। টাকাপয়সা কামাচ্ছে। মন্দ কী! কিন্তু এসব ছাপিয়েও গ্রামে কয়েক দিন ধরে তার নামে যে কানঘুষঘুষ চলছে তা নিয়ে সে ভাবে। মানুষের কী আর কাজ নাই?

তারপর ওদিন বিকেলেই জীবনে প্রথম লাখ বিশেক টাকার মালিক বনে গেল আব্দুল হামিদ। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুসারে আরও অনেকের মতো একজন স্থায়ী শ্রমিক হিসেবে তার সার্ভিস, গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ডের পাওনা টাকাটা দুই ভাগে হাতে চলে এলো। অর্ধেক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে, অর্ধেক প্রাইজবন্ড। সুসংবাদ উদযাপন করতে বিশাল এক কাতলা মাছ কিনে ঘরে ফিরল সে। এই মাছ একা রাঁধা মালেকা বানুর পক্ষে অসম্ভব। আর সংসারে মাত্র দু’জন মানুষ তারা, খাবে কে?

আব্দুল হামিদ আয়েশি কণ্ঠে বলল-

‘ছেলেরে ফোনে ডাইকে নেও। সবাইরে নিয়ে আসুক। খাওয়ার লোকের অভাব আছে নাকি? কাইটে কুইটে জাল দিয়ে থোও মাছ।’

আনন্দে পান চিবানোর গতি বেড়ে গেল মালেকা বানুর। নাতনি দুটি বড় ফুটফুটে, তাদের একনজর দেখতে মন আকুল করে।

অতঃপর দিন দুয়েক কেটে যায় অপেক্ষায়। আগামীকাল ছেলে পরিবার নিয়ে আসবে। পাড়ার কয়েকজন মহিলাকে দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনে সে। পিঠা বানাতে হবে রাতভর। রান্নার জোগাড়যন্ত্র করতে হবে। অনেক দিনের অব্যবহৃত ঢেঁকিটা আজ দারুণ শব্দ করছে।

প্রায় নির্জীব বাড়িতে আচমকা শুরু হওয়া উৎসব পেছনে রেখে আব্দুল হামিদ তার প্রিয় গানের কলি ভাঁজতে ভাঁজতে রাস্তায় নামে। শুক্লপক্ষ। চাঁদ স্বাস্থ্যবান। অপার্থিব আলো ছড়াচ্ছে। ইট বাঁধানো রাস্তা ধরে সে মধ্যমপাড়ার দিকে হাঁটতে থাকে।

সুপ্রিয়া সরকারের সঙ্গে তার প্রেমের কথা গ্রামের বয়স্ক লোকজন হয়তো এখনও মনে রেখেছে। একে তো কাঠমিস্ত্রির ছেলে, তার ওপর পড়ালেখা ছেড়ে জুটমিলের শ্রমিক হয়েছে, আধা শিক্ষিত সুপ্রিয়ার পরিবার তাদের সম্পর্কটা মেনে নিতে রাজি ছিল না। কিন্তু সুপ্রিয়া তাকে তো ভালোই বাসত। পালিয়ে যেতে চেয়েছিল এইরকম আরও এক শুক্লপক্ষের রাতে। ঝিঁঝি কাঁদছিল। সুপ্রিয়া কাঁদছিল। আর আব্দুল হামিদ সুপ্রিয়াকে শেষবারের মতো বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল-

‘পলায়ে গিয়ে কুথায় নিয়ে তুমারে থোবো? টাকা কি আছে আমার? এই গিরামে নাহই আমার কাজকর্ম আছে, ঘরবাড়ি আছে। তুমি বাবা-মায়েরে ছাইড়ে আমার ঘরে উইঠে আসো। আসবা না?’

সুপ্রিয়া আসেনি সেই রাতটিতে। আর কোনো রাতেই নয়। অন্য কারও ঘরে উঠেছিল সে আয়োজন করে। সারাজীবন আব্দুল হামিদ নিজেও আর তার কথা ভাববে না বলে পণ করেছিল। তাই যখন মাস দুয়েক আগে চন্দনীমহলে ফিরে এলো সুপ্রিয়া, একবারের জন্যও তার মুখোমুখি হবার ইচ্ছে করে নাই তার।

এই নিদারুণ গ্রীষ্মকালে তাকে ঘিরে যে গুজব রটল গ্রামে, তা সুপ্রিয়ার মেয়েটিকে নিয়েই। সোমত্ত হয়েছে, হয়তো বিয়ে হয়ে যাবে কদিন পর। সেই মেয়ের চেহারা হয়েছে অবিকল সুপ্রিয়ার মতো, দেখে বুকে কেমন মোচড় দেয়- আব্দুল হামিদ কাউকে বোঝাতে পারবে না। সেই অতি চেনা হলদে বাড়িটা, নোনা ধরা দেয়াল, গাছপালায় ঢাকা। সেটির ভঙ্গুর সীমানা দেয়ালের এধারে দাঁড়িয়ে মেয়েটির গতিবিধি লুকিয়ে চুরিয়ে সে প্রায়ই দেখে আজকাল। লোকে কান কথা বলা ছাড়বেই-বা কেন? মানুষের এই অযাচিত কৌতূহলে তার বিবমিষা জাগে।


কিন্তু আজ আব্দুল হামিদের বড় ভালো লাগল গ্রীষ্মের এই প্রথম দিনগুলোতে। ধীর পায়ে সে মধ্যমপাড়া গোরস্তানের হাঁটা পথে এগিয়ে গেল। সুপ্রিয়ার কবরের বেড়া পচে গেছে। মাঝখান দিয়ে একটা শিশু অশ্বত্থ গাছ তুলেছে মাথা। তার পাশ থেকে একমুঠো মাটি নিয়ে সে ফতুয়ার বুকপকেটে রাখল। এরপর প্রাক্তন প্রেমিকার পাশে বসে সেই গানটা ধরল নিচু গলায়-

হাম যাব হোঙ্গে সাট সাল কে

অর তুম হোগি পাচপান কি

বোলো প্রিত নিভায়োগি না

তাব ভি আপনা বাচপান কি

তখন এলোমেলো বাতাসে স্মৃতির ঘ্রাণ। শুক্লপক্ষের জোছনায় চন্দনীমহলের সকল মৃত মানুষ হেসে উঠতে চাইছে। অদূর ভৈরবের জলে নোঙর করা একটা প্রাচীন জাহাজ সিটি বাজাল। 

বিষয় : গল্প এনামুল রেজা

মন্তব্য করুন