একটা গলি, একটা পাড়া। তাসের মতো গায়ে-গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কতগুলো বাড়ি। বাড়ির জানালাগুলোর কোনোটায় পর্দা আছে, কোনোটায় নেই। কারও দরজায় লেখা 'কুকুর হইতে সাবধান, কারও ঝুলছে কাঠের লেটারবক্স। কোনো বাড়ির সদর দরজা খোলা, কোনোটার বন্ধ, কেউ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে, কেউ সকালবেলা বারান্দায় খবরের কাগজ পড়ছে; পাশের বাসা থেকে কেউ এসেছে পত্রিকাটা ধার নিতে। কেউ বাজারের ব্যাগ হাতে গলির মাথায় দাঁড়িয়ে গল্প করছে; বাজার করার সময় চলে যাচ্ছে ঘড়িতে। একটা টেনিস বল ড্রপ খাচ্ছে ধীরে গলির রাস্তায়, রোদে দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে একলা দাঁড়ানো নড়বড়ে ক্রিকেট ব্যাট। ইট সাজিয়ে তৈরি হচ্ছে উইকেট। কেউ এসেছে কয়েকটা পেঁয়াজ ধার নিতে। কেউ কাউকে জানালা দিয়ে বলছে-
কলেজ থেকে ফেরার সময় পোস্ট অফিস থেকে আমাকে কয়েকটা পোস্টকার্ড এনে দিস মনে করে ...।
প্রতিবেশীদের দিন বয়ে যেত একদা এভাবেই গ্রীষ্ফ্ম অথবা শীতে।
যে সময়টার কথা লিখে রাখছি তখনও ঢাকার হেয়ার রোডের তিন মাথার মোড়ে বিশাল 'ক্যানন বল' গাছটা কাটা পড়েনি। গুলিস্তান সিনেমা হলে মানুষের ভিড় জমত ম্যাটিনি শোর, বিজয়নগরের রাস্তায় 'ফ্লেমিঙ্গো' রেস্তোরাঁয় বাতাসে উড়ত নীল রঙের পর্দা। তাসের মতো গায়ে-গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলোর বাসিন্দা হয়ে মানুষ কাছাকাছি থাকত।
কাছে থাকা কাকে বলে? এ প্রশ্নের উত্তর যেন একবিংশ শতাব্দীর খাতায় এক বীজগণিতের অঙ্ক। সমাধান নেই। একদা এই শহরে মানুষের ঘরবাড়িগুলো কাছাকাছি ছিল বলে মনে হয়। সেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর গল্প যেমন ছিল, তেমনি ছিল ভালোবাসার অনুভূতিটাও। দিনগুলি কাছে ছিল, রাতগুলি পাহারাওয়ালার ডাকের মতো জানালার পাশেই আন্তরিক হয়ে জেগে থাকত। চেনামুখ গলির মোড়ে আড্ডা দিত, সকালবেলা গোসল করে পরিপাটি চেনা মানুষ অফিস যেত, চেনা মুদির দোকানি বাকির খাতা লিখত। জড়িয়ে বেঁচে থাকার একটা ধীর সময় স্থির হয়ে থাকত ঘড়িতে। কত কী আর কত কে যে প্রতিবেশী ছিল আমাদের তখন! গাছপালা, ক্লাবঘর, পুকুর, রং উঠে যাওয়া চেনা দেয়াল, জুতা সেলাইওয়ালা, সাইকেল মিস্ত্রি, পুলিশের টিকটিকি- সবাই।
যে লোকটা দুপুরবেলা রোদ মাথায়, কাঁধে কাঠের বাক্স ঝুলিয়ে জুতা সেলাই বলে হাঁক দিত সে-ও ছিল প্রতিবেশী। একটা ছেঁড়া স্যান্ডেল সেলাই করতে করতে তার গ্রামের বাড়িতে ছোট ধানের জমি কেনার স্বপ্টম্ন, ভাঙা সাঁকোটা মেরামত হয় না বলে হেঁটে খাল অতিক্রম করার অসুবিধা, ছেলেটা স্কুলে যেতে চায় না- এ রকম কত গল্পে সময় বয়ে যেত। ছুটির দিনে অঙ্কের বই আর খাতা হাতে ঢুকে পড়া পাশের বাড়িতে, নিজের বাড়ির রান্না খাবার ভাগ করে খাওয়া অন্য বাড়িতে- পেছন ফিরে তাকালে ভাঙা ভাঙা ছবিগুলো অলীক বলে মনে হয়। ভাবি, সত্যিই এমন ছিল কোনোদিন! আজ সামনের ফ্ল্যাটের বাসিন্দার মুখ মনে করতে পারি না কিন্তু চল্লিশ বছর আগের প্রতিবেশীর মুখ আজও অমলিন থেকে গেল মনের মধ্যে! একরকম অচেনা মানুষই তো ছিল তারা। ভাড়াটিয়া বাড়িতে উড়ে এসে বসা অচেনা মানুষ একটা পাড়ায় থাকতে থাকতে নিজেদের সংসার জুড়ে ফেলত প্রতিবেশীর সংসারের সাথে। তারপর একদিন কেউ বাড়ি বদলে উঠে যেত অন্য পাড়ায়। পাল্টে যেত পাড়ার দোকান, মোড়ের রেস্তোরাঁ, কাছের বাজার। কিন্তু সম্পর্ক? সে কোথায় উড়ে যাবে? ভূগোলের জাল ছিঁড়ে গেলেও মনের ভেতরের বন্ধনটা ফুরাত না। তাইতো এত বছর পরেও তাদের নাম, তাদের মুখ, বাড়ির নম্বর, দেয়ালের রং- সব মনে আছে। শুধু ভুলে যাই এখন সামনের বাড়ির বাসিন্দার মুখ! এখন প্রতিদিন ফ্ল্যাটবাড়িতে দরজা খুলে সামনের দরজার অন্তরালে কার বসবাস তা কেন জানি না! লিফটে নামতে নামতে কোনোদিন যান্ত্রিক ভঙ্গিতে হাসি বিনিময়, দু'একটা কুশল প্রশ্ন বিনিময়- ব্যস, ওখানেই ইতি হয়ে যায় সম্পর্কের। তারপর আর বহুদিন দেখা নেই। সুখে, পার্বণে, দুঃখে অথবা প্রয়োজনে প্রতিবেশী দরজায় ঝুলতে থাকে নীরবতার পর্দা। জীবনের দৌড় আমাদের ছিটকে ফেলে দিয়েছে এমন এক কক্ষপথে? যেখানে বেঁচে থাকা, ওপরে ওঠার সিঁড়ি খোঁজা, বিত্তের সন্ধান করা আর তারপর ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে ঘুমের অতলে তলিয়ে যাওয়াই বেঁচে থাকবার অন্য নাম?
বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এসে ধনবাদী সমাজের নতুন রূপের একটা বড় কেক তৈরি করেছি আমরা। নির্মমতার ছুরি দিয়ে সেই কেক কেটে ভাগ করতে করতে নিজেদেরকেই বলেছি-
হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ।
সেই জন্মদিনের একমাত্র আমন্ত্রিত অতিথি ছিল বিচ্ছিন্নতা। কেক কাটার পর্ব শেষ হয়েছে বিগত শতাব্দীতে। কিন্তু অতিথি এখনও আছে। লিখতে লিখতে মনে পড়ল গোয়েন্দা পুলিশের সেই ইনফরমার মানুষটার কথা। সত্তরের দশক তখন প্রায় শেষ হতে চলেছে। সামরিক শাসন তখনও বলবৎ। যে পাড়ায় থাকতাম সেখানে নজরদারি করাই ছিল তার কাজ। লম্বা, তালপাতার সেপাই বললে ভুল হবে না। পাড়ার নানান রাস্তায়, আমরা যে রেস্তোরাঁয় নিয়মিত আড্ডা দিতাম সেখানে নিয়মিত দেখা যেত। একটি নিঃসঙ্গ টেবিল দখল করে বসে থাকত সেই ছায়ামূর্তি। একটা সময়ে তার সঙ্গে হাসি বিনিময়ও চলত আমাদের। শেষে নিজেদের সংক্ষিপ্ত বাজেট থেকে এক কাপ চা আর এটা-সেটা খাবার তার জন্যও বরাদ্দ হয়ে গিয়েছিল। হাতের নিচে ছোট একটা চামড়ার ব্যাগ নিয়ে ঘোরা সেই লম্বা মানুষটাও একরকম প্রতিবেশী হয়ে উঠেছিল আমাদের। সময়ের প্রবাহে পৃথিবীতে ওলটপালট হয়ে যাওয়া দৃশ্যপটে আজকে এ রকম মানুষের ছায়া আর কোথাও পড়ে? হঠাৎ বাড়িতে অতিথির আগমনে টান পড়া তেল অথবা চিনির জোগান দেওয়া প্রতিবেশীর মতো সেই মানুষটাও কি আমাদের সম্পর্কে ইতিবাচক খবরই পাচার করত গোয়েন্দা অফিসে? চায়ের দোকানের সামনে বসে থাকা কুকুর, জুতা সেলাইওয়ালা, বই বিক্রেতা, মাছ বাজারের দোকানির নীরব ভাষা ছিল একটাই- কাছে আছি।
আমরা কি এখন দূরে থাকি একে-অপরের কাছ থেকে? প্রতিবেশীর সঙ্গে আত্মীয়তার গ্রামাঞ্চল উঠে গিয়ে পাথুরে কঠিন শহরের ধারালো দাঁত আর নখ প্রকাশিত হয়ে পড়ে কেন? ভাবি, এই সময়ের ভেতরে এক ধরনের উচ্ছন্নতা আছে। এই উচ্ছন্নতাই হয়তো তৈরি করেছে প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন বিত্তের? সেই প্রয়োজন আরও স্বাচ্ছন্দ্যের? এই প্রয়োজনগুলিই কি আমাদের মানবিক সম্পর্কের কাঠামোটাকে ভেঙে তৈরি করতে চাইছে আত্মকেন্দ্রিকতা আর নিঃসঙ্গতার বাঁকাচোরা এক কিম্ভূত কাঠামো? নাকি তৈরি হয়ে গেছে সেরকম প্রাণহীন কাঠামো, যেখানে অপরিচয়ের আড়াল, দূরত্ব আর অনাগ্রহ বিজয়ের পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে? এই কিম্ভূত কাঠামো তৈরির পেছনে কি রাজনীতি দায়ী, সমাজের ব্যাকরণহীন এলেবেলে বিকাশ দায়ী? গত কয়েক দশকে রাজনীতির প্রভাব যে মানুষের মধ্যে ক্ষমতা অর্জন করার নেশার বীজটা বুনে দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই ক্ষমতা নিজের প্রতিপত্তি বিস্তার করার জন্য। এই নেশা মানুষকে বিযুক্ত করে দিয়েছে একটু একটু করে অন্য সম্পর্ক থেকে। যে সম্পর্কগুলো ছিল সরল, ছিল চাহিদাহীন, সেগুলো মঞ্চে মলিন পার্শ্বচরিত্রে পরিণত হয়েছে। পাড়া সংস্কৃতি ভেঙে যে
ফ্ল্যাটবাড়ির সংস্কৃতি গড়ে উঠে গত কয়েক দশকে, সেখানে মিশেছে রাজনীতি আর অনুপার্জিত বিত্তের চাপ। আর এই চাপটাই মানুষের ভেতরে তৈরি করছে আড়ালে থাকার আগ্রহ। এই আড়াল খানিকটা দম্ভ প্রকাশের অস্ত্রও। তাহলে বিচ্ছিন্নতা কি প্রতিবেশীর বাড়তি সমীহ আদায় করে? নানান কারণে নিজেকে রহস্যের বাতাবরণে ঢেকে এখন মানুষের জীবন বিদায় জানিয়েছে সহজ, খোলামেলা জীবনধারাকে। অভাবের সূর্যোদয় অথবা সূর্যাস্ত, জীবনের সাধারণ চাওয়ার পরিতৃপ্তির মধ্যে যে বাতাসের মতো ফিনফিনে ভালো লাগা, তা হারিয়ে গেছে।
সত্তরের দশকের সমাজে বিত্ত আর রাজনীতির গলাগলি কম ছিল। রাজনীতির সঙ্গে আত্মত্যাগ, কমিটমেন্ট শব্দগুলো জড়িয়ে ছিল তখনও। ভোগবাদী চেতনারও বিকাশ ঘটেনি, সামান্যতেই আনন্দিত হওয়া যেত। গোটা পাড়ায় একটা বাড়িতে সাদা-কালো টেলিভিশন। সন্ধ্যাবেলা জনপ্রিয় কোনো নাটক দেখার জন্য সেই বাড়ির টিভি রুমের মাটিতে পাতা হতো ঢালাও বিছানা। সেখানে সন্ধ্যার পর জমায়েত হতো নানা শ্রেণির দর্শক। বিনিময় হতো গল্প থেকে শুরু করে রান্না করা তরকারি পর্যন্ত। সেই একটা কাঠের বাক্সে ভেতরে বসানো টেলিভিশনটা একমাত্র ভেলা হয়ে ধরে থাকত সম্পর্কের সবুজ সুতা। সেই সমাজ কাঠামোতে বিত্তের আস্টম্ফালন ছিল না। সাধারণ হয়ে বাঁচার ভেতরে মানবিক টান ছিল বেশি। রাতের হাসপাতালে সঙ্গী হয়ে ওই প্রতিবেশীই থাকত পাশে। কবরখানা পর্যন্ত শোকগ্রস্ত পথটার সাথি হতো ওই পাশের দরজার অন্তরালে থাকা মানুষটাই।
বিদায় নেওয়া একটা সময়ের গল্পে হতাশার একটা টান লেগেই থাকে। উৎক্ষিপ্ততার সময় এটা। হেমন্তকালের মতো চট করে যেন বিদায় বলেছে আমাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলেমিশে বেড়ে ওঠা সেই দিনগুলো। বিচ্ছিন্নতাকে হ্যাপি বার্থ ডে বলে জন্মদিন পালন করে এখন তারই যুগ চলছে। যুগপূর্তিও হবে। পেছনে পড়ে থাকবে তাসের মতো গায়ে-গা লাগিয়ে কতগুলো ঘরবাড়ির স্মৃতি। বেদনায়, আনন্দে মিলেমিশে থাকার নিরাপদ তন্দ্রা। হারিয়ে যাওয়া আস্থার হাসিখুশি দিন।
পাশের বাড়ির অসুস্থ মানুষটির খবর জানা হয় তার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে।