সৈয়দ শামসুল হককে নিয়ে আমি একাধিক লেখা লিখেছি তাঁর প্রয়াণের আগেই। তিনি চলে যাওয়ার পর আর কিছু লিখতে পারিনি। আজ একান্তই কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা বলি।
১৯৯৫ সালে, তাঁর গল্প নিয়ে একটা দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলাম, প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক জনকণ্ঠে। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, অতি-তরুণ লেখক, আবার সাহিত্য আমার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার বিষয়ও নয়, বিজ্ঞানের ছাত্র আমি। সাহিত্যের প্রতি নিতান্তই ভালোবাসা থেকে ওগুলো লিখে চলেছি। হয়তো খানিকটা মনোযোগও প্রত্যাশা করছি, তরুণরা যেমনটি করে থাকেন। তখনও তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি, তবু ফোন করে তাঁর মতামত জানতে চাইলাম লেখাটি সম্পর্কে, তিনি কিছু না বলে বাসায় যেতে বললেন। আগ্রহভরে একদিন গেলামও, কিন্তু আমাকে আনোয়ারা সৈয়দ হকের সঙ্গে কথা বলতে বলে নিজে বাইরে চলে গেলেন। বেকুব বনে গেলাম। তাঁর একটু মনোযোগ আশা করেছিলাম, অস্বীকার করব না-  কিন্তু এ কেমন আচরণ! আনোয়ারা আপার সঙ্গে কথা হলো ঘণ্টাখানেক কিন্তু অভিমান রয়ে গেল মনের ভেতরে। তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগই করলাম না। বছরখানেক পর বইমেলায় তাঁর সঙ্গে দেখা। আপাও ছিলেন। মজার বিষয় হচ্ছে- আপা চিনলেন না আমাকে, চিনলেন সৈয়দ হকই। আমার হাত ধরে থাকলেন অনেকক্ষণ, হেঁটে বেড়ালেন বেশ কিছুটা সময় হাত ধরেই, বললেন- 'তুমি আর এলে না তো! সেদিন এত ব্যস্ত ছিলাম ...।'
কিন্তু তারপরও যাওয়া হলো না আমার। দু-একবার ফোনে কথা হলো মাত্র। 
২.
তখন হাতে হাতে মোবাইল ফোন ছিল না, আর আমি ছিলাম ঘরবিমুখ তরুণ, বাইরে বাইরেই কাটত অধিকাংশ সময়, নিজে থেকে ফোন না করলে আমাকে পাওয়াই কঠিন ছিল। তিনি মাঝেমধ্যে ফোন করতেন, অধিকাংশ দিনই আমাকে পেতেন না, গল্পসল্প করতেন আমার মায়ের সঙ্গে। কী অত গল্প ছিল তাঁদের, জানা হয়নি কখনও। আমার মা বয়সে ছিলেন তাঁর বছর-পাঁচেকের বড়, মানে প্রায় একই সময়ের মানুষ তাঁরা। হয়তো পুরোনো দিনের গল্পই করতেন। 
যা হোক, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। বেশ ক'বছর পর একদিন অপ্রত্যাশিত ফোন এলো তাঁর কাছ থেকে আবার, বললেন-'অনেকদিন তোমার কোনো খবর নেই, তুমি কেমন আছ, কোথায় আছ? কোনো সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছ নাকি তুমি?'
হ্যাঁ, সত্যিই আমি তখন ভীষণ পারিবারিক সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। আকস্মিকভাবে আমার ভাই মারা গেছেন, বাবা তো আগেই গেছেন, সংসার সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। এসবের কিছুই তাঁর জানার কথা নয়, কাউকেই জানাইনি আমি, তবু তাঁর স্নেহপ্রবণ মন কথা বলে উঠেছে। 
এবার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। মনে হলো তিনি যেন স্নেহ প্রকাশে কুণ্ঠিত। যেন স্নেহ প্রকাশ করাটা দুর্বলতার পরিচয়- পুরোনোকালের পিতা বা বড় ভাইরা যেমনটি মনে করতেন আর কি- কিন্তু তিনি তাঁর মমতা জমা করে রাখেন বুকের ভেতর। সেদিনও তিনি বেশ কিছুক্ষণ গল্পসল্প করে আনোয়ারা সৈয়দ হকের কাছে আমাকে রেখে নিজের রুমে চলে গেলেন। এবার শুরু হলো আনোয়ারা আপার গল্প। সৈয়দ হক তাঁর খুব অল্প বয়সেই পিতাকে হারিয়েছিলেন (তখন তিনি উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র), সে কথা জানতাম। কিন্তু জানতাম না, পরিবারের সবচেয়ে বড় সন্তান হিসেবে সাত ভাইবোনের বিরাট সংসারটির ভার তাঁকে বহন করতে হয়েছে বহুকাল। আর তা করতে গিয়ে কত রকম কাজ যে তাঁকে করতে হয়েছে, কত সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যে যেতে হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। চাকরি তো কখনও করেননি তিনি, নির্দিষ্ট আয় যেমন ছিল না, ছিল না কোনো নিশ্চয়তাও। বিচিত্র ধরনের কাজ করা ছাড়া কোনো উপায়ও ছিল না তাঁর। তবু কখনও লেখালেখি থেকে হাত গুটিয়ে নেননি তিনি। আমার সংকট নিয়ে কোনো কথাই বললেন না সৈয়দ হক বা আনোয়ারা আপা, কিন্তু এইসব গল্প শুনতে শুনতে আমার বোঝা হয়ে গেল, তাঁরা আমাকে বোঝাতে চাইছেন- মানুষের জীবনে সংকট আসে, লেখকদের জীবনে একটু বেশিই আসে, সেগুলো সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়, পরাজয় মেনে নিলে চলবে না। সেদিন দুপুরে তাঁরা দু'জন যত্ন করে আমাকে খাওয়ালেন, গল্প কিন্তু তখনও থামেনি। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা এলো, তবু আমাকে ছাড়তে চাইছিলেন না তাঁরা, খানিকটা জোর করেই বেরিয়ে এলাম মনে এক গভীর প্রশান্তি নিয়ে। আনোয়ারা আপা এবং হক ভাই সেদিন যা করেছিলেন, সেটিই ছিল কাউন্সেলিং। শব্দটা তাঁরা ব্যবহার করেননি, কিন্তু প্রায় সারাটি দিন তাঁরা ব্যয় করেছেন আমার ওই দুঃসময়টিকে সহনীয় করে তোলার জন্য।  এ রকম ঘটনা একবার নয়, বারবার ঘটেছে। আমার কোনো দুঃসময়ে, সংকটের সময়ে তিনি না জেনেই ফোন করেছেন, জিজ্ঞেস করেছেন-'কেমন আছ তুমি? সব ঠিক আছে তো?'
এমনকি তিনি শেষবারের মতো যেদিন লন্ডন গেলেন, যাওয়ার আগের দিন ফোন করে আমার এবং পরিবারের সবার কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। নিজে যে ক্যান্সার-আক্রান্ত সে কথা একবারও বললেন না। 
৩.
একটু আগে বলছিলাম, তিনি আমার মায়ের সঙ্গে অনেক গল্পসল্প করতেন। মা'র জন্ম মুন্সীগঞ্জে, আর তাঁর শ্বশুরবাড়ি, অর্থাৎ আমার দাদার বাড়ি মানিকগঞ্জে। মোটামুটি প্রমিত ভাষায় বললেও মার কথা বলার মধ্যে এই দুই অঞ্চলেরই কিছুটা আঞ্চলিক টান ছিল। ঘটনাক্রমে সৈয়দ হকের মায়ের বাড়িও ছিল মানিকগঞ্জে এবং তাঁর কথায়ও মানিকগঞ্জের আঞ্চলিক টান ছিল, সেটি আমি সৈয়দ হকের কাছেই শুনেছি। পরানের গহিন ভিতর কাব্যগ্রন্থটি কীভাবে লেখা হলো, সেটি বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন আমাকে। এই গল্প তিনি একটি অনুষ্ঠানেও বলেছেন বলে শুনেছি, যদিও সেখানে আমি ছিলাম না। 
গল্পটা এ রকম : আঞ্চলিক ভাষায় গভীর কিছু বলা যায় কিনা তা পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিলাম একসময়। আমার মা মানিকগঞ্জের। আমার পিতৃপুরুষরা সিরাজগঞ্জের আর আমার জন্ম কুড়িগ্রামে। তিন রকম আঞ্চলিক ভাষার ভেতর দিয়ে আমি বেড়ে উঠেছি। তারপর আমার আঠারো বছর বয়সে বাবা যখন চলে যান, আমার ছোট সাতটা ভাইবোন, আমি সবার বড়। মায়ের সঙ্গে সাতটা ভাইবোনকে মানুষ করেছি একসঙ্গে, সংসার পরিচালনা করেছি ভাইবোনের মতো। মা যেন তখন আর মা নন, আমরা যেন দুটি ভাইবোন, সংসারটা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছি। তো তখন মাঝে মাঝে সারাদিনের শেষে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, আমি যখন ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম যেতাম কয়েকদিনের জন্য, মার সঙ্গে সেই বারান্দায় দেখছি বসে, গভীর রাতে, অনেক সুখদুঃখের কথা বলতাম। আকাশে হয়তো তারা, আকাশে হয়তো চাঁদ কিংবা অমাবস্যা, মাও সেদিকে তাকিয়ে, আমিও তাকিয়ে, বলে যাচ্ছি কথা, একবোরে ভেতর থেকে। একটা সময় আমার মনে হলো, এই যে আমি মার সঙ্গে মানিকগঞ্জের ভাষায় কথা বলছি, উপভাষায়, কবিতায় এটা পরীক্ষা করে দেখা যায় কিনা। ইংরেজি ভাষায় যে উপভাষাটির সঙ্গে আমাদের কিছু কিছু পরিচয় আছে, সেখানেও এ রকম দেখা গেছে যে স্কটিশ উপভাষায় কবিতা লেখা হয়েছে, রবার্ট তাঁর উপভাষায় কবিতা লিখে অমর হয়ে আছেন। তাছাড়া আমি যখন আমার কাব্যনাট্যগুলো লিখেছি, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নূরল দীনের সারাজীবন, আমার মনে হলো সেগুলোতে যে আঞ্চলিক ভাষার চরিত্রগুলো কথা বলেছে, আমি দেখতে চেয়েছি, চরিত্রগুলো কতটুকু ভার বহন করতে পারে। তো প্রথমেই যে কবিতাটি লিখি, সেটিই 'পরানের গহিন ভিতর'। 
জামার ভিতর থিকা জাদুমন্ত্রে বারায় ডাহুক,
চুলের ভিতর থিকা আকবর বাদশার মোহর,
মানুষ বেকুব চুপ,হাটবারে সকলে দেখুক
কেমন মোচড় দিয়া টাকা নিয়া যায় বাজিকর।
চক্ষের ভিতর থিকা সোহাগের পাখিরে উড়াও,
বুকের ভিতর থিকা পিরিতের পূর্ণিমার চান,
নিজেই তাজ্জব তুমি- একদিকে যাইবার চাও
অথচ আরেক দিকে খুব জোরে দেয় কেউ টান।
সে তোমার পাওনার এতটুকু পরোয়া করে না,
খেলা যে দেখায় তার দ্যাখানের ইচ্ছায় দেখায়,
ডাহুক উড়ায়া দিয়া তারপর আবার ধরে না,
সোনার মোহর তার পড়া থাকে পথের ধুলায়।
এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর
যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহিন ভিতর।      

আমরা জানি, 'পরানের গহিন ভিতর' কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো প্রকাশের পর থেকেই এতকাল ধরে তরুণ পাঠকদের মুখে মুখে ফিরছে। আঞ্চলিক ভাষায় লেখা কোনো কবিতা এ রকম অভূতপূর্ব পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার ঘটনা নিতান্তই বিরল। এই কবিতাগুলোর জন্মকাহিনি শুনে আমার মনে হয়েছিল- এই অদ্ভুত পাঠকপ্রিয়তার কারণটি বোধ হয় এতদিনে বুঝে ওঠা গেল। মায়ের মুখের ভাষায় যে কবিতা রচিত হয়, তার সঙ্গে স্বয়ং কবি কতটা গভীরভাবে সংলগ্ন হয়ে থাকেন, তা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না! আর সেই কবিতা যে তুমুল পাঠকপ্রিয়তা পাবে, সেটি আর অস্বাভাবিক কী?
৪.
তাঁর সঙ্গে যতদিন কথা হয়েছে. তাঁর সম্পর্কে আমার লেখাগুলো নিয়ে কোনোদিন কিছু বলতে শুনিনি। একবার আমি জিজ্ঞেসও করেছিলাম, তিনি খানিকটা লাজুক হাসি হেসে বলেছিলেন-
'তোমাকে ধন্যবাদ দেওয়া ছাড়া আর কী বলতে পারি আমি!'
অদ্ভুত ব্যাপার! নিজের সম্পর্কে আলোচনা নিয়ে এমন নিরাসক্তি অবাক করে দেয় আমাকে- তিনি ক্ষুব্ধ কিংবা আনন্দিত হতে পারতেন, হয়তো হয়েছেনও, কিন্তু তা প্রকাশ করেননি। না, বোধহয় ভুল বললাম। একবার অন্তত বলেছিলেন, কিন্তু একটু ভিন্নভাবে। সেই ঘটনাটি বলি। 
তাঁকে নিয়ে আরেকটি লেখা লিখেছিলাম আমি, 'এক উজ্জ্বল জ্যোতিচিহ্ন' শিরোনামে, সম্ভবত ১৯৯৮ সালে তাঁর জন্মদিন সামনে রেখে। ভোরের কাগজ সাময়িকীতে সেটি ছাপাও হয়েছিল তাঁর জন্মদিনে, বেশ গুরুত্ব দিয়ে। কিন্তু লেখাটা সম্পাদকের কাছে পৌঁছে দিয়েই আমি চলে গিয়েছিলাম ঢাকার বাইরে, যেদিন ছাপা হয়েছে সেদিনও বাইরেই ছিলাম। তখন তো আর মোবাইল ফোনের যুগ নয়, ঢাকার বাইরে যাওয়া মানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা। ফলে তিনি আদৌ লেখাটি পড়েছেন কিনা, জানার উপায় ছিল না। কয়েকদিন পর ঢাকায় ফিরলে মা জানালেন, সৈয়দ হক ফোন করেছিলেন, মার সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প করেছেন এবং আমাকে ফোন করতে বলেছেন। আমি তাঁকে ফোন করলাম। তিনি বললেন-
'তোমাকে একটা কথা বলি শোনো। আমার জন্মদিনে সকালে শামসুর রাহমান এসেছিলেন বাসায়। বললেন, আপনার প্রতি আমি অবিচার করেছি সৈয়দ হক, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমি অবাক হয়ে বললাম, সে কী! কী অবিচার করেছেন আমার ওপর? আমার তো কিছু মনে পড়ছে না। রাহমান বললেন, আপনার কবিতাগুলো পড়লেও গদ্যগুলো ভালোভাবে পড়া হয়নি আমার। আজকে ভোরের কাগজে একটা লেখা বেরিয়েছে, দেখেছেন? একজন তরুণ লেখক লিখেছেন। সেটি পড়ে আমার মনে হলো, আপনার প্রতি আমি দারুণ অবিচার করেছি। আপনাকে মনোযোগ দিয়ে পড়িনি। এই তরুণ আপনাকে যেভাবে বুঝেছে, জেনেছে-  আমি সেভাবে বুঝিনি।' 
সৈয়দ হক থামলেন। আমি তখন বিস্ময়ে বিমূঢ়। খুব তাড়াহুড়া করে ওই লেখাটি লিখেছিলাম, সেটি দেশের অন্যতম প্রধান কবি পড়েছেন এবং পড়ে তাঁর মনে হয়েছে, এর আগে সৈয়দ হককে তিনি যথার্থভাবে বুঝতে পারেননি! একটি লেখার এরচেয়ে বেশি অ্যাপ্রিসিয়েশন আর কী হতে পারে? লেখাটি সৈয়দ হকের কেমন লেগেছে, তা আদৌ বললেন না, কিন্তু শামসুর রাহমানের পাঠ-প্রতিক্রিয়ার কথা জানতে দিয়ে আমাকে বুঝিয়ে দিলেন, লেখাটি কেমন হয়েছে! 
৫.
হ্যাঁ, তাঁর সম্বন্ধে কিছু বলা বা লেখা হলে তিনি কখনোই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন না। অথচ 'খেলারাম খেলে যা' নিয়ে আমার দীর্ঘ আলোচনাটি জুড়ে দিয়েছিলেন তিনি ওই উপন্যাসের নতুন সংস্করণে! তাঁর স্নেহ প্রকাশের, সম্মান জানানোর ধরন ছিল ওরকমই। তাঁর স্বভাবের এই দিকটি সম্ভবত তাঁকে নিঃসঙ্গ করে দিয়েছিল- সবার সঙ্গেই একটু দূরত্ব রেখে চলতেন তিনি, খুব বেশি কাছে যেতে দিতেন না। অথচ তাঁর হৃদয়টি থাকত মমতায়, স্নেহে পরিপূর্ণ- গভীরভাবে লক্ষ্য না করলে ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যেত না। তাঁর রচনাগুলোও কি তাই নয়? বাইরে থেকে তাঁর লেখাগুলো যে রকম, খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়লে সেগুলো অন্যরকম হয়ে যায়। এটা হচ্ছে সেই অন্তর্গত উজ্জ্বলতা- সৈয়দ হক যা ঢেকে রাখতে চাইতেন সব সময়। 
না, আমার কোনো অভিযোগ নেই তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর স্নেহে আমি ধন্য হয়েছি, তাঁর কাছ থেকে অযাচিত সম্মান পেয়েছি, তাঁর  লেখাগুলো আমাকে ঋদ্ধ করেছে। আমি তাঁর স্নেহসিক্ত-মমতাপূর্ণ হৃদয়ের পরিচয় পেয়েছি, তাঁর লেখায় লুকানো ঐশ্বর্যের সন্ধানও  পেয়েছি। 
প্রিয় সৈয়দ হক, আমাদেরকে আপনি নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছেন, আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে নিজের দিকে ফিরে তাকাতে হয়, গৌরবে ভরিয়ে দিয়েছেন আমাদের সাহিত্যকে। আপনি রয়েছেন আমাদের হৃদয়ে, আমাদের আলোচনায়, আমাদের যাপিত জীবনের  ভেতরে। আপনিই সেই আশ্চর্য বাজিকর, যিনি তাঁর বহুবর্ণিল রুমাল নেড়ে চলেছেন আমাদের পরানের গহিন ভিতর।