অশুভ শক্তির বিনাশ, সত্য ও সুন্দরের আরাধনা সার্বজনীন দুর্গোৎসবের মূলমন্ত্র। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে রাজশাহীর তাহেরপুর রাজবাড়ীতে বাংলাদেশে সর্বজনীন দুর্গোৎসব পালনের সূত্রপাত হয় বলে ধারণা পাওয়া যায়। রাজা কংস নারায়ণ রায়ের হাতে শুরু হওয়া এই দুর্গোৎসবের আনন্দ আয়োজন কালের পরিক্রমায় সর্বজনীন সংস্কৃতির রূপ পেয়েছে সারা বাংলায়। সাদা কাশবন, শিশির ভেজা শিউলি, মৃদু কোমল সমীরণে ঢাকের আওয়াজ আর শঙ্খের ধ্বনি শরৎকে করে তোলে অনন্য মহিমান্বিত। প্রতি বছর শারদীয় দুর্গোৎসবের অনাবিল আনন্দ উপভোগ করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ নানা ধর্মের মানুষ। সম্প্রীতির শক্তির কারণেই পূজামণ্ডপে ভিড় জমে সব ধর্মের মানুষের, আনন্দ ভাগাভাগি করেন সমাজের সবাই মিলে। শারদীয় দুর্গোৎসব সম্প্রীতির বন্ধনকে শক্ত করে দেয়।

শারদীয় এই উৎসবের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান অনেকটাই গৌণ হয়, মুখ্য হয়ে ওঠে মানুষের মিলন উৎসব। করোনাকাল ছাপিয়ে যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতির সামনে দাঁড়িয়ে এবারের শারদীয় উৎসবে এটাই আমার প্রার্থনা- যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। মুক্তি চাই মহামারি আর সকল ব্যাধি জ্বরা থেকে, চাই সম্প্রীতির বন্ধন। দেশের ঐতিহ্যগত সম্প্রীতির দর্শন আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে যে অসুর শক্তি বিনাশ হোক, জয় হোক সত্যের, জয় হোক মানবতার, জয় হোক সর্বজনীন সম্প্রীতির। যেভাবে আমরা মানবতা আর সম্প্রীতির হাত ধরাধরি করে পথ চলেছি, সে চলা চিরস্থায়ী হোক, হোক মসৃণ।

অসুরকুলের দৌরাত্ম্য থেকে দেবকুলকে রক্ষায় মাতৃরূপী দেবী দুর্গার আগমন। অসুরদের দলপতি মহিষাসুরকে বধ করে দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা দেবকুলকে রক্ষা করেন। অন্যায় ও অশুভকে পরাস্ত করার মাধ্যমে ন্যায় ও শুভবোধের প্রতিষ্ঠা ঘটে। দেবী দুর্গা সত্য, শুভ ও ন্যায়ের পক্ষের সংগ্রামে মর্ত্যের মানুষকেও সাহসী করে তোলেন। দূর করে দেন যত গল্গানি, হিংসা-বিদ্বেষ, মনের দৈন্য ও কলুষ। যাবতীয় মহৎ গুণাবলির প্রতি দেবী দুর্গা মানুষকে আকৃষ্ট করেন। ফলে সত্য, শুভ ও কল্যাণের এক গভীর প্রতীকী ব্যঞ্জনা নিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসব হয়ে ওঠে সর্বজনীন। দুর্গাপূজা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ নানাভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে যাবতীয় দুঃখ ভুলে গিয়ে হিংসা-বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে প্রীতির মেলবন্ধন রচনার মাধ্যমে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। দেবী দুর্গা বিভিন্ন রূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়ে থাকেন এবং আমাদের সার্বিক মঙ্গল নিশ্চিত করেন বিধায় তিনি সর্বমঙ্গলা। তিনি সব প্রার্থনা ও আরাধনা মঞ্জুর করেন এবং অসাধ্যকে সাধন করেন। তাই তিনি শরণ্য, তিনি গৌরী। দুর্গা দশভুজা নামেও পূজিত এবং আরোধিত হয়ে থাকেন।

মানুষের চিত্ত থেকে যাবতীয় দীনতা ও কলুষতা দূরীভূত করার জন্য। এ জন্য দুর্গোৎসব ধর্মীয় উৎসব হলেও তা সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। সম্প্রদায়গত বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে এক পরম আনন্দের সোপানে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। শারদীয় দুর্গোৎসব সবার জন্য থাকে উন্মুক্ত। দেশব্যাপী বয়ে যাক সম্প্রীতির উৎসবের আনন্দধারা। সাড়ম্বরে দুর্গোৎসব উদযাপনের মধ্য দিয়ে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও কল্যাণময় অবস্থানের বিকাশ আরও বিস্তৃত এবং বিকশিত হবে। অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির প্রসার ঘটবে এই প্রত্যাশা।
সুহৃদ সুনামগঞ্জ

বিষয় : মঙ্গল বারতা সার্বজনীন দুর্গোৎসব

মন্তব্য করুন