করোনা মহামারির প্রভাব পেরিয়ে চিরচেনা সেই উৎসবের আমেজে ফিরেছে দুর্গোৎসব। মণ্ডপ-মন্দিরে চলছে আনন্দ আয়োজন। গত বছরের চেয়ে এবার সারাদেশে বেশি মণ্ডপ-মন্দিরে পূজার আয়োজন হয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্য ধর্মের মানুষ বিভিন্নভাবে এ উৎসবে যোগ দেওয়ায় উৎসব সর্বজনীন রূপ নেয়। পূজার নানা উপকরণ তৈরি, সাজসজ্জা, লাইটিংসহ সংশ্নিষ্ট কাজকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ায় তাঁরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে একে অপরের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে থাকেন।

পূজার এ সময়টা এলেই ছোটবেলার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। কী সুন্দর, কী মধুর ছিল সে সময়, শরতের হিমেল হাওয়া গায়ে লাগতেই মনটা পুলকিত হয়ে যেত দুর্গাপূজার আমেজে। পূজার আগেই ক্ষণ গুনতে ব্যাকুল মন কখন আসবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, হবে মায়ের আগমন। খোঁজ নিতাম কোন কোন মন্দিরে খড়, সুতলি পেঁচিয়ে মূর্তির কাঠামো তৈরি হয়েছে। কখন এক মাটি, দো'মাটি লাগিয়েছে, কোন মন্দিরে কয়টা সিংহ, কোন ভাস্কর কয়টা অসুর দিয়ে মুর্তি গড়ছেন, কোন প্রতিমায় খড়িমাটি বা রং করা হয়েছে এটা প্রথম দেখে বন্ধুদের জানানো ছিল যেন বীরত্বের। তখন বন্ধুদের কাছে গল্পের মূল বিষয় ছিল দুর্গাপূজা। পূজার পাঁচ দিন আগে শুভ মহালয়া, সে কী আনন্দ! মহালয়ার রাতে অপেক্ষায় থেকেছি কখন বেজে উঠবে চণ্ডি পাঠের সেই সুমধুর সুর।

পূজার নতুন পোশাক, প্রতিবেশী বন্ধুদের সঙ্গে পোশাকের তুলনার যেন শেষ নেই। তখন প্রতি পূজামণ্ডপেই নাটক-যাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। সময়, মানসিকতা, আধুনিকতা ও রুচির কারণে গানের ধরনও পরিবর্তন হয়েছে। মণ্ডপে মণ্ডপে প্রাণ ছুঁয়ে যাওয়া জনপ্রিয় ও মার্জিত বাংলা, হিন্দি-উর্দু গান বাজানো হলেও এখন আর সেসব গান শোনা যায় না। ছোটবেলায় দেখেছি, পানিতে প্রতিমা বিসর্জনের নৌকার মধ্যেই লাইটিং করা হতো। চলত গান, হৈহুল্লা, আনন্দ ও আরতি। প্রকৃতি যেন অন্য এক রূপে সাজত। প্রায় ২৫ বছর আগেও নড়াইল শহরের ওপর দিয়ে প্রবহমান চিত্রা নদীর বাঁধা ঘাট ও চরের ঘাট এলাকায় বিশাল মেলার আয়োজন করা হতো। দু'ঘাটে শহরের বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে নৌকায় আনা প্রতিমাগুলো ভিড়ত। সবাই এ দৃশ্য উপভোগ করতেন।

স্কুলে পড়ি তখন পূজা দেখতে বেরিয়েছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গে মন্দিরে মন্দিরে পূজা দেখতে দেখতে জানতে পারলাম, শহরের সনাতন সংঘ মন্দিরে রাতে নাটক ও রূপগঞ্জ সূর্য সেন মন্দিরে যাত্রাপালা হবে। বন্ধু সুজয় কুণ্ডুর সঙ্গে মধ্যরাত পর্যন্ত পূজা, মন্দিরে নাটক ও রাতে যাত্রাপালা দেখে চলে যাই দুলালি দিদির বাড়িতে। এদিকে আমার বাড়িতে না ফেরায় হারিয়ে যাওয়ার সংবাদ গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। আজও সেই ছোটবেলার স্মৃতিময় দিনগুলো মনে দোলা দিয়ে যায়। পুলকিত হই মায়ের আগমনে।

বৈদিক সাহিত্যে মোগল আমল থেকেই দুর্গাপূজা আড়ম্বরভাবে শুরু হয়। পশ্চিমবঙ্গের দিনাজপুরের মালদার জমিদার স্বপ্নাদেশের পর প্রথম পারিবারিক দুর্গাপূজা শুরু করেছিলেন। কলকাতায় ১৬১০ সালে বারিশার রায় চৌধুরী পরিবারে প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেছেন বলে জানা যায়। ১৭৫৭ সালে লর্ড ক্লাইভ পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভ করে রাজা নবকৃষ্ণ দেবকে শোভা রাজার রাজবাড়ীতে দুর্গাপূজার মাধ্যমে বিজয় উৎসবের আয়োজন করতে অনুরোধ করেছিলেন।

ব্রিটিশ বাংলায় এই পূজা ক্রমেই বৃদ্ধি পায় এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে দুর্গাপূজা স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে জাগ্রত হয়। ১৯১০ সালে কলকাতায় প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বারোয়ারি পূজার শুরু হয়। সনাতন ধর্মতসাহিনি সভা, বাগবাজারে (বর্তমান ভারত) সর্বজনীন একটি দুর্গোৎসবের সূচনা করেন, যা জনসাধারণের সম্মিলিত সহযোগিতায় সম্পন্ন হয়েছিল। তারপর থেকে গোটা বাংলায় দুর্গাপূজার প্রচার হয় এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব হিসেবে পরিচিতি পায়। এখন বাংলা ছাড়িয়ে এ উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে দেশে দেশে।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ নামক এই ভূখণ্ডটিতে আজীবন অসাম্প্রদায়িক চেতনা বজায় থাকবে এবং আমরা সবাই একে অপরের সঙ্গে হাতে হাত ধরে চলব, এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

সভাপতি, সুহৃদ সমাবেশ, নড়াইল