'... এসো গো শারদলক্ষ্মী, তোমার শুভ্র মেঘের রথে,
এসো নির্মল নীলপথে...'
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সবুজ রঙের কচি ডাঁটার ওপর সাদা কাশফুল, আকাশে সাদা নীলের খেলা, মৃদুমন্দ বাতাস, হুটহাট ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর ঘাসের ওপর চাদরের মতো পড়ে থাকা শিউলি বলে দিচ্ছে প্রকৃতিতে শরৎ চলছে। শুভ্রতার এক মোহনীয় আবেশ নিয়ে হাজির হয়েছে ঋতুর রানী। ফেসবুকে স্ট্ক্রল করলেও দেখা মিলছে শরৎ যাপনের ছবি। এ ঋতুর মোহনীয় প্রকৃতি যেমন মনপ্রাণকে দোলা দেয়, তেমনি আন্দোলিত হওয়ার দোলা দিয়ে যায় ফ্যাশনেও। প্রকৃতির স্নিগ্ধতা মানুষের মনেও শুভ্রতা নিয়ে আসে। তাই তো পোশাকের ব্র্যান্ড ও ফ্যাশন হাউসগুলো নীল ও সাদাকে প্রাধান্য দিয়ে পোশাক নিয়ে এসেছে।

হাউসগুলো ঋতুর সঙ্গে মিল রেখে বিভিন্ন পোশাকে ফুটিয়ে তুলেছে শরতের প্রকৃতি। কখনও শাড়ির আঁচলে এক টুকরো নীল আকাশ, আবার কখনও সালোয়ার-কামিজে কাশবন দোলা দিয়ে যায় এমন নকশা। নীল-সাদা আকাশে সাদা মেঘ, সবুজ প্রকৃতিসহ প্রকৃতির নানা রং ফুটে উঠে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, শাড়ি, টি-শার্ট, শার্টসহ বিভিন্ন পোশাকে।

নীল রং খুব সহজেই মনে শান্ত ভাব জাগিয়ে তোলে। এ রং আভিজাত্য, শান্তি, একতা ও সম্প্রীতির ভাবও প্রকাশ করে। এ ছাড়া শরতের পোশাকের থিম রং হিসেবেও নীলকে ধরা হয়। তাই কমবেশি সব পোশাকেই নীলের বিভিন্ন শেডের সঙ্গে অন্যান্য রঙের মিশেল থাকে।

কাপড় যেমন :নাগরদোলাসহ অন্যান্য ফ্যাশন হাউসে সুতি, জর্জেট, সিল্ক্ককে প্রাধান্য দিয়ে শরতের পোশাক নিয়ে এসেছে। এ ধরনের ফেব্রিকের পোশাক ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় থাকে। কারণ সিল্ক্ক, জর্জেট হুটহাট বৃষ্টিতে ভিজে গেলেও শুকিয়ে যায় তাড়াতাড়ি। বিড়ম্বনা যায় কমে। তবে বিশ্বরঙের স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার বিপ্লব সাহা বলেন, 'গরমের কথা মাথায় রেখে আরামদায়ক সুতি, লিনেন, ভয়েল, স্লাব কটন কাপড়কে প্রাধান্য দিতে পারেন।'
সারার ফ্যাশন ডিজাইনার শামীম রহমান বলেন, 'সিল্ক্ককে প্রাধান্য দিয়ে ছেলেমেয়ে ও শিশুদের বিভিন্ন পোশাক নিয়ে শরৎ আয়োজন সাজিয়েছি। শরতের সঙ্গে যেহেতু শীতের আগমন জড়িয়ে আছে, সেহেতু আমরা হালকা ওয়েটের (ওজন) শাল, হালকা ডেনিমের কুর্তিসহ বিভিন্ন পোশাক রাখছি।'

শরতের পোশাকেও টাই-ডাই, ব্লক, বাটিক, অ্যাপলিক, কাটওয়াক, স্ট্ক্রিনপ্রিন্ট, এমব্রয়ডারি ইত্যাদির মাধ্যমে ভ্যালু অ্যাড করা হয়েছে। পোশাকের ব্র্যান্ড কে-কদ্ধ্যাফটের সুতি, লিনেন, সুইস কটন, রেমি কটন, সিল্ক্ক, হাফ সিল্ক্ক ও জর্জেট কাপড়ে তৈরি পোশাকগুলোতে নকশা ফুটিয়ে তুলতে ব্লকপ্রিন্ট, স্ট্ক্রিনপ্রিন্ট, হাতের কাজ ও এমব্রয়ডারি করা হয়েছে।

যেমন মোটিফ :বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস ও অনলাইন পেজ দেখে জানা যায়, শরতের শাড়ি, থ্রিপিস, সিঙ্গেল কামিজ, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, শার্ট ইত্যাদি পোশাকে তুলে ধরা হয়েছে প্রকৃতি থেকে নেওয়া ফ্লোরাল মোটিফ, সাদা রঙের বিভিন্ন গ্রাফিক্যাল জ্যামিতিক ফর্ম। দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড কে-কদ্ধ্যাফট এবারের শরৎ আয়োজন সাজিয়েছে 'আলাম' মোটিফ ও 'সাশিকো' স্টিচে। সাধারণ ঘরানার প্যাটার্নের সঙ্গে পাশ্চাত্যের প্যাটার্নের মিশেলে এনেছে নতুনত্ব। রং এবং ট্রেন্ডি প্যাটার্নের সমন্বয়ে সময়, আবহাওয়া ও পরিবেশ উপযোগী নানা পোশাক রেখেছে এ কালেকশনে। শুভ্র কাশবন, সাদা মেঘের ভেলা আর প্রশান্ত নীল আকাশকে প্রাধান্য দিয়েও ডিজাইন করা হয়েছে শরতের পোশাক।

সারার ডিজাইনার শামীম রহমান বলেন, 'মোটিফের ক্ষেত্রে জিওম্যাট্রিক ও অ্যাবস্টার্ক বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকি। এবারের কালেকশনে অ্যাবস্টার্ক মোটিফ বেশি ব্যবহার করেছি।'

রং যেমন :নীল বর্ষার রং হলেও শরতের সঙ্গে রয়েছে ঘনিষ্ঠতা। সে জন্য নীলের বিভিন্ন শেডের পোশাক তরুণদের কাছে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এ ছাড়া সাদা, পাতা সবুজ, বেগুনি, ম্যাজেন্টা, কমলা ও লালের ব্যবহূত পোশাক রয়েছে শরতের আয়োজনে। তবে এ সময়ে সুতি, লিনেন কাপড় এবং সাদা শেডের রং এড়িয়ে যাওয়াই ভালো বলে মনে করেন ফ্যাশন ডিজাইনাররা। পোশাকের রঙের ক্ষেত্রে গাঢ় রং বেছে নেওয়ার পরামর্শ ফ্যাশন ডিজাইনাদের।

অনুষঙ্গ যেমন :এ ঋতুতে ব্যবহারের জন্য কিংবা কাশবাগানে ঘুরতে গেলে সুতি পোশাকের সঙ্গে রঙিন চটি জুতা, নাগরা বা হালকা উঁচু জুতা ভালো মানাবে। হঠাৎ বৃষ্টিতে ভিজে গিয়ে পরার অনুপযোগী হয়ে যায় এমন জুতা এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। গতানুগতিক ধারা থেকে কিছুটা ভিন্ন হ্যান্ডব্যাগ বেছে নিতে পারেন। চটের বা কাপড়ের ব্যাগ কিংবা রঙিন কাপড়ের থলে। সঙ্গে অলংকরণে চুমকি, ডলার ব্যবহূত দেখে নিতে পারলে আপনাকে এক ভিন্নতা এনে দেবে।

শরতের সাজ :সময়টা রোদ-বৃষ্টির, তাই সাজের ক্ষেত্রে উপকরণটি যেন পানি নিরোধক হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। বনশ্রীর স্পা ব্রাইডালের বিউটি এক্সপার্ট মনি ইসলাম দিয়েছেন শরতের সাজের পরামর্শ। শরতেই প্রকৃতিতে কিছুটা শীতের আমেজ ধরা পড়ে। তাই এ সময়ে ত্বক শুস্ক থাকে। এতে মরা কোষের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই মেকআপ করার আগে ত্বক ভালোভাবে পরিস্কার করতে হবে। সাজে স্নিগ্ধ ভাব রাখতে হালকা মেকআপ বেছে নিতে পারেন। সাজ শুরু করার আগে ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ট্ক্রিন লাগাতে হবে। তারপর প্রাইমার দিয়ে ১০ মিনিট রাখতে হবে। এরপর সাজ শুরু করা যাবে।

চোখ ও ঠোঁট রঙিন করে রাঙানোর পাশাপাশি সাজে যেহেতু স্নিগ্ধ ভাব ধরে রাখবেন, তাই বেইজ মেকআপ খুব ভারী না করে শুধু প্রাইমার আর বিবি ক্রিম দিয়ে হালকা একটি বেইজ করুন। এরপর ফেসপাউডার দিয়ে বেইজ মেকআপ শেষ করুন। চোখ সাজানোর আগে প্রথমেই চোখের পাতার ওপরে প্রাইমার কিংবা ফেসপাউডার দিয়ে নিন; এতে চোখে ব্যবহূত রংগুলো খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠবে। দিনের বেলায় চোখে কাজল, নীল মাশকারা আর নীল আইলাইনার দিতে পারেন। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে কয়েক রঙের রঙিন কাজলের রেখাও এঁকে দিতে পারেন চোখের কোণে। সবশেষে লাগিয়ে নিন পছন্দমতো ম্যাট লিপস্টিক। লিপস্টিকের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারেন কমলা, লাল ও ম্যাজেন্টা রং।

 চুলের সাজে খোঁপা, বেণি সবকিছুই ভালো লাগবে। তবে শরতে খোলা চুল এনে দেয় ভিন্ন সৌন্দর্য। চুলে গুঁজে দিতে পারেন শরতের ফুল। চুল খোলা রেখে কানের পাশে শুধু একটি দোলনচাঁপা গুঁজে দিলেও দেখতে ভালো লাগবে।