আমরা কায়াক নৌকা চালাব। হ্রদের স্থির পানি কেটে কেটে আমাদের নৌকা এগোবে সেখানে; যেখানে মিশেছে পাহাড়ের নিস্তব্ধতা, পানির ছোট ছোট ঢেউভাঙা শব্দ, পাখির কলতান, শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি, ঝিঁঝি পোকার ডাক আর লেক ঘেরা সবুজ শান্ত কিনারা। এই প্রশান্ত সবুজ আর মিষ্টি গুঞ্জনের সঙ্গে সঙ্গে আপনি যখন লেকের এক পার থেকে অন্য পারে কায়াক প্যাডেল করে এগিয়ে যাবেন, আপনি যেন ধীরে ধীরে এক মায়ার জগতে প্রবেশ করবেন।

হ্যাঁ, আপনি আসছেন মহামায়া লেকে। দেখতে- কীভাবে একেবারে গ্রামীণ বাংলায় এখানে পর্যটন গড়ে উঠেছে, কীভাবে এই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ পর্যটককে বিভিন্ন সেবা দিচ্ছে, এর পাশাপাশি বাঁচিয়ে রাখছে তাঁদের এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য।

পর্যটক এবং আগ্রহীরা এই ইকো-ট্যুরিজম সুবিধা থেকে বিভিন্ন পরিষেবা পেতে পারেন। ফটোগ্রাফার পরিষেবা থেকে শুরু করে ট্যুরিস্ট গাইড, ক্যাফেটেরিয়া থেকে ক্যাটারিং পরিষেবা, পরিবহন এবং ক্যাম্পিং পরিষেবা, কায়াক এবং ভাড়া নৌকায় চড়া- সবই উপভোগ করার সুযোগ রয়েছে।

কেন মহামায়ায় যাবেন? এমন প্রশ্ন মনে দানা বাঁধতেই পারে। স্থানীয়দের কাছ থেকে শুধু কায়াক নৌকায় নয়, আপনি পেতে পারেন আরও নানান পরিষেবা। মহামায়া লেকে নৈসর্গিক সৌন্দর্য যখন আপনাকে মায়ার বাঁধনে বেঁধে ফেলবে, তখন আপনি সন্ধ্যার পর ফেরার প্রস্তুতি না নিয়ে বরং থেকে যেতে পারেন স্থানীয় কোনো হোম-স্টে পরিষেবা প্রদানকারীর বাসায়। এটি এমন একটি জায়গা, যা এখনও একটি জনাকীর্ণ বাণিজ্যিক পর্যটন স্পট হয়ে ওঠেনি। তবে আপনার প্রয়োজনীয় সমস্ত সেবা ও সুবিধা দিয়ে আপনাকে স্বাচ্ছন্দ্য এবং সবুজ পাহাড় ও হ্রদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ করে দেবে।

আপনি যদি এখানে আপনার পরবর্তী ভ্রমণের পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে আপনার গন্তব্য নিশ্চিত শুধু মহামায়া হ্রদে সীমাবদ্ধ থাকবে না। একটি খাঁটি এবং উষ্ণ ক্যাম্পিং অভিজ্ঞতার পরে আপনি বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকতে নেমে যেতে পারেন। দেখতে পারেন তেঁতুলগাছের সারি এবং একটি নবগঠিত বালির ক্ষেত্র, বোটানিক্যাল গার্ডেন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, উদ্ভিদের জেনেটিক পুল এবং ইকো-পার্ক। উদ্ভিদ এবং প্রাণী ছাড়াও গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকতে যেতে পারেন বন-সমুদ্রের গভীরে কীভাবে মিশে গেছে, তা দেখতে এবং খৈয়াচোরা জলপ্রপাতের একেকটি ট্রেইল দেখতে পাহাড়ে উঠুন। আর ভাটিয়ারী হ্রদের ওপর নৌকায় করে সূর্যাস্ত দেখার পরিকল্পনা একেবারেই বাদ দেওয়া যাবে না।

ইকো-ট্যুরিজম এমন একটি পর্যটন ব্যবস্থা, যেখানে পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে প্রকৃতি উপভোগ করতে দেয়, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে দেয়। ইকো-ট্যুরিজম প্রাকৃতিক এলাকায় দায়িত্বশীল ভ্রমণ, যা পরিবেশ সংরক্ষণ করে, স্থানীয় জনগণের মঙ্গল বজায় রাখে।

ইকো-ট্যুরিজমের উদ্যোগটি পরিচালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ) ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সহযোগিতা সংস্থা ইয়াং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা) দ্বারা। গ্রামীণ যুবক, মহিলা ও পুরুষদের জীবনযাত্রার উন্নতির লক্ষ্যে প্রকল্পটি কাজ করে থাকে।

যেখানে আপনি বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, প্রাণবন্ত শহরগুলো দেখতে পাবেন এবং মানুষের আতিথেয়তা, সংস্কৃতি এবং উষ্ণতার অভিজ্ঞতা পাবেন; সেখানে 'মহামায়া' নামের একটি হ্রদ আপনাকে পাহাড়, ঝরনা এবং স্বচ্ছ পানির স্নিগ্ধতা অনুভব করতে দেবে। গুগল ম্যাপে আপনি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মিরসরাইয়ের মহামায়া দেখতে পাবেন, যা চট্টগ্রাম শহর থেকে ৯০ মিনিটের দূরত্ব।