বৈশাখে রোদের দুপুর ঘন হয়ে নামে। কৃষ্ণনগরের বটতলার পূর্ব দিকে জলশঙ্খ নদী আর পশ্চিমে পাকা রাস্তা চলে গেছে উত্তরে উপজেলা শহর দ্বীপচন্দ্রগড়ের দিকে। বহুদূর পর্যন্ত খাঁ খাঁ প্রান্তর। নদীতীর ছুঁয়ে কখনও কখনও কড়চের ঝাড়। পশ্চিমের মাঠে বহুদূরে একা একটি হিজল। এই বৈশাখের দুপুরের রোদে যে দিকে তাকানো যায়- দূর-বহুদূর পর্যন্ত চোখে পড়ে বাষ্পের বুদবুদ। সেই বুদবুদ কেটে একটা রঙিন সাইকেল ধীরগতিতে এসে থামে বটতলায়। সাইকেলটি রমণীমোহন। কেননা রমণীদের সাজগোজের নানান উপকরণে সাজানো। এই সাইকেল দৃশ্যত একজন ফেরিওয়ালার, যার নাম সাইফুল ইসলাম। সাইফুল ইসলাম দীর্ঘ রোদের পথ পাড়ি দিয়ে এসে বটতলার ছায়ায় থামে। কৃষ্ণনগরের মানুষজন তখন ব্যস্ত। বৈশাখে হাওরে কাজের কোনো লিঙ্গভেদ নেই। নারী-পুরুষ সবে লেগে আছে ধানের কাজে। ধান ছড়ানো, শুকানো, সেদ্ধ করা। খড় শুকানো। খড়ের গাদা তৈরি। কাজের শেষ নেই। তারপর ঢল আসার আগেই ভিটেগুলো বাঁশ দিয়ে বেড় দিতে হবে। না হলে ভিটেমাটি সব ধুয়ে নিয়ে যাবে জলের ঢেউ। বড়রা তো বটেই, ছেলেপুলেরাও ব্যস্ত ধান-বনের কাজে। শিশুরা দলবেঁধে মাঠে মাঠে কুড়িয়ে যাচ্ছে পড়ে যাওয়া ধানের শীষ। ধান কাটার সময় কিংবা বহনের সময় এক-দুইটা ধানের শীষ যে পড়ে যায় সেগুলোই কুড়িয়ে জমিয়ে জমিয়ে শিশুরা তৈরি করছে নিজস্ব সম্পদ। এই দিয়ে জিলেপি কেনা যায়। কেনা যায় হাওয়াই মিঠাই কিংবা আইসক্রিম। আবার খেলনাও পাওয়া যায় ফেরিওয়ালার কাছ থেকে। তাই এ দুপুর কৃষ্ণনগরে মূলত অবসরহীন। তথাপি চুলের ফিতা, নেইলপলিশ, লিপস্টিক ইত্যাদি সাইকেলে সাজিয়ে নিয়ে কৃষ্ণনগরে প্রবেশ করে সাইফুল ইসলাম। এবং বটতলায় জিরিয়ে নিয়ে বাজারের পাশ ঘেঁষে সাইফুল ইসলাম এগিয়ে গিয়ে চৌধুরীহাটিতে হাঁক ছাড়ে, 'এই রাখবেন চুড়ি ফিতা নউকপালিশ, লিবিস্টিক!' তার ডাক শুনে ব্যস্ত রমণীকুলের কেউ কেউ চোখ তুলে দেখে কিন্তু সাড়া দেয় না। কেউ হয়তো খলায় শুকোতে দেওয়া ধান পা চালিয়ে নেড়ে দিচ্ছে, কেউ-বা কুলাতে ধান তুলে বাতাসে উড়িয়ে দিচ্ছে। চিটাধানগুলো বাতাসে উড়ে পড়ছে দূরে। আর ঝনঝন শব্দে ভালো ধানগুলো জমা হচ্ছে নিচে। আবার কেউ কেউ ধান সেদ্ধতে অথবা চাক চাক করে গোবরের জ্বালানি বানাতে ব্যস্ত। গোবর এখানে অমূল্য বস্তু। গোবরের চাকতি দিয়ে রান্না হবে। পুরো আট মাসের জ্বালানি এই সময়ে জমিয়ে রাখতে হবে। না হলে রান্না চলবে না। আর নারীদের ভেতর যারা অবিবাহিত তারাও হয়তো ব্যস্ত থাকে পরিবারের দুধের শিশুদের নিয়ে কিংবা সংসারের এটা সেটাতে। আর সাইফুল ইসলামের ডাক দুপুরের নির্জনতা ভেঙে খুব একটা গভীরে প্রবেশও করে না। একে তো সে কড়া রোদে পোড়া ক্লান্ত, তারপর তৃষ্ণার্ত। ফলত চৌধুরীহাটি থেকে সাইফুল ইসলামকে কেউ ডাকে না। বলে না, 'ওই ফেরিওয়ালা এই দিকে আসো।' খলাতে শুকাতে দেওয়া ধানে পা দিয়ে নেড়ে দিচ্ছিল একজন। তার হাতের শাঁখা ও কপালের সিঁদুর দেখে সাইফুল বুঝতে পারে নারীজন হিন্দু। তার কাছে সে জানতে চায় মুসলিমহাটি কোন দিকে। নারীটি না থেমে, ধানে পা চালিয়ে এগোতে এগোতে হাত উঁচিয়ে মুসলিমহাটির অবস্থান জানিয়ে দেয়। বলে যে, 'ওই পথে যাইন। শেষের হাটিটাই মুসলিমহাটি।' সাইফুল ওই নারীর কাছ থেকে এও নিশ্চিত হয়ে নেয় যে, মুসলিমহাটিতেই আমিন শেখের বাড়ি। সাইফুল আর 'চুড়ি ফিতা নউকপালিশ' বলে হাঁক তুলে না। সরুপথ ধরে সাইকেল চালিয়ে সে এগিয়ে যায় মুসলিমহাটির দিকে। ভেতরে ভেতরে সে বেশ উত্তেজিত। ফলত তার শ্বাস-প্রশ্বাসে দ্রুত লয়। কিছুটা পথ এগিয়ে সে সাইকেল থেকে নেমে একটা হিজলের ছায়ায় দাঁড়ায়। সাইকেলটা স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে ঘামে ভেজা খয়েরি শার্টটার বুকের বোতাম খুলে দিয়ে কিছুটা বাতাস তার শরীরে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে। হাতের তালুতে মুছে নেয় মুখের ঘাম। যে কেউ তাকে দেখলেই বুঝবে সে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। আদতেও তাই। সে একবার ভাবছে মুসলিমহাটি অবধি যাবে। আরবার ভাবছে ওখান থেকেই ফিরে যাবে কিনা। অথচ সেই সকাল থেকে দীঘলপথ সে পাড়ি দিয়ে এসেছে শরমিনের মুখোমুখি হবে বলে। কম করে হলেও ত্রিশ কিলোমিটারের পথ। ওর বাড়ি নীহলডাঙ্গায়। আর জেলার আর উপজেলায়। নীহলডাঙা স্থলদেশ ও জলদেশের সীমানায় অবস্থিত। অর্থাৎ নীহলডাঙার পর থেকেই হাওর অঞ্চলের শুরু। পুরোটা পথ সে সাইকেল চালিয়ে এসেছে। শরমিনকে একবার দেখার জন্য। শরমিনের বাড়িও নীহলডাঙায়। মাস ছয়েক আগে এই গ্রামে, কৃষ্ণনগরে আমিন শেখের বউ হয়ে এসেছে। শরমিন মূলত সাইফুলের পাশের পাড়ার মেয়ে। তাদের প্রেম ছিল।
২.
সমুদ্রশহরে বেড়াতে গিয়েছিল সাইফুল। সে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিল। ফেল করে আর পড়াশোনা হয়নি। গ্রামেই কিছু একটা করার ইচ্ছে ছিল। ভাবল কাজকর্ম শুরুর আগে একটু সমুদ্র দেখে আসি। সমুদ্রশহরে গিয়ে সেখানে পরিচয় হয় মানিক মৃধা নামের একজনের সাথে। মানিক মৃধা বলেছিল, 'আমার সাথে কাম করো মিয়া। ছয় মাসেই লাখ টাকা পাবা। ফিরা গিয়া ব্যবসা বাণিজ্য করবা।' সাইফুল ভেবছিল, মন্দ না; লাখ টাকার মতো পেলে ধানের জমিটা আর বন্ধক রাখতে হবে না। যে টাকা সে পাবে তা বিনিয়োগ করতে পারবে। কিন্তু মানিক মৃধা যে ইয়াবা কারবারির সাথে যুক্ত সে কথা ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। মানিক মৃধার সাথে চলতে গিয়ে একদিন ইয়াবাসহ ধরা পড়ল পুলিশের হাতে। ভ্রাম্যমাণ আদালতে এক বছরের জেল হয়ে গেল তার। পুলিশে আটক হওয়া ও জেলে যাওয়ার কথা লজ্জায় বাড়িতে জানায়নি সে। না মাকে, না শরমিনকে। বছরখানেক জেল কেটে যখন বাড়ি ফিরল। দেখল এক বছরে তার পৃথিবী থেকে সে অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছে। হারিয়ে ফেলেছে শরমিনকে। শরমিনের বিয়ে হয়ে গেছে।
মানুষ মূলত এমনই হয়- চোখের আড়াল হলে ধীরে মুছে যায় সব আবেগ, অনুভূতি। একটা বছর অপেক্ষা করতে পারল না শরমিন!- অভিমানে লীন হয়ে যেতে ইচ্ছে করে সাইফুলের। আবার ভাবে, কী-ই-বা করার ছিল শরমিনের, মেয়ে মানুষ। ইচ্ছের বাইরে গিয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে হয় তাদের। শুনেছে শরমিনের বাপ-ভাই জোর করেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। সাইফুলের ফোনও ছিল না। ছিল না যোগাযোগ করার কোনো উপায়। সবাই ভেবেছে সাইফুল হয়তো সমুদ্রে ডুবে মরেছে। অপেক্ষায় থেকে থেকে সাইফুলকে মৃত ভেবেই নাকি বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে শরমিন। শরমিন কি এখনো জানে না সাইফুল বেঁচে আছে! নিশ্চয়ই জানে! জানার পর একবারও কি শরমিনের সাইফুলের সাথে কথা বলার ইচ্ছে হয়নি! সাইফুলের ফোন তো খোলাই ছিল ফেরার পর থেকে। আগের সিমটাই তো সে উঠিয়ে নিয়েছিল। এত নিঠুর শরমিন! এতো সহজেই ভুলে গেল সব! কী বাকি ছিল সাইফুলের সাথে! আকাশ-বাতাস-আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তারা কি বিবাহিত ছিল না মনে মনে! কেউ না জানুক শরমিন তো জানে, তারা আদতে স্বামী-স্ত্রীই ছিল। একটা চার দেয়ালের ঘরের স্বপ্টম্ন নিয়ে কত কত সন্ধ্যা, গাঢ় রাত্রিতে বাঁশঝাড়ে পরস্পর চুম্বনরত মিলনরহিত অস্থির সময় পার করে এসেছে! একটা ঘর হলেই সব হবে। আরও গভীরে, আরও গহীনে পৃথিবীর ফুল সুগন্ধ ছড়াবে। কিন্তু হায়! সবই কেমন মিথ্যে হয়ে যায়!
৩.
সাইফুল ভুলে যেতে চেয়েছিল শরমিনকে। কিন্তু যতই ভুলতে চায় ততই শরমিন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে মগজে। কী এক তীব্র বেদনা জেগে ওঠে তার বুকের ভেতর! গলার কাছটায় কী যেন এক অবোধ ব্যথা জমা হয়ে থাকে। দম ফেলতে কষ্ট হয়। চিৎকার করতে ইচ্ছে হয়। মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে হয়। একটা ভুল মানুষের সাথে পরিচয় সাইফুলের জীবন যেন তছনছ করে দিয়েছে। এখন সে কীভাবে বাঁচবে? তার জেল-জীবনে একটা একটা করে দিন গুনে গুনে সে কাটিয়েছে জীবনে ফিরে আসার প্রত্যাশায়। মাদক ব্যাবসার সাথে জড়িত জানতে পারলে যদি শরমিনকে হারাতে হয় এই ভয়ে সে পরিবার-পরিজন কাউকেই জানাতে চায়নি তার জীবনের দুর্ঘটনার বিষয়। শেষ অবধি এই মাশুলই গুনতে হলো তাকে!
এই ভরদুপুরে হাওরের উত্তপ্ত বাতাসে দিশেহারা বোধ করে সাইফুল। ভীষণ তেষ্টায় তার বুক ফেটে যেতে থাকে। সে যেখানটায় দাঁড়িয়ে আছে সেটা মূলত নয়াহাটির সামনে। মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই মুসলিমহাটি। এখানে আসবে ভেবে গত এক মাস ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল সাইফুল। শরমিনের সাথে ফোনে কথা বলতে বহুবার সে চেষ্টা করেছে। তার যে মোবাইল নাম্বার সে সংগ্রহ করেছিল সে নাম্বারে ফোন দিলে একজন পুরুষ রিসিভ করে। খুব সম্ভবত আমিন শেখ। প্রতিবার পুরুষ কণ্ঠ শুনে সাইফুল ফোন কেটে দেয়। এরপর সিদ্ধান্ত নেয়, যা আছে কপালে, সরাসরিই দেখা করবে শরমিনের সাথে। এ ভাবনা থেকেই একটা সাইকেল নিয়ে ফেরিওয়ালা সেজে আজ তার কৃষ্ণনগরে আসা। সাইফুল শুনেছে আমিন শেখের বড় দোকান আছে। হাওরে বিঘার পর বিঘা জমি।
সাইফুল হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেয়, যাবে না মুসলিমহাটিতে। শরমিনের মুখ আর সে দেখবে না। তার মুখও আর সে শরমিনকে দেখাবে না। মৃতই থাকবে সে। এই ভেবে ফিরে যেতে চায়। যে দিক থেকে এসেছিল সে দিকে জোরে সাইকেল চালায়। কিন্তু কী ভেবে ফের সাইকেল ঘুরিয়ে মুসলিমহাটির দিকেই যেতে থাকে। মুসলিমহাটির কাছে এসে সে হাঁক ছাড়ে, 'এই রাখবেন চুড়ি, ফিতা, লিবিস্টিক...'।
৪.
পৃথিবীর মুসলিমহাটিতে তখন দুপুর গড়িয়ে পড়ছে। হাটিটা খুব একটা দীর্ঘ নয়, একটাই পাকা বাড়ি। সাইফুল ভাবে, এইটাই তবে আমিন শেখের বাড়ি হবে। এই বাড়িতেই তবে রয়েছে শরমিন। সে পাকাবাড়ির সামনে এসে প্রথমবারের মতো গলা উঁচিয়ে হাঁক ছাড়ে, 'এই রাখবেন নাকি রঙিন চুড়ি, লাল লিবিস্টিক....' এক কিশোরী একটা বাঁশের বেঞ্চিতে বসে কাঁচা আম কামড়ে খেতে খেতে সাইফুলকে ডাক দেয়, 'ও ভাই লিবিস্টিকওয়ালা এইদিকে আসেন।' সাইফুল হাটির ঢাল বেয়ে উপরে উঠে কিশোরীর সামনে সাইকেল স্ট্যান্ড করে বাঁশের বেঞ্চিতে বসে পড়ে। কোমরের গামছা খুলে ঘাম মোছে। কিশোরীর দেখাদেখি আরও কয়েকজন কিশোর-কিশোরী ও শিশু এসে ভিড় করে মুহূর্তে। কাঁচা আম খাওয়া শেষ করে শাদা আঁটিটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে কিশোরী সাইফুলের কাছে জানতে চায়, 'কী কী আছে আফনের কাছে?' যেহেতু ফেরিওয়ালা হিসেবে সাইফুল মোটেও দক্ষ নয়, এবং বেচাবিক্রির দিকেও তার মন নেই, তার মন চঞ্চল হয়ে আছে শরমিনকে দেখার জন্য, সে ভাবছে- এই বুঝি শরমিন চলে এলো। শরমিনকে সে কী কী বলবে, কীভাবে অভিনয় করবে সব ঠিক করা। যেন সে সেই আগের সাইফুল না। শরমিনকে সে চেনেও না কোনোদিন। খুব দক্ষ ফেরিওয়ালার মতো বিক্রি করে দেবে যাবতীয় জিনিস। কোনো কিছু যদি শরমিন কিনতেও চায় ডবল দাম নেবে সে। তারপর সব বিক্রিটিক্রি করে অচেনা মানুষের মতোই সে ফিরে যাবে। আর কোনোদিনও সে শরমিনের সামনে আসবে না। মনে মনে এইসব ভাবছিল সাইফুল। কথা বলছে না দেখে কিশোরী ফের জানতে চায়, 'ও ভাই, কী কী আছে?' সাইফুলের ভাবনার জগতে ছেদ পড়ে, পৃথিবীতে ফেরে। হাত-পা ছেড়ে দিয়ে ক্লান্ত স্বরে বলে, 'কিছুই নাই আসলে।' এই বলেই সে নিজেকে একটু শুধরে নেয়। বলে, 'লিবিস্টিক, চুড়ি, নউকপালিশ, ক্লিপ আছে। তুমি কী কিনবা?' কিশোরী বিক্রেতার এইরূপ কথা বলা শুনে মজা পায়। বলে, 'কী কী লিবিস্টিক আছে দেখান।' সাইফুলের বেঞ্চি ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না। সে চারপাশে চোখ রাখে। এই ভরদুপুরে হাটির বেশিরভাগ লোকেরা এখন দক্ষিণের খলায়। সেখানে চলছে ধান শুকানোর কাজ। ফলে হাটিতে খুব একটা মানুষজন দেখা যাচ্ছে না। সাইফুলের সাইকেলে ঝোলানো ক্লিপ, চুড়ি ইত্যাদি কিশোর-কিশোরীরা ছুঁয়ে-টুয়ে দেখছে। সে দিকে খেয়াল নাই সাইফুলের। খুব সজাগ দৃষ্টি রাখছে শরমিনের জন্য। এই বুঝি সে এলো! সে এলে একবার তাকিয়েই আর তাকাবে না সাইফুল। ক্রেতা হিসেবে পাত্তাই দেবে না শরমিনকে। খুব যত্ন করে আর আদরে সে জিনিসপাতি দেখাবে। কিন্তু শরমিন তাকে দেখে কি চমকাবে? স্তব্ধ হয়ে যাবে? জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে? কী করবে শরমিন? আদরের শরমিন... ভালোবাসার। চোখ ভিজে ওঠে সাইফুলের। বুকে উথাল-পাতাল। ঘন শ্বাস পড়ে তার। কিশোরী সাইফুলকে এমন চুপ থাকতে দেখে তার কাছে গিয়ে বলে, 'কই? লিবিস্টিক দেখান!' সাইফুলের বড় আলস্য বোধ হয়। তার বেঞ্চিতে শুয়ে জীবনের মতো ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। সে সাইকেলে ঝোলানো, কাপড়ের ব্যাগটা দেখিয়ে বলে, 'ওই ব্যাগের মধ্যে আছে। খুইল্যা দেখো।' কিশোরী এমন ফেরিওয়ালা আগে কখনো দেখে নাই। সে অবাক হয়। সাইফুল অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলে, 'বইনগো, পানি তেষ্টায় বুকটা ফাইট্টা যাইতাছে, একটু পানি খাওয়াও আগে পরে দেখাইতাছি সব।' কিশোরীটি সাইফুলের পাশে বসে পড়ে। গলা ছেড়ে কাকে যেন ডাকে, 'ভাবী! একজগ পানি আর একটা গ্লাস দেও। ফেরিওয়ালা ভাই পানি খাইতো।'

সাইফুল ভাবে, হয়তো শরমিন এই গ্রামে থাকে না। শুনেছে আমিন শেখের বড় দোকান আছে উপজেলা শহরে। সেখানেই হয়তো থাকে সে। শুধু শুধু আসা হলো এই গ্রামে। কিশোরীর কাছে আমিন শেখ সম্পর্কে জানতে চাইবে কিনা একবার ভাবে সে। এর মাঝে দুই শিশু কিছু একটা নিয়ে ঝগড়া লাগিয়ে দিয়েছে। দুইজনে কুস্তি করছে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে। কিশোরী ও আর আররা সেই দিকে মনোযোগী হয়ে ওঠে। কয়েকজন শিশু হৈ হৈ করে ওঠে, 'দেখি কেডা জিতে! সাদ্দাম না হারিছ!' শিশুদের থামিয়ে দেয়ার মতো শক্তি ও ইচ্ছে কিছুই যেন অবশিষ্ট নেই সাইফুলের। পৃথিবীর সবকিছুকেই ভীষণ বিরক্তিকর মনে হয়। শিশুদের কুস্তির দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে তার মন বিষিয়ে ওঠে। ঠিক তখন পানিভর্তি একটা জগ আর গ্লাস হাতে নিয়ে শরমিন এসে সাইফুলের সামনে দাঁড়ায়। অস্ম্ফুট স্বরে শরমিনের কণ্ঠ থেকে নিসৃত হয় 'সাইফুল ভাই!' সাইফুল শরমিনের দিকে তাকিয়ে পৃথিবীর সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কলাপাতা রঙের একটা শাড়িতে লাল লাল ফুল ফুটে আছে শরমিনের গায়ে। এক বছর চার মাস চৌদ্দ দিন পর শরমিনের চোখে চোখ রাখে সে। শরমিনের চোখ দুটি শান্ত স্থির দীঘি। কোন ঢেউ নেই, বাতাস নেই, নেই ঝরাপাতার তরঙ্গ; দুপুরবেলার নির্জনতা শুধু জমে আছে।
৫.
সাইফুল ভেবেছিল, শরমিনকে একনজর দেখেই সে ফিরে যাবে। আর কোনোদিন শরমিনের পৃথিবীর আশেপাশেও আসবে না। কিন্তু সেই দুপুর থেকে সে একবার নীহলডাঙার দিকে যায়, আরেকবার কৃষ্ণনগরের দিকে ফেরে। এভাবেই এক গূঢ় দ্বন্দ্বে দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি যাওয়া ফেরার পথে আটকে থাকে সে। ভাবে, আর একবার দেখে যাই শরমিনের মুখ; একবার শুনে যাই তার কণ্ঠ। কিন্তু মানুষ কী ভাববে! কী জবাব দেবে সে, কেন সে বারবার ফিরে যাচ্ছে কৃষ্ণনগরের মুসলিমহাটিতে! তারপর ভাবে রাত নামুক; গোপনে, আড়াল থেকে একবার শুধু শরমিনের কণ্ঠ শুনে ফিরে যাওয়া যাবে। এই ভেবে হাওরে বসে সন্ধ্যা কাটিয়ে সে সাইকেল রেখে রাতের বুকে সতর্ক পায়ে এগিয়ে যায় মুসলিমহাটির দিকে। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই মূলত এইখানে রাত ঘন হয়ে আসে। চুপচাপ শরমিনের বাড়ির কাছে একটা খড়ের গাদার পাশে লুকিয়ে থাকে সাইফুল। শরমিনদের ঘর নিশুতি হয়ে আসলে সাইফুল ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে কান পাতে তাদের ঘরের দেয়ালে। দেয়ালের ওপাশে ঘর। আর এ পাশে বহুদূর ছড়িয়ে আছে হাওর। নিগূঢ় চরাচর। অথচ একটা ঘরের স্বপ্টম্ন ছিল তাদের। আজ শরমিন অন্য ঘরের! দেয়ালে কান পেতে প্রথমে সাইফুল কিছুই শোনে না। একটু সরে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়ায়। এবার শুনতে পায়। ফিসফিস কণ্ঠ। পুরুষ কণ্ঠটা বোধহয় আমিন শেখের! নারীরটা শরমিনের! ভালোবাসার শব্দও সে শোনে। সে শুনতে পায় আদর পেয়ে শরমিনের ভেঙে পড়ার খুব পরিচিত শব্দ, নূপুরের গোপন নিকস্ফণ, একটা ফুল স্পর্শের মিহি সুর। এইসব শুনে সাইফুলের বড় অস্থির বোধ হয়। তার কানে এইসব শব্দ বিকট হয়ে আসে। পৃথিবীর সকল দেয়াল ভেঙে পড়ার নিনাদ বুকে নিয়ে সাইফুল দৌড়ে কোথাও পালিয়ে যেতে থাকে। তার মনে হতে থাকে- কোথাও কোনো দেয়াল নেই, নেই ঘর। সমস্তই পৃথিবী। উন্মুক্ত আর অশ্নীল কেবল।