২০১০ সালের গ্রীষ্ফ্মের শেষদিকে ব্রাইটনের বাকিংহাম প্লেসের মাঝারি একটা স্টুডিওতে উঠলাম আমি। জায়গাটা রেলস্টেশনের কাছেই। সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিন সকালে অফিস করতে যেতে হচ্ছিল আমাকে; আমার গবেষণার বিষয় নিয়ে অর্থনীতি বিভাগের বর্ষীয়ান শিক্ষকদের সাথে কথা বলতে হচ্ছিল। বিকেলের পরে বাসায় ফিরে গড়িয়ে নিচ্ছিলাম একটু; তারপর হাঁটতে বেরুচ্ছিলাম। ব্রাইটন লন্ডনের কাছে হলেও শহরটা খুব ছোট বলে এমনিতেই তেমন কিছু করার ছিল না, আটলান্টিক উপকূলের সাগরবেলায় বসে বসে নুড়িপাথর গোনা ছাড়া। সেটাই করছিলাম প্রতিদিন বিকেলে। গ্রীষ্ফ্মকাল শেষ হয়ে যাওয়াতে সাগরবেলা নির্জন হয়ে পড়েছিল। তেমন অখণ্ড নির্জনতায় বসে বসে আমি মন খারাপ করছিলাম। ভাবছিলাম, কবে দেশে ফিরে যাব। নতুন শহরটাতে বন্ধুবান্ধব জুটে গেলে নিশ্চয় এমন মন খারাপের ঘটনা ঘটত না! এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার কাজ করতে করতে আর সাগরবেলায় নুড়িপাথর গুনতে গুনতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়লাম আমি। তাই নভেম্বরের শুরুতে উত্তরের রেডহিল শহরে আমার বন্ধু কবির জামির সাথে দেখা করতে গেলাম। ব্রাইটন থেকে রেলগাড়িতে চেপে গ্যাটউইক এয়ারপোর্ট ফেলে সোজা প্রায় ৪৬ কিলোমিটার উত্তরে এগোতে হবে। তারপর পড়বে রেডহিল নামের শহর। জায়গাটা পেরুলেই লন্ডন।
বছর দশেক পরে কবির জামির সাথে দেখা হলো। সারাদিন আমরা তার গুড উড রোডের বাসায় বসে আড্ডা দিলাম; সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে কথা বললাম; ইউটিউবে উত্তম-সুচিত্রার সিনেমা দেখলাম; তারপর সকালবেলায় আমরা হাঁটতে গেলাম পার্ক রোডের দিকে। অনেকক্ষণ হাঁটার পরে আমরা ফিরতে শুরু করেছিলাম গুড উড রোড বরাবর। পথে পাউরুটি কিনতে একটা স্টোরে ঢুকেছিল কবির জামি; আর আমি দাঁড়িয়েছিলাম স্টোরের সামনে, সিগারেট টানছিলাম বলে মনে পড়ছে। আনমনে বামে তাকিয়ে দেখি, সাদা রঙের একটা সিডান কার এগিয়ে আসছে রাস্তা ধরে। কারটা আমার সামনে এসে গতি কমিয়ে দিল। আমি দেখলাম, সেখানে বসে আছে চারজন তরুণ। মনে হলো, জাতে তারা ইংলিশ। কারের ব্যাক সিট থেকে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দু'জন তরুণ আমার উদ্দেশে চিৎকার করে বলে উঠল, 'হেই পাকি! ফাক অফ!' তারপর গতি বাড়িয়ে সামনে থেকে চলে গেল কারটা। স্তব্ধ হয়ে পথের ধারে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি।
স্টোর থেকে পাউরুটি কিনে নিয়ে কবির জামি বেরুলে তাকে আমি ব্যাপারটা জানিয়েছিলাম। অপ্রস্তুত হয়ে সে বলেছিল, নিঃসন্দেহে এরা কনজারভেটিভ পার্টির সমর্থক, যারা ইংল্যান্ডে অভিবাসী নিয়ন্ত্রণের পক্ষপাতী। লেবার পার্টির উদার অভিবাসন-নীতিতে ঘৃণা করে তারা। এ আর নতুন কী! ইংল্যান্ডে হরহামেশাই এমন বুলিং চলছে! তবে সে দুঃখিত হয়েছিল এই ভেবে যে, তরুণরা আমাকে এমন নোংরা কথা না বললেই পারত! বাংলাদেশের চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে ইংল্যান্ডে গবেষণা করতে গিয়েছি আমি মাত্র এক বছরের জন্য; কাজ শেষে সোজা ইতালি হয়ে দেশে ফিরে যাব। আমি তো আর ইংল্যান্ডের চাকরির বাজারে কারও সাথে প্রতিযোগিতায় নামতে যাচ্ছি না! বিদেশি সবাইকে এমন ঢালাওভাবে গালাগাল করাটা অনুচিত! এসবই বলে যাচ্ছিল অপ্রস্তুত কবির জামি। অপরাধবোধে ভুগছিল সে।
আমি ভাবছিলাম, গেল দু'বছর ধরে আমি মধ্য ইতালির সিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি পর্যায়ে পড়াশোনা করছি। সিয়েনা শহরে বা ফ্লোরেন্সে বা রোমে কখনও কোনো ইতালিয়ান নাগরিক আমাকে 'এস্তেনারি', মানে 'বিদেশি', বলে গাল দেয়নি, খোঁচাটোচাও মারেনি এক ফোঁটাও। বরং তারা সাদরেই গ্রহণ করে নিয়েছে আমাকে। যারা অপরিচিত মানুষজন তাদের চোখে বা মুখের হাসিতে আমি অনুমোদন আর অভয় ছাড়া কখনও কিছুই দেখিনি। তখন গাদ্দাফির পতনের পরে লিবিয়া থেকে রাবারের বোটে করে ভূ-মধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছে শত শত মানুষ। সিসিলির কাতানিয়া অথবা আরও উত্তরের কালাব্রিয়াতে নামছে তারা। ইতালির কোনো রাজনৈতিক দল বা সাধারণ মানুষ তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছে না- মাগনা খাওয়াচ্ছে, পড়াচ্ছে তাদের দিনের পর দিন, পথে মানুষজন খোঁচা মারছে না তাদের, মনে মনে বিরক্ত হলেও! আমি ভাবছিলাম, ইতালির মানুষজন সকলেই বিশ্বায়নের সুফলটা ঠিকঠাকই বোঝে- কম দামে শ্রম কিনবে শিল্প-কারখানা, দোকানপাট। হিসাবটা তাদের কাছে খুবই পরিস্কার। এখানে উল্লেখ করতেই হয়, তাদের অভিবাসী গ্রহণের প্রবণতা অনেক পুরোনো- পঞ্চম থেকে অষ্টম শতকে, রোমানদের শাসনের সময় থেকে যার শুরু।
আর বিশ্বায়নের সাথে ইংল্যান্ডের মানুষজন যুক্ত হয়েছে এই সেদিন- ১৬ শতক থেকে তারা পৃথিবীর দেশে দেশে ট্রেডিং পোস্ট তৈরি করেছে বা দখল করে নিয়েছে দেশের পর দেশ। তো এই পাঁচশ বছরেই কলোনিয়াল টাইয়ের অভিবাসীদের নিয়ে ক্লান্ত হয়ে গেল ইংল্যান্ডের মানুষ! তারা এখন কম দামে শ্রমের সুবিধে নিচ্ছে ঠিকই, আবার খÿহস্তও হতে চাইছে অভিবাসীদের ওপরে; খোঁচাচ্ছে-অপমান করছে, মারছে তাদের? কেন? অদ্ভুত ভণ্ড এরা! শত শত বছর ধরে এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকার যেসব দেশকে শোষণ করেছে তারা; আজ সেসব দেশের মানুষকে ভাগ্যান্বেষণে তাদের দেশের কোথাও দেখলেই এখন তাদের গা-জ্বালা করছে?
ব্রাইটনের বাকিংহাম প্লেসের সেইন্ট অ্যানস্‌ অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে আমার স্টুডিওর ঠিক পাশের স্টুডিওতে থাকত ষাটোর্ধ্ব গর্ডোন। সে স্কটল্যান্ডের মানুষ হলেও তরুণ বয়স থেকে ইংল্যান্ডেই থেকেছে, বিভিন্ন শহরে চাকরি করেছে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে, রিটায়ারও করেছে। গর্ডোন সব শুনে বলল, হৃদয়হীনের মতো কাজ করেছে উচ্ছৃঙ্খল ইংলিশ তরুণেরা। আর এদের তো চেনই- এরা স্কটিশ আর আইরিশদেরও ইংল্যান্ড থেকে বের করে দিতে চায়! তো তারা তো তোমার মতো একজন বাংলাদেশিকে সহ্যই করবে না, জাতিবিদ্বেষপ্রসূত খোঁচা মারবেই, তুমি একজন গবেষক হলেও! তুমি যদি আমাদের বিল্ডিংয়ের পড়শি পাকিস্তানি জালালের মতো তেসকো ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের ক্যাশে কাজ করতে তাহলে তোমাকে এসব বাজে কথা বলতে পারত তারা! আর তা'ছাড়া তুমি তো পাকিস্তানের মানুষও নও যে তারা তোমাকে 'পাকি' বলে গাল দেবে! এটা তাদের মূর্খতা ছাড়া আর কী?
কৌতুকে হাসছিলাম আমি। আমার পড়শি গর্ডোনকে আমি আমার মন্তব্য জানালাম, 'তার মানে জালালকে কেউ এমন রেসিস্ট কমেন্ট করলে এমন করে বার বার চুক চুক করতে না তুমি? এই তো?'
আমার মন্তব্যের পরে অস্বস্তিতে নড়েচরে বসল গর্ডোন। সে যুক্তিটুক্তি দিতে শুরু করল: না! না! ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। কোনো বিদেশিকেই এভাবে অপমান করা নিঃসন্দেহে অসংগত। তারপর সে আমাকে প্রশ্ন করেছিল, 'তোমাদের দেশে যদি আফ্রিকার কোনো মানুষ উড়ে গিয়ে জুড়ে বসে, ধর- নাইজেরিয়ার, তবে তাকে কী বলবে তুমি?'
প্রমাদ গুনেছিলাম আমি। কেননা, বাংলাদেশের মাটিতে আমরা আফ্রিকার কোনো মানুষের সাথে দেশীয় চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা করতে চাইব না মোটেই- যদি হেরে যাই শেষে!
'বেশ! আর যদি কোনো ইউরোপীয় মানুষ গিয়ে তোমাদের দেশে থাকতে শুরু করে তবে কী বলবে তুমি?'
আমি উত্তর করি- সে যদি আমার দেশে বিনিয়োগ নিয়ে যায় তবে তাকে খোশ আমদেদ জানাব। যদি সে চাকরির বাজারে ঢুকতে চায় তবে অবশ্যই তাকে আমি বাধা দেব!
আমার উত্তর শুনে হেসে ফেলে গর্ডোন। সে আমাকে বলে, তবে রেডহিলের সেই চারজন জাতিবিদ্বেষী তরুণ অন্যায়টা কী করেছিল?
এমন একটা মোক্ষম প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে থমকে যাই আমি। আমি ভাবি- ঠিকই তো! নিজের বেলায় আঁটিকুটি করে পরের বেলায় চিমটি কাটলে চলবে?
সেদিন রাতেই আমার আরেক পড়শি- লাহোর থেকে আসা জালালকে আমি ধরি। তার ইংলিশ স্ত্রী স্কারলেট জোনসের কল্যাণে সে ইংল্যান্ডে বসবাসের পাক্কা কাগজ পেয়েছিল বেশ আগেই। জালালের প্রতিক্রিয়া ছিল এমন, 'তোমার পেটে যে স্ট্ক্রু ড্রাইভার ঢুকিয়ে দেয়নি- এই তো অনেক! মনে নেই তোমার, অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ঘটেছিল এমন একটা ঘটনা?'
আমি মৃদু হেসে বলেছিলাম, 'হ্যাঁ! এটা ঠিক বলেছ তুমি!'
উত্তেজিত হয়ে জালাল বলেছিল, 'আর সত্যি বলি- ইংলিশদের ঘৃণা করি আমি! তারা তো আমাদের ঘৃণা করেই- দেখেছ তুমি সেটা। ঘরেও প্রচুর খোঁটা খেয়েছি আমি! এ কারণেই তো আমার স্ত্রী স্কারলেটের সাথে আমার পড়লই না! অনেক ঝোলাঝুলির পরে ডিভোর্স হয়ে গেল! মজার ব্যাপার জান- আমরা দু'জনেই একই মাত্রার তীব্রতাতে ডিভোর্স চেয়েছিলাম!'
আমি ভাবি: একই তীব্রতাতে দু'পক্ষই সব ভেঙে দিতে চাইল? কেউ আর সম্পর্কটাকে যত্ন করে টিকিয়ে রাখতে চাইল না? অদ্ভুত তো! পরস্পরের মাঝে দেয়াল তুলে দিল তারা- অলঙ্ঘনীয় দেয়াল?
তা'হলে দাঁড়ালটা কী? দাঁড়াল এই যে- নতুন একটা দেশে, নতুন একটা সংস্কৃতিতে যে আসে তার প্রতি সহনশীল হতে হয়। ভৌগোলিক কোনো সীমা তো আর মানুষকে আটকাতে পারবে না! তা'হলে আর চিড়বিড় করে ফায়দা কী হবে?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে কোনো একটা দেশের মানুষকে কেন ভাগ্যান্বেষণে উন্নততর আরেকটা দেশে অভিবাসন ঘটাতে হবে? এর পেছনের কারণ যেটা লুকিয়ে আছে তা পুরোটাই অর্থনৈতিক: আসলে লাভ দু'জনেরই- অভিবাসী পাচ্ছে বেশি মজুরির কাজের সুযোগ, অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা, উন্নত সামাজিক জীবন; আর আশ্রয়দাতা পাচ্ছে কম দামি শ্রম। এটাই হলো গিয়ে বিশ্বায়নের সৌন্দর্য। সেখানে দেয়াল আছে, থাকুক! দেয়াল উঠুক আরও- হাজারটা। আশ্রয়দাতা ও আশ্রয়গ্রহণকারী ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিক পরস্পরের দিক থেকে, আশ্রয়গ্রহণকারীকে গুলি করে মেরে ফেলুক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা, দাঙ্গা শুরু করুক আশ্রয়গ্রহণকারীরা, তারা ভেঙে ফেলুক আশ্রয়দাতাদের এলাকার রাস্তার ওপরের সব দোকানপাট, আগুন দিক গারবেজ ট্রাকে। এসবে আসলে আশ্রয়দাতা দেশের বড় কোনো ক্ষতিই নেই, কেননা বিশ্বায়নের অমোঘ চাকা ঘুরলে তাদের অর্থনীতিতে যে লাভ হচ্ছে তার পরিমাণে ওই দু'চারটা দোকানপাট ধ্বংস হয়ে যাওয়া বা কোনো প্রাণ চলে যাওয়ার মতো ক্ষতির চাইতেও অনেক বেশি। কাজেই আশ্রয়গ্রহণকারীদের গায়ে হাজারটা অপমান-অসম্মান এঁকে দিলেও, হাজারটা দেয়াল তুলে রাখলেও বৈশ্বায়নের প্রক্রিয়াকে থামানো যাবে না।
আমার যুক্তির সমর্থনে মাথা নাড়ল গর্ডোন, জালালও বটে।
জালালকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'তবে কি লাহোরে ফিরে যাবে তুমি?'
জালাল উত্তর দিয়েছিল, 'নাহ্‌! পনেরো বছরের ওপরে ইংল্যান্ডে আছি। মন বসে গেছে ভাই! লাহোরে গিয়ে কি আর নতুন কিছু করার মতো বয়স আছে আমার? তার চাইতে এই ভালো যে ব্রাইটনেই পড়ে থাকি, তেসকো'তে বা জেসি পেনিতে অথবা হোম ডেপোতে কাজবাজ করি! চারদিকে দেয়াল থাকে, থাক। আমিও তো নিজেও দেয়াল তুলেছি অনেকগুলো।'
জালালকে আমি বলেছিলাম, 'এমন সব ব্যবধান যদি বানাতে থাক তবে তো তুমি যে এলাকাতে থাকছ, যে স্টোরে কাজ করছ- সেখানের কোনো ইংলিশ তোমার কাছেই ভিড়বে না!'
উত্তর দিয়েছিল জালাল, 'সাদাদের কাছে ভিড়াভিড়ির কাঁথায় আগুন! আমার কাউকেই দরকার নেই। আমি কেবল কাজ চাই, অল্প মজুরিতে হলেও। আমার টাকা চাই অনেক, বুঝলে? লাহোর থেকে দক্ষিণে রাও খানওয়ালা নামের যে গ্রাম আছে ওখানে আমি জমি কিনব, আলিশান ভিলা বানাব একটা।'
জালালের সাথে আমার কথোপকথন এখানেই শেষ হয়েছিল সেদিন।
ব্রাইটন শহরের কুইনস্‌ হেডে যে গ্রান্ড সেন্ট্রাল পাব রয়েছে সেখানে আমি প্রায়ই বিয়ার খেতে যাই। একদিন সেখানে ইংলিশ প্রিমিয়ারের ফুটবল ম্যাচ দেখতে গেছি গর্ডোন আর আমি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বনাম ম্যানচেস্টার সিটি'র ম্যাচ চলছে। বিয়ার নিয়ে ফুটবল ম্যাচ দেখতে দেখতে আমি লক্ষ করলাম, ওখানে আমি ছাড়া বাংলাদেশ বা ভারত বা পাকিস্তানের আর মাত্র একজন মানুষ খেলা দেখছে, বাকি সবাই হয় ইংলিশ, নয়তো স্কটিশ বা আইরিশ। আমার দিকে কেউ কেউ তাকাচ্ছে আঁড় চোখে; নিশ্চয় ভাবছে- ময়ূরের লেজ লাগিয়ে এ আবার কোন দাঁড়কাক এলো? এদের তো পথেঘাটে দেখা যায়, আবার পাবেও? তাদের সন্দিহান দৃষ্টির কারণটাও খুঁজে পেলাম আমি- যে দেয়ালের কথা বলছিলাম আমি তা পেরিয়ে ওখানে বাংলাদেশ বা ভারত বা পাকিস্তানের কোনো মানুষ সচরাচর ফুটবল ম্যাচ দেখতে কোনো পাবে যাবে না। তারা কাজ করবে, ঘরে ফিরবে, উইকএন্ডে দেশি মানুষদের সাথে মিলবে নিজের বা অন্য কোনো বাসাতে। ইংলিশদের সাথে সামাজিক লেনদেন তাদের নেই বললেই চলে।
অভিবাসী এবং আশ্রয়দাতার ভেতরের লেনাদেনার প্রশ্নে আমার মনে পড়ে গিয়েছিল পশ্চিম ম্যাসাচুসেটসের পিট্‌সফিল্ডের মুর-পরিবারের কথা। বব মুর আর লিওনা মুর আমার হোস্ট প্যারেন্ট ছিলেন। আমি তখন, সেই ১৯৯৯ সালে, উইলিয়াম কলেজের মাস্টার্স-পর্যায়ে পড়াশোনা করছি, থাকছি উইলিয়ামস্‌ টাউনে। বব চাচা আর লিওনা চাচি আমার ডরমিটরিতে এসে প্রায়ই আমার সাথে দেখা করে যেতেন। আমরা তখন উইলিয়ামস্‌ টাউনে মেইন স্ট্রিটে বা একটু দূরের ভারমন্ট বা নর্থ অ্যাডামসের কোনো বারে বসে কফি খেতাম আর গল্প করতাম এটা-ওটা নিয়ে। মাঝে মাঝে উইকএন্ডে তাদের পিট্‌সফিল্ডের বাসায় বেড়াতে গেছি আমি, কখনও স্লিপ ওভারও করেছি। পশ্চিম ম্যাসাচুসেটসের বার্কশায়ার এলাকার এই পরিবারটার সাথে খুব জমেছিল আমার। তার কারণ এই যে, তারা দু'জনেই বিদেশ-বিভুঁইয়ে আমাকে অপত্য স্নেহ দিয়েছিলেন। আমার সঙ্গ ভীষণ পছন্দ করতেন তারা। যাহোক, যেটা বলার সেটা হলো যে ৩০ নভেম্বর ১৯৯৯-তে সিয়াটলে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হয়েছিল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মন্ত্রী-পর্যায়ের কনফারেন্স আয়োজনের প্রতিবাদে। প্রতিবাদে পথে নেমেছিল বিভিন্ন এনজিও, লেবার ইউনিয়ন, ছাত্রদের দল, ধর্মীও গ্রুপ প্রভৃতি। বব চাচা আর লিওনা চাচির বসার ঘরের কাউচে বসে বসে আমরা তিনজনে দাঙ্গার ফুটেজ দেখছিলাম টেলিভিশনের চ্যানেলগুলোতে। সিবিসি-এনবিসি'র ফুটেজে দেখা গেল, দাঙ্গাকারীদের বেশিরভাগই আফ্রিকান-আমেরিকান নাগরিক, তা'বাদে সেখানে প্রতিবাদে নেমেছিল মেক্সিকান আর লাতিন আমেরিকার মানুষজন এবং কিছু এশিয়ান- দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষজন। দাঙ্গায় অংশ নেওয়া মানুষদের জাতিগত পরিচয়টা পরিস্কার হয়ে গেলে লিওনা চাচি চরম বিরক্তি নিয়ে আমাকে বলেছিল, 'এই যে দেখ, পথে পথে কেমন কেওস লাগিয়ে দিয়েছে এরা! এজন্যই আমি আমাদের যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন সমর্থন করি না! এজন্যই আমি রিপাবলিকান পার্টিকে সমর্থন দেই, তাদেরই ভোট দিই!'
বব চাচা আর লিওনা চাচি যে রিপাবলিকান তা আমি আগে থেকেই জানতাম। কাজেই অভিবাসীদের যে তারা বাঁকা চোখে দেখবেন তা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ ছিল না।
আমি ছোট করে বলেছিলাম, এ দাঙ্গাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষদের আয় ও সুযোগের বৈষম্যের বিরুদ্ধে দশক দশকের ক্ষোভের সামান্য একটা প্রকাশ এটা।
লিওনা চাচি আমাকে তখন বলেছিলেন, 'সোনা বাবু! তোমাকে আমি পছন্দ করি কেন, জান? তুমি এদেশে রয়ে যেতে আসনি- পড়া শেষ হলে তুমি বাংলাদেশে ফিরে যাবে। অভিবাসীরা চাইনিজ ইনভেসিভ প্লান্টের মতো, জাপানের ব্লাতেল্লা ককরোচের মতো- সারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আনাচে-কানাচে ছেয়ে গেছে তারা। তুমি তো আর তাদের মতো খতরনাক নও।'
পিটস্‌ফিল্ডের লিওনা মুরকে আমি আর জিজ্ঞাসা করিনি- তার মানে, আমি যদি কখনও তোমাদের দেশে ওয়ার্ক পারমিট নিই, যদি গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করি কোনো দিন তবে ব্যবধান রচনা করবে তুমি। এই তো? সেই দেয়াল পেরিয়ে আমার সাথে বসে বসে আর সুখ-দুঃখের গল্প করবে না তুমি, নিউ জার্সিতে বেড়াতে যাবে না আমাকে সাথে নিয়ে। ঠিক কি না?
এই প্রশ্নটা আমি আর লিওনা মুরকে করিনি তার কারণ উত্তরটা আমার জানা- নাহ্‌! দেয়াল সরিয়ে তখন তিনি বা তারা কেউই আমার পাশে এসে বসবেন না কখনও!
অর্থনীতির সূত্র বলছে যে পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পুঁজি আর শ্রমের অবাধ চলাচল থাকবে। কিন্তু পূর্ণ প্রতিযোগিতা তো আসলে সোনার পাথরবাটি- বাস্তব কিছু নয়! কাজেই বৈশ্বিয়ানের যুগে পুঁজি আর শ্রমের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা ভীষণ বাস্তব একটা সমস্যা বটে। এসবের মোহ থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়াটা ভালো।
কিছু কিছু দেয়াল ভাঙা যায় না কিছুতেই! কিছু কিছু দেয়াল বার্লিন ওয়ালের চাইতেও হাজার গুণে শক্ত।

বিষয় : প্রচ্ছদ ফয়জুল ইসলাম

মন্তব্য করুন