কথা ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক পরবর্তী সফরে অতীতে যে সকল স্থান বা ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখিনি, এবার চেষ্টা করব। সকালে হাওড়া থেকে ট্রেনযোগে বীরভূম জেলার বোলপুরে যাত্রা করি। ট্রেনের নামই শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস। সময় লাগে তিন ঘণ্টার মতো। পথে বড় স্টেশন বলতে বর্ধমান জংশন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মস্থান আসানসোল এ জেলাতেই। দেখলাম, এখানে অগ্নিবীণা নামেও একটি এক্সপ্রেস ট্রেন রয়েছে। জানালার পাশে সিট পাওয়ায় সরাসরি প্রকৃতির কোমল স্পর্শ অনুভব করি। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সবুজ ফসলের মাঠ। নয়ন জুড়ানো নিসর্গে নুয়ে আছে অবারিত আকাশ। দিগন্তরেখায় শরতের সাদা মেঘের আনাগোনা। দৃষ্টির সীমানাতেই কোথাও কোথাও কাশ ফুলের শুভ্রতা। কলকাতা শহর ছেড়ে মফস্বলের দিকেও শারদীয় দুর্গোৎসবের সাজ সাজ রব। আজকের দিনটাও যেন এক অপূর্ব মোহনীয় সৌন্দর্যের আবেশে জড়ানো। একরাশ ঝলমলে রৌদ্রময় সকাল দিয়ে শুরু। ভাবছিলাম, আহা! আমাদের কত বড় বাংলাদেশ ছিল; এক সময়ে এ পথেই নিত্য পাড়ি দিয়েছেন; মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, ইন্দিরা গান্ধী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ আরও কত মনীষী! অল্পক্ষণের মধ্যেই পাশে বসা যাত্রীর পরিচয় পেয়ে গেলাম। বোলপুরের এক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষিকা তিনি। নাম নমরুতা মুখার্জি। পড়াশোনা করেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস নিয়ে। তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন আমাদের ময়মনসিংহের। লক্ষ্য করলাম, শান্তিনিকেতন ট্রেনের কামরাতেও রবীন্দ্রনাথের বাণী উৎকীর্ণ। দাঁড়িয়ে একটু পড়ে নিলাম, ”We come nearest to the great, when we are great in humility” বা ” Faith is the bird that feels the light when the dawn is still dar“ ইত্যাদি। বোলপুর স্টেশনে নেমে সোজা ডানে যাই। প্রথমেই বাংলাদেশ ভবন ও ইন্দিরা গান্ধী স্মৃতি ভবন। ফিরে এসে পরবর্তী সারাদিন শান্তিনিকেতনের নানা অলিগলি ধরে ঘুরি। ট্যাক্সিওয়ালা নিজেই গাইড। তারা সবই চেনে। প্রতিদিনের নতুন অভিজ্ঞতা বলে কথা।
২.
মামুন, সুজনসহ আমরা তিনজন দীর্ঘ রাস্তা ধরে যাচ্ছি। চোখে পড়ে সূচনালগ্নের সেই ছাতিমতলা, উপাসনা গৃহ, শান্তিনিকেতন বাড়ি, লাইব্রেরি, তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে, কলা ভবন, সংগীত ভবন, জাদুঘর, পূর্বাঞ্চল সংস্কৃতি কেন্দ্র, ইন্দিরা গান্ধীর ছাত্রী হোস্টেল, পেছনের রাঙামাটির পথ, বিশালাকার খেলার মাঠ ইত্যাদি। ঘুরতে গিয়ে প্রবেশ করি সৃজনী শিল্পগ্রামের ভেতরে। এতে টিকিট করে যাওয়ার ব্যবস্থা। দুই পাশে উন্মুক্ত সবুজে আলোচনা মঞ্চ। নানা প্রকার মূর্তিসহ গৃহের সারিবদ্ধ প্রদর্শনী। এগুলোতে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের গৃহায়ন ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে। আদিবাসীদের হস্তশিল্প ও হোম-মেড পোশাক প্রদর্শনীও চোখে পড়ে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল একগুচ্ছ বাঁশঝাড়ের নিচে বসে বাউলশিল্পী দিলীপ বীরবংশীর গান। তাঁর হাতের একতারাটা যেন কথা বলছে। গাইছিলেন- তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিব ছেড়ে যাব না-। আমার অনুরোধে রবিঠাকুরের গান- দেখেছি রূপ সাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা- কী অসাধারণ সুর, তাল ও লয়। মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে আমার মতন অনেকেই শুনছিল। আমি কিছু সময় তাঁকে সঙ্গ দিই। আলাপ করে জানি, বোলপুর স্টেশনের পাশেই তাঁর বাড়ি; বংশপরম্পরায় এখানে বসে রবিতীর্থে আগত দর্শনার্থীদের মনোরঞ্জনের নিমিত্তে কণ্ঠসেবা দিয়ে চলেছেন। মানুষের স্বতঃস্ম্ফূর্ত দানই তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
৩.
ফেরার পথে বিশ্বভারতীর উদ্যোগে ছোট ছাত্রছাত্রীদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত শিক্ষাবিষয়ক মেলায় প্রবেশ করি। দেখি, শিশুরাই হরেকরকম খাবার বিক্রি করছে। মূলত এদের উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্যে নিজেরাও খেয়েছি। ভেতরে ঘুরে একে ওকে জিজ্ঞেস করে বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভবনের নাম জানার চেষ্টা করি। তখন বারংবার মনে পড়ছিল আমাদের বিখ্যাত রম্যলেখক সৈয়দ মুজতবা আলী ও ক্ষীতিমোহন সেনের কথা। তবে বাঙালি নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের জন্মবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরটা দেখলাম। অমর্ত্য সেনের জন্ম এখানেই। জনশ্রুতি আছে, তাঁর এ নামটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই রেখেছিলেন। ভাবছিলাম, সর্বত্র প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত এবং অন্তহীন কঠোরতার ভেতরেও একজন বাঙালি নিরাপত্তাকর্মী সদয় হয়ে আমাদের ইশারায় অনুমতি দিলেন। এতে আমরা কৌতূহলোদ্দীপক এবং একইসঙ্গে আনন্দিত ও বিস্মিত হই। এতটা প্রত্যাশা করিনি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, আমাদের ট্রেনের সময় প্রায় আসন্ন। ট্যাক্সি মূল রাস্তায় দাঁড়িয়ে। বের হওয়ার পথে নিরাপত্তা কর্মীকে ধন্যবাদ জানিয়ে অন্তত তাকে একটু প্রসন্ন করি। তাঁর অকৃত্রিম হাসিটা আমাদেরও প্রীত করেছিল।
৪.
বিরাট এলাকাজুড়ে এখন শান্তিনিকেতন। জানা যায়, ভেতরে ৩৬৭০ বিঘা জমি। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ শুরু করেছিলেন মাত্র ২০ বিঘা দিয়ে। রবীন্দ্রনাথের জন্মের দু'বছর আগেই তিনি ব্রাহ্মধর্মের আধ্যাত্মিক জগতের সন্ধানে এমন নিরালায় উপাসনালয় নির্মাণ করে নাম দেন শান্তিনিকেতন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরেই এখানে কালক্রমে গড়ে ওঠে আজকের পৃথিবীর বহুভাষার সূতিকাগার এবং বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, যার আচার্য স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এখানকার যে বাড়িতে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ বাস করতেন; এর বয়স হয়েছে ১৫৮ বছর। বছরব্যাপী, এমনকি বারো মাসেই বহুবিধ উৎসব, পার্বণ, মেলায় মুখরিত হয়ে থাকে শ্রীনিকেতন প্রাঙ্গণ। অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছি, মানুষ আসছে, যাচ্ছে, তাঁরা যুগযুগান্তর ধরে ঘুরছে। অনাগতকালের জন্য এ যেন এক মহাতীর্থভূমির কিংবদন্তিতে পরিণত হয়ে আছে।
রবীন্দ্র গবেষকদের অনেকেই মনে করেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ শান্তিনিকেতনের উদয়ন বাড়িতেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর মাত্র ১৫ দিন পূর্বে শারীরিক অবস্থার অবনতিতে তাঁকে ইজি চেয়ারে উপবিষ্ট করিয়ে বোলপুর স্টেশনে নিয়ে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে আনা হয়েছিল। ডা. নীল রতন সরকার ও ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের তত্ত্বাবধানেই তাঁর প্রস্টেট অপারেশন হয়েছিল, তবে সফল হয়নি। ২২ শ্রাবণ, ৭ আগস্ট, ১৯৪১ সালে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।
৫.
সূর্যাস্ত আসন্ন। বোলপুর রেলস্টেশন বেশ জনাকীর্ণ। ওপরের ফুট ওভারব্রিজ ডিঙিয়ে ওপারে যাই। দুই মিনিটও অপেক্ষার ফুরসত পেলাম না। বিকট শব্দে দিজ্ঞ্বিদিক কাঁপিয়ে অসম্ভব দীর্ঘ এক এক্সপ্রেস ট্রেন এসে থামল।
কোনো রকম খোঁজাখুঁজি না করে উঠে পড়ি। পর্যায়ক্রমে তিনজনই আসন পেয়ে যাই। ঝমঝম ঝিকঝিক শব্দ করে চলছে ট্রেন। বর্ধমান স্টেশনটা ছাড়া প্রায় বিরতিহীনভাবে চলেছে। ঘণ্টাতিনেক বাদে ঘোষণা আসে, আমরা শিয়ালদহ রেলস্টেশনে অবতরণ করছি।
ভাবছি, ভালোই হলো, রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য লেখায় বিশেষ করে ছিন্নপত্রে শিয়ালদহ রেলস্টেশনের নাম এসেছে একাধিক বার। আমরা গেলাম হাওড়া থেকে; ফিরে এলাম শিয়ালদহ হয়ে। আবার কলকাতা।